আবারো রাজপথে গার্মেন্টস শ্রমিকরা। রাস্তা অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, কারখানা ভাংচুর। বাদ যাচ্ছে না রাস্তার সাধারণ যাত্রীদের গাড়িও। সেই পুরনো দৃশ্য। মনে করিয়ে দেয় ২০১০ আর ২০০৬ সালের অসন্তোষ। শ্রমিকদের দাবি, তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। এজন্য এ অসন্তোষ ও সহিংসতা। তবে মালিকপক্ষ বরাবরের মতোই দেখছেন ষড়যন্ত্র। তারা মনে করেন, অন্য প্রতিযোগী দেশের হাতে ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক খাত তুলে দেয়ার চক্রান্ত। প্রকৃত শ্রমিকরা তাদের রুটি-রুজির উপর এই ধরনের হামলা চালাতে পারে না। হামলাকারীরা বহিরাগত।
উভয় পক্ষের বক্তব্য যাই হোক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই খবরটিকে লুফে নিয়েছে। ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের অস্থিরতা। প্রচার করা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কম মজুরি পায় এ দেশের পোশাক শ্রমিকরা। রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ব্লুমবার্গ অথবা দ্য গার্ডিয়ান— কেউই বাদ যাচ্ছে না এই প্রচারণা থেকে। ফলে তাজরীন ও রানা প্লাজার পর আবারো নেতিবাচক বাংলাদেশ। অবশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইতিবাচক বাংলাদেশ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায়।
তাজরীন ও রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রতি মালিকপক্ষের অবহেলার চিত্র বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেন। সাথে সাথে প্রচার হতে থাকে বাংলাদেশের গার্মন্টস শ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে কম। খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিসও এ দেশের শ্রমিকদের আধুনিক যুগের দাসের সাথে তুলনা করলেন। তখন বিভিন্ন ফোরামে দাবি উঠেছিল বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়া বন্ধ করে দেয়ার। তবে সে যাত্রায় এ দাবি হালে পানি না পেলেও শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিটি বেশ জোরালো হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোও শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর জন্য মালিক পক্ষকে চাপ দিতে থাকল। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডদের চাপ ও তাজরীন-রানা প্লাজার ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের শান্ত করতে তিন বছরের মাথায়ই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে সম্মত হয় মালিক পক্ষ। বলতে গেলে মালিক পক্ষের উদ্যোগেই গত ১৩ জুন সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। উদ্দেশ্য শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা। এর আগে কখনোই মালিক পক্ষ উদ্যোগ নিয়ে মজুরি বোর্ড গঠন করেননি।
আবার কারখানা ছেড়ে রাস্তায় শ্রমিক
মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম বলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু কেওয়াজ শুরু হলো যখন মালিক পক্ষ তাদের ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাব উপস্থাপন করল। শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি এখন ৩ হাজার টাকা। মালিক পক্ষ আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন ধরনের সংকট এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সক্ষমতার কথা বিবেচনায় নিয়ে মূল্যস্ফীতির হিসাবে মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। গত ২০১০ সালে সর্বশেষ মজুরি বাড়ানো হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ৮ হাজার ১১৪ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব দেয়া হয়। এই তিন বছরে মূল্যস্ফীতি ২০ শতাংশ ধরে তিন হাজার টাকার উপর ২০ শতাংশ বা ৬০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় মালিক পক্ষ। বলা হয়ে থাকে, এটি মালিকপক্ষের কৌশলগত একটি অবস্থান ছিল। তারাও নিশ্চয় ধারণা করেন মজুরি ৬শ’ টাকার বেশিই বাড়বে। কিন্তু এই প্রস্তাবটিতে ক্ষুব্ধ হয় শ্রমিকরা। তারা এটিকে হাস্যকর প্রস্তাব বলে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি শ্রমিকদের সাথে উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এর সাথে যোগ হলো গত শনিবার ঢাকার একটি সমাবেশ। ঐ সমাবেশের পরই দ্রুত পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। গাজীপুর, সাভার আর ঢাকার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসতে থাকে। কারখানা বন্ধ করে দিতে হয় মালিক পক্ষকে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শান্ত করা যায়নি শ্রমিকদের। তাদের এখন একটাই দাবি, মজুরি কমপক্ষে ৮ হাজার টাকা দিতে হবে।
গার্মেন্টস খাতেই সবচেয়ে কম মজুরি?
প্রতিযোগী অন্যান্য গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই খাতে মজুরি কম। পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মজুরি মোটামুটি ১০০ মার্কিট ডলার বা এর কিছু কম-বেশি। অর্থাত্ এসব দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৭ হাজার টাকা থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে। চীনে আরেকটু বেশি। বলা হয়ে থাকে দেশের ভেতরে সর্বনিম্ন মজুরি এই খাতে। বাংলাদেশে মজুরি ৩ হাজার টাকা বা ৩৮ ডলার (ডলারের বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী)। তবে বিজিএমইএ বলছে, মজুরি বোর্ড গত মে মাস পর্যন্ত ৪২টি শিল্প খাতের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি খাতের মজুরি প্রস্তাবিত আছে। অন্য শিল্প খাতে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির তুলনামূলক বিচারে পোশাক খাতের মজুরি সর্বনিম্ন নয়। এর চেয়ে কম মজুরি আছে টি প্যাকেটিং ইন্ডাস্ট্রি, দর্জি কারখানা, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, চিংড়ি শিল্প এবং বেকারি ও বিস্কুট কারখানা।
এছাড়া চলতি বছর মজুরি বোর্ড বেশ কিছু শিল্পের ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে, যেখানে সিনেমা হল শিল্প, জুতা কারখানা, জুট, প্রেস ও বেলিং শিল্পের প্রস্তাবিত মজুরি গার্মেন্টস খাতের চেয়ে কম বা সমপর্যায়ে রয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও ক্ষতিকর বস্তু বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসার প্রবণতা, কর্মপরিবেশ, কায়িক পরিশ্রম ইত্যাদি বিবেচনায় মজুরি হার ভিন্ন হয়ে থাকে। নির্মাণ ও ট্যানারি শ্রমিকের কর্মপ্রকৃতি, পরিবেশ ও ঝুঁকি পোশাক শ্রমিকের ঝুঁকির চেয়ে বেশি। আবার চাতাল শ্রমিকের শ্রমকাল মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল।
বিজিএমইএ বলছে, প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক খাতের মজুরির তুলনায় এসব দেশের অর্থনীতির সঙ্গে তুলনামূলক অবস্থান বিবেচনায় আনা দরকার। বিশেষ করে মাথাপিছু আয়, জীবন-যাপন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদের হারের মত বিষয়গুলো বিবেচনায় আসার মত। আবার ভারত, ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়ার পোশাক শ্রমিকদের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের উত্পাদনশীলতা কম। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে কোন বিবেচনায় সর্বনিম্ন তিন হাজার টাকা মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিকের পক্ষে জীবনধারণ করা সত্যিই কঠিন। তবে এ ক্ষেত্রে বিজিএমইএ’র ব্যাখ্যা হচ্ছে প্রকৃত অর্থে গ্রাম থেকে আসা অদক্ষ শ্রমিকরাই কেবল তিন হাজার টাকা মজুরি পায়। তবে তারাও ওভারটাইম বা অন্যান্য সুবিধাসহ অন্তত সাড়ে ৪ হাজার টাকা মাস শেষে হাতে পায়।
ন্যূনতম মজুরি নিয়ে নানা মত
১৯৮৬ সালে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের পর ১৯৯৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৯৩০ টাকা। ২০০৬ সালে ১ হাজার ৬৬২ টাকা এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে ৩ হাজার টাকা করা হয়। ঐ সময়েও ৩ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণেও প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কত হওয়া উচিত তা নিয়ে অনেকেই মতামত দিচ্ছেন। শ্রমিক-মালিক পক্ষের সহজাত রশি টানাটানি তো আছেই। এই আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এমনকি গবেষণা সংস্থাও। তবে বেশিরভাগ আলোচনায় শ্রমিকদের মজুরি ৮ হাজার টাকা করার প্রস্তাব আসছে। কিন্তু একই সাথে চিন্তা করতে হবে হঠাত্ প্রায় তিনগুণ ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা কয়টি পোশাক কারখানার রয়েছে।
ন্যূনতম মজুরি কত হতে পারে এ নিয়ে একটি গবেষণা করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ঐ গবেষণা পত্রে বলা হয়, ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার ২শ’ টাকা হওয়া উচিত। তবে প্রথম বছর এর ৮০ শতাংশ বা ৬ হাজার ৫৬০ টাকা ও পরবর্তী বছর বাকি ২০ শতাংশ দেয়া যেতে পারে বলে মনে করে সংস্থাটি। অর্থাত্ দুই ধাপে এই মজুরি বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়। এর মধ্যে বেসিক ব্যয়ের জন্য ৪ হাজার ৩শ’, বাড়ি ভাড়া ১ হাজার ৭শ’ ২০ টাকা এবং চিকিত্সা সেবার জন্য ৫শ’ ৪০ টাকা দরকার। অবশ্য বিদ্যমান আইনে মজুরি বোর্ড দুই ধাপে কোন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে পারে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় বলা হয়, গত দুই বছরে জীবন ব্যয়ের খরচ যে হারে বেড়েছে তা হিসাব করলে শ্রমিকদের এ মজুরি বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিকদের উত্পাদন ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অন্তত এই মজুরি প্রয়োজন।
রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ বা ৩২ লাখ নারী শ্রমিক। শুধু তাই নয় এই খাতের উপর নির্ভর করছে দেশের ব্যাংক, বীমা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পসহ শত শত ব্যবসা। যে কোন মূল্যে টিকিয়ে রাখতে হবে এই শিল্প। শ্রমিকদের আরেকটু ভালো রাখার মাধ্যমে এই কাজটি হয়তো আরো সহজ হতে পারে।
