প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মিসর এখন সেনাবাহিনীর ব্যারাক

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৩৬
মিসরের সামরিক বাহিনী পুরো মিসরকে ছায়ার মতো ঘিরে রেখেছে বহুকাল ধরেই। এর পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা এবং তা ধরে রাখা ছাড়াও তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কেউ গেলেই পরিস্থিতি হবে মুরসির মতো। আমরা দেখেছি মিসরে ব্রাদারহুড ২০১১ সালে ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে মোবারকবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাহরির স্কোয়ার লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়েছিল। তারা মিসরীয় জনগণের মুক্তি ও আইনসম্মত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিল। তখন মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়া হয়েছিল এ কারণে প্রয়োজনে যে এটি না করা হলে মুসলিম বিশ্বে চরমপন্থীরাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। সাংবিধানিক ব্যবস্থা পঙ্গু হবে, প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। কিন্তু এখন মিসরে যা ঘটছে তা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য স্থানের জন্য বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখা দিতে পারে। অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিতদের উত্খাত করতে স্বৈরাচারীদের দোসরদের মধ্যে দ্বিধা থাকবে না। তাদের সমানে গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বনের কোনো উপায় থাকবে না। এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। মুসলিম বিশ্ব ডুবে যাবে মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে আর এ জন্য দায়ী থাকবেন জেনারেল সিসি। মুরসি সমর্থকদের টানা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ রক্তক্ষয়ী উপায়ে থামানোর পরিণতিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে মিসরের অন্তর্বর্তীকালীন তথা সেনা সমর্থিত সরকার। আল ফাত্তাহ আল সিসি বলেন, বর্তমান সংকটের শুরু আসলে মিসর রাষ্ট্রের ধারণা ও মতাদর্শ নিয়ে। এ বিষয়টি নিয়েই জনগণের সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরোধের শুরু। মুরসি ও মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরে ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। মুরসি আসলে পুরো মিসরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, ছিলেন তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের প্রেসিডেন্ট। তিনি বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপের মধ্যদিয়ে এটা শুরু করেছিলেন। বিচারকদের প্রতি সঠিক সম্মানও দেখাননি তিনি। তবে সেনাবাহিনী জনগণের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছে। আসলে এ কথাগুলো দিয়ে জেনারেল সিসির জোর করে ক্ষমতা দখল করাকে বৈধতা দিতে চেয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা মিসরীয় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মুরসিপক্ষ এবং বিপক্ষ উভয় শিবিরই বেশ সমালোচনামুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার হেগ বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ , আবার বলেন, লোকপ্রিয় হস্তক্ষেপ। অর্থাত্ কোনো দেশের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন এবং বিরাগ হওয়া নির্ভর করে অত্র এলাকায় তাদের নিজস্ব স্বার্থের ওপর। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে প্রেসিডেন্ট হুসনি মোবারকের প্রস্থানের পূর্ব পর্যন্ত মিসরীয় রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় রেখেছিল আর সেজন্য পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন ছিল। মিসর কমপক্ষে ষাট বছর সামরিক শাসনাধীনের ছিল। অন্যদিকে কর্মহীনতা, রুটি, চাল, তেলের মতো নিত্যদিনের দরকারি পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে ক্ষুব্ধ জনতাকে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য করেছিলো। এই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান দাবিই ছিল, খেয়ে-পরে মানুষের মতো বেঁচে থাকা। আরও ছিল, প্রশাসন থেকে সামরিক বাহিনীকে হটিয়ে ৩৭ কি ৩৮ বছরের কর্তৃত্ববাদের অবসান ঘটিয়ে দেশকে লিবারেল গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে আসা। মুক্ত ও ন্যায্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নিজেদের সরকার বেছে নেবে। এই শেষোক্তটি অবশ্য জনগণ অর্জন করে এবং মুরসি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হন। মুরসি আসেন মুসলিম ব্রাদারহুড নামে পরিচিত এক ইসলামী মুভমেন্ট থেকে। ৮৫ বছর আগে মিসরে জন্ম ব্রাদারহুডের। ব্রাদারহুড সামরিক বাহিনীর কুনজরে পড়ে ফলে তাকে নিষিদ্ধকরণ তো বটেই, সেই সঙ্গে নাশকতামূলক সংস্থা হিসেবে নিরাপত্তাবাহিনীর ট্রেনিং সিলেবাসেও জায়গা পায়। সামরিক বাহিনীর এক নম্বর শ্রেণিশত্রুতে পরিণত হয় ব্রাদারহুড। আর তাই সুযোগ পেয়ে সামরিক বাহিনী দলটির ছোট বড় সকল নেতাদের জেলে বন্দী করে। মুরসি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েও পুরোপুরি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি কারণ বহুদিন ধরেই স্তূপীকৃত দারিদ্র্য ও কর্মহীনতার সমাধান জনসাধারণ এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আশা করেছিল। তা ছাড়া সেনাবাহিনীর চাল সে বুঝতে পারেনি। জনঅস্থিরতা এড়াতে মুরসি অর্থখাতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের দাবিকৃত ভর্তুকির কাটছাঁট ও ক্ষেত্রবিশেষে বাতিলের বিষয়টিও অগ্রাহ্য করেন। কয়েক মাস অন্তর কাতার যদি কয়েক বিলিয়ন ডলার না দিতো, তাহলে অনেক মিসরীয়কেই অনাহারে থাকতে হতো। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবশ্য কাতারের এই দানের ভূমিকা পছন্দ করেনি। সব মিলিয়ে মুরসির পদত্যাগ দাবি করে। ২০১৩ সালের জুন মাসেই জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসে মুরসির পদত্যাগের দাবি নিয়ে। সেনাবাহিনী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জনগণের বন্ধু সেজে আবার ক্ষমতায় চলে আসে এবং নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে বন্দী করে। কিন্তু মুরসি বিরোধীরা সেনাবাহিনীর রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে বুকে গুলিবরণ করে দিনের পর দিন মুরসির মুক্তির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায়। হাজার হাজার সেনাবাহিনী, শত শত ট্যাংকও জনগণকে ফিরিয়ে রাখতে পারছে না, হাজার হাজার মানুষ গুলি খেয়েছে, শত শত মুরসিপন্থী মৃত্যুবরণ করেছে, অঙ্গ হারিয়েছে কিন্তু আন্দেলন থেকে ফিরে যাচ্ছিলো না আর তাই সরকার জরুরি আইন করে মিটিং , মিছিল , আন্দোলন বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু আসলে কি বন্ধ করতে পেরেছে? দীনদশা ও দারিদ্র্যই জনগণকে পথে নামিয়েছিল। কিন্তু এখনকার অবস্থা কি? মিসরে একমাত্র খাদ্য খাতেই ঘাটতির পরিমাণ বিশ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে বিক্রয়যোগ্য কিছুই উত্পাদিত হয় না মিসরে। পর্যটনই একমাত্র বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ। কিন্তু পর্যটন ব্যবসা লাটে উঠতে বসেছে ক্রমাগত আন্দোলন ও রক্তারক্তির কারণে। এ অবস্থায় সেনাশাসকগণ আর কতদিন জনগণকে ঘরে বসিয়ে রাখতে পারবে? কতদিনইবা মুরসি বিরোধী যারা সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিল এই অবস্থা তারা মেনে নিতে পারবে? সামরিক বাহিনী যে গণতন্ত্রের রক্ষাকারী নয় বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে এ কথা মিসরীয় সকল জনগণকেই বুঝতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সেনাবাহিনীর এই এক হাল যে নিজের দেশের মানুষের ওপর খবরদারি করা এবং নিজ দেশের মানুষকে গুলি করে হত্যা করা। এই ধরনের বীরত্ব চিরতরে বন্ধ করা দরকার। সেনাবাহিনী ব্যারাকে বসে রাষ্ট্রীয় সব ধরনের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে আনন্দের জীবন কাটাবে আর জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়ে নিজের দেশের মানুষকে মারবে এই অবস্থা আধুনিক বিশ্বে আর চলতে দেয়া ঠিক নয়। সেনাবাহিনী হবে দেশের , জনগণের বন্ধু। তারা হা করে বসে থাকবে যে কখন সুযোগ আসে জনগণকে গুলি করার- এই দর্শন একেবাইে বন্ধ করতে হবে। জেনারেল সিসি তার উত্তরসূরী হুসনি মোবারকের অবস্থা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন, শিক্ষা নিতে পারেন পাকিস্তানের পারভেজ মোশাররফের অবস্থা দেখে। তিনি আর কতদিন ব্যারাকে থাকতে পারবেন। একদিন তাকে জনগণের সামনে হাজির হতে হবে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বও তখনও কাছে দাঁড়াবে না কারণ তারা যা করে অবস্থা দেখে করে অর্থাত্ কোন অবস্থায় কখন তাদের লাভর পাল্লা ভারি তারা তাই করে। সিসিকে একথা বুঝতে হবে, মুক্তি দিতে হবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে তিনি যে পার্টিরই হোক না কেন। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতেই হবে, তাতে তাদের লাভ দেশের লাভ। লেখক :আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক