মুহাম্মদ দিলওয়ার হুসাইন
নাটক “রক্তাক্ত প্রান্তর”
বাংলা দ্বিতীয়পত্রে নির্ধারিত নাটক ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’/‘জমিদার দর্পণ’ কেও গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে । নাটকে নির্ধারিত নম্বর হচ্ছে ২০ । এতে দুটি রচনামূলক প্রশ্ন থাকে একটি উত্তর করতে হয় । নির্ধারিত নম্বর ১০ । দুটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থাকে । একটি উত্তর করতে
হয় । নির্ধারিত নম্বর ০৫ । সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য দুটি সংলাপ থাকে । একটি উত্তর করতে হয় । এতেও নির্ধারিত নম্বর ০৫ ।
প্রশ্ন:‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ একটি দ্বন্দ্বমুখর নাটক আলোচনা কর।
উত্তর : আধুনিক বাংলা নাট্য সাহিত্যের ধারায় প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী বিরচিত ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ এক উজ্জ্বলতম শিল্পকর্ম । তিনি এ নাটকে পানি পথ প্রান্তরের তৃতীয় যুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়কে উপজীব্য করে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্বর সংমিশ্রণে এক শিল্প সার্থক নাটক রচনা করেছেন । ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও এ নাটকে দ্বন্দ্বমূখরতা দর্শক হূদয় স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে । তাই সমালোচক মহল ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটককে একটি দ্বন্দ্বমুখর নাটক হিসেবে অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন ।
এ নাটকের যাত্রা শুরু হয় বহি:দ্বন্দ্বের মাধ্যমে । যে দ্বন্দ্ব মারাঠা ও মুসলমানদের মধ্যে । যারা পরস্পর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একে অন্যকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে । অবশ্য আধুনিক নাট্য ধারায় এ জাতীয় বহির্দ্বন্দ্বের চেয়ে অন্তর্গত দ্বন্দ্বকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে । ফলে সচেতন নাট্যকার মুনীর চৌধুরী এ বহির্দ্বন্দ্বের পশাপাশি বিভিন্ন চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন । তাই এই দ্বন্দ্বের বিস্তার দেখি রহিম শেখের চরিত্রে , হিরণবালা-দিলীপের চরিত্রে, নজীবদ্দৌলা- জরিনার চরিত্রে । কম বেশি প্রতিটি চরিত্র অন্তর্গত দ্বন্দ্বে দগ্ধ হতে দেখি । কিন্তু চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব পরিগ্রহ করে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইব্রাহিম কার্দি ও জোহরা বেগমের চরিত্রে আদর্শ ও নীতিগত অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ।
মারাঠারা জোহরার পিতাকে হত্যা করেছে । পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ এবং স্বজাতির প্রতি ভালোবাসার কারণে জোহরা মুসলিম শিবিরে , অন্যদিকে কৃতজ্ঞতা বোধ ও কর্তব্যবোধের তাড়নায় মুসলমান হয়েও ইব্রাহিম কার্দি মারাঠাদের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় । দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েও অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেনি । স্বামীর সিদ্ধান্তে একমত হতে না পেরে ত্যাগ করে চলে আসে জোহরা । আদর্শ ও নীতির দ্বন্দ্ব তাদের মাঝে বিচ্ছেদের দেয়াল তুলে দেয় । কিন্তু কেউ কাউকে মুছে ফেলতে পারেনি অন্তর থেকে । ফলে অন্তর্গত দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হয় তাদের হূদয় ।
তাইতো জোহরার চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একই রমণীর দুই রূপ । এক রূপে সে রূপবতী ও প্রেমময়ী । অন্যরূপে সে বীরঙ্গনা ও স্বজাতি সেবিকা । প্রতিকূল পরিবেশের নিপীড়নে তার হূদয়ে কোন শান্তির পরশ স্পর্শ করতে পারেনি ।
জোহরা একবার প্রণয়াবেগে দিশেহারা হয়ে শত্রু শিবিরে ছুটে যায় দয়িতের সান্নিধ্য লাভের আশায় কিন্তু কাছে এসে প্রণয়াবেগ গোপন করে ক্ষমাহীন আদর্শের বাণীকে ব্যক্ত করে বেশি । নিজ শিবিরে ফিরে এসে রক্তাক্ত হূদয়ে পরম প্রিয়তমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে । তবে ধারণা করা যেতে পারে জোহরার বীরঙ্গনা মূর্তির অনেকটা
তার ছদ্মবেশ । তার বিবেক , বুদ্ধিশাসিত সিদ্ধান্তের প্রতিফল । কিন্তু পরিণামে অন্তরের রমণী প্রাণকে পাথরে পরিণত করতে পারেনি । বিদীর্ণ তার হূদয় পুড়ে ছাই হয়েছে মূলত অন্তর্গত দ্বন্দ্বের ফলে ।
ইব্রাহিম কার্দির হূদয়ের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের স্বরূপও একই প্রকৃতির । কৃতজ্ঞতাবোধে বিবেক তাকে তার নিজ পথে পরিচালিত করে । প্রথম থেকেই সে অনুভব করে ,এক মহাযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণামের সঙ্গে তার ভাগ্য অবিচ্ছেদ্য সূত্রে জড়িত । তার পরিণতিও তার অন্তর্গত দ্বন্দ্বেরই
ফল ।
নাটকের ১ম অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে মূলত এ দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষরূপ লাভ করে । দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় শেষ দৃশ্যে এ দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে । মুনীর চৌধুরী অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন এ ধরণের শৈল্পিক দ্বন্দ্ব । পরিশেষে বলা যায় , ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকের সূচনা একটা ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে । যা পরবর্তীতে আধুনিক নাটকের গুণাবলি অর্জন করতে গিয়ে ব্যক্তি চরিত্রের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি লাভ করেছে । নাটকের যবনিকাপাত ঘটলেও শেষ দৃশ্যে কেন্দ্রীয় নায়িকা চরিত্রের হূদয়ের রক্তক্ষরণই নাটকের গভীরতা এনেছে- যা দর্শক হূদয় স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে । মূলত এ নাটকের শুরু থেকে শেষ অবধি বিভিন্ন প্রকার দ্বন্দ্বমূখরতাই বিস্তার লাভ করেছে । তাই বলা চলে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ একটি দ্বন্দ্বমূখর নাটক ।
