পাঠাভ্যাস ও আমাদের শিশু-কিশোর

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:১০
শিশুদের জন্য আয়োজিত এক কর্মশালার সাক্ষাত্কার পর্ব চলছে। মোট ১৫৩ জন প্রতিযোগী, বয়স ১২ থেকে ১৬। সবাই খুব সিরিয়াস। এমন একটা পরিস্থিতি, যেন যেমন করেই হোক এই বৈতরণী পার হতে হবে। এক্ষেত্রে মায়েদের দুশ্চিন্তাই ছিল বেশি। কর্মশালার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতাকে উত্সাহিত করা। সাক্ষাত্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। ভাবতে কষ্টকর হলেও সত্যি এই ১৫৩ জন শিশু-কিশোর অধিকাংশই (২ জন বাদে) পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোন বইটি সর্বশেষ পড়েছে বা কবে পড়েছে মনে করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ বা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা নেই অধিকাংশেরই। সবারই প্রিয় লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। কিন্তু প্রিয় এই লেখকের কয়েকটি বইয়ের নাম জিজ্ঞাসা করেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। যে কারণে এই প্রসঙ্গের অবতারণা তা হলো শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস। জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে অনেক সুমহান অর্জন, রয়েছে গর্ব করার মতো বহু সাফল্য। মেধা ও মননে আমরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে আমাদের ঘাটতি রয়েছে, রয়েছে পরিপক্বতার অভাবও। একটা সময় ছিল যখন কোনো উত্সবে উপহার হিসেবে বইয়ের কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত প্রতিটি পরিবারেই এক আলমারি বই ড্রইংরুমের শোভা বর্ধন করতো। মা-বাবারাও কোনো উত্সব অথবা জন্মদিনে তাঁদের সন্তাদের বই উপহার দিতেন— এতে করে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার ব্যাপারে উত্সাহিত হয়ে উঠতো। আজ আর তেমনটি চোখে পড়ে না। সে স্থান এখন দখল করে নিয়েছে নতুন নতুন ডিজাইনের মোবাইল ফোন, আইপ্যাড, ল্যাপটপ, নিনটেনডো, প্লে-স্টেশনসহ আরো অনেক কিছু। যেহেতু তারা খোলা মাঠে যেয়ে খেলতে পারছে না, তাদের জন্য যথার্থ বিনোদনের ব্যবস্থা নেই; সেহেতু ইলেকট্রনিক্স এসব ডিভাইসের মধ্যেই তারা খুঁজে নিচ্ছে আনন্দ। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আর ভার্চুয়াল জগতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে কোমলমতি এই শিশু-কিশোররা, এতে শৈশব থেকেই তারা যন্ত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে তাদের সংবেদনশীলতা,সহমর্মিতা এবং সহনশীলতা। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের সৃজনশীলতা। তাদের কাছে নতুন একটা বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়ার চেয়ে নতুন কোনো গ্যাজেট অর্থাত্ ইলেকট্রনিক কোনো ডিভাইস বা মোবাইলের গন্ধ অনেক বেশি ভালো লাগে। কী ভয়াবহ এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত্ কর্ণধাররা ! এর প্রমাণ পাওয়া যায় পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই। উন্নত বিশ্বে গেলে দেখা যায় ট্রেনে, বাসে, স্টেশনে যেখানেই সময় পাচ্ছে বই পড়ছে তারা। তাদের বড় বড় শপিং মলগুলোতে নানারকম শোরুমের পাশাপাশি বইয়েরও মনকাড়া শোরুম থাকে। অথচ আমাদের দেশে যাও দু-একটা ছিল তাও যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা পড়ার অভ্যাস থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। আমরা ভাবছি না উন্নয়ন বলতে শুধুমাত্র বড় বড় শপিংমল , নতুন নতুন টিভি চ্যানেল বা দালানকোঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ উন্নত হয় ক্রমাগত জ্ঞানচর্চার মধ্যে দিয়ে এবং তার চিন্তার শক্তিকে শাণিত করে। আর পাঠাভ্যাস ছাড়া চিন্তাকে শাণিত করার, নিজেকে উন্নত করার আর কোনো শ্রেষ্ঠ উপায় নেই। শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রধান কিছু কারণ হচ্ছে—  পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়াকে অভিভাবকরা উত্সাহিত করেন না। পাঁচ শ টাকা দিয়ে ফাস্ট ফুড কিনে দিতে কোনো আপত্তি না থাকলেও বই কেনার ব্যাপারে রয়েছে প্রবল আপত্তি! পড়াশোনার ক্ষতির দোহাই দিয়ে বই কেনা থেকে নিবৃত্ত করা হয় সন্তানকে।  বহু শিক্ষকও আছেন যাঁরা পাঠ্যবই বহির্ভূত বই পড়াকে সমর্থন করেন না।  যথাযথ পাঠসামগ্রীর অভাব ও দেশি বইয়ের অপর্যাপ্ত মান। বিদেশি ভালো বইয়ের অতিরিক্ত দাম যা অধিকাংশেরই ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।  গ্রন্থাগারসমূহের জন্য অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ।  ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতি অতি মাত্রায় আগ্রহের কারণে প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ কমে যাচ্ছে।  শিশুসাহিত্য সম্পর্কে যথাযথ ধারণার অভাব। এক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান হচ্ছে একেবারে ছোটবেলাতেই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। এজন্য পরিবারকে সবার আগে সচেতন হতে হবে, বিশেষত মাকে। কারণ পরিবারই হচ্ছে শিশুর প্রথম বিশ্ব তথা শিক্ষালয়ও বটে এবং মা হচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু। গবেষণায় দেখা গেছে সাধারণত দুই বছর বয়স থেকেই শিশুরা রঙচঙে ছবির বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, যাতে মানুষ,পশুপাখি,বাড়ির নানারকম আসবাবপত্রের ছবি আছে তা দেখে শিশু ঝাঁপিয়ে পড়ে। যদিও এই বয়সের শিশুর পড়ার প্রশ্ন আসে না তবুও অন্যের পড়ার সুর শুনতে এবং পাঠরত মানুষের মুখের ভাব-ভঙ্গি উপভোগ করতে ভালোবাসে। অর্থাত্ তখন থেকেই পাঠের প্রতি তার একটা ভালোবাসা জন্ম নেয়। কিন্তু আমাদের বড়দের কারণেই ক্রমে ক্রমে তা হারিয়ে যায় । শিক্ষকদেরও সচেতন করতে হবে যাতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্য বই পড়ার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলেন। এ লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা এবং স্কুল ম্যাগাজিন ও দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া ও তা প্রকাশ করার ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা। প্রতিটি স্কুলে যদি গ্রন্থাগার স্থাপন করে, বই ইস্যু বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয় তাহলে অভ্যাসটা তৈরি হবে শুরু থেকেই। একজন শিশুকে যদি ৪০-৫০টা বই পড়ানো যায় তাহলে বইয়ের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারের সঙ্গে তার একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে যদি গ্রন্থাগার থাকে এবং যোগ্য গ্রন্থাগারিক থাকেন তবে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস নিশ্চয়ই গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। এছাড়াও পাঠসামগ্রীর মান উন্নয়ন করতে হবে, বই পাঠের গুরুত্ব সম্পর্ক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সহায়তায় প্রচারণামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিশুদেরকে উত্সাহী ও অনুসন্ধিত্সু করে তোলে এমন সব কর্মসূচি নিতে হবে সরকারি, বেসরকারি উভয়ভাবেই। প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, তথ্য ও সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। উন্নত প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কীভাবে পাঠাভ্যাস বাড়ানো যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের সবাইকে। ঢাকা