মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ—শিল্পী শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে সবসময় তিনটি বিষয় প্রাধান্য পায়। বিশ্বনন্দিত এ শিল্পী যে হাতে অস্ত্র ধরেছিলেন সেই হাতে শিল্পের তুলি নিয়ে দেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্বের দরবারে। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় জীবনভর তার শিল্পযাত্রার প্রেরণা।
গতকাল শনিবার ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী ও ফরাসী দূতাবাসের চার্জ দ্য এফেয়ার্স বাবু ক্যামিশেঠী। সভাপতিত্ব করেন বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গ্যালারি চিত্রকের নির্বাহী পরিচালক শিল্পী মুনিরুজ্জামান। শাহাবুদ্দিন আহমেদের ছবিতে সবসময় তীব্র গতি অনুভবন করেন দর্শকরা। এই গতির সামনে দাঁড়ালে অন্তরেও সেই গতি সঞ্চারিত হয়। তার ক্যানভাসে সবসময় যেন নির্ভয়চিত্তে সামনে এগিয়ে যাবার ডাক। অন্ধকার থেকে শুভ্রতার পথে যাত্রার আহ্বান। সেই যাত্রায় সকল অশুভকে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনার মন্ত্র। সেই জন্যই পেশিবহুল মানুষের এগিয়ে চলা, দুরন্ত ঘোড়া ও ষাঁড়ের ছুটে চলা তার প্রদর্শনীর প্রধান বিষয়। কিন্তু তার প্রেরণা যেন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দৃপ্ত ঘোষণা এবং তাঁর ৩২ নম্বরের বাড়িতে লুটিয়ে পড়ার ছবি তিনি বারবার বলে চলেছেন। এই বলার মধ্যদিয়ে তিনি যেন এই বিস্মৃতিপ্রবণ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চান — এই রাষ্ট্রের জন্মনায়কের কথা। বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাতেই আমাদের সুন্দর ভবিষ্যত্ সৃষ্টি সম্ভব- তার ক্যানভাস যেন সেই কথাই বলতে চাইছে।
শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন আঘাতপ্রাপ্ত মানুষ তার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি এক করে ছুটছে। এগুচ্ছে। এই আঘাতপ্রাপ্ত মানুষটি জীবিত। এ কারণে ক্যানভাসে লালের আঁচড়। সেই লাল তার রক্তের স্বাক্ষর রাখছে। প্রমাণ দিচ্ছে সে জীবিত। সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষটি এগুচ্ছে। একদিন অবশ্যই সে তার কাঙ্ক্ষিত লঙ্ক্ষ্যে পৌঁছাবে। এই যে প্রতিকূল পরিবেশে মৃত্য শঙ্কায় থেকেও মানুষের লঙ্ক্ষ্যে পৌঁছানোর দুরন্ত ইচ্ছা - এটাই আমি প্রকাশ করতে চাই।
শাহাবুদ্দিন ঢাকার চেয়ে বেশি প্যারিসেই বেশি সময় কাটান। তবু যখন দেশের আসেন তখনই বসে পড়েন রংতুলি হাতে। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের দুইটি প্রধান সময়কালকে ধারণ করে প্রদর্শনীর শুরু ও শেষ। একটি একাত্তরের ৭ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর। প্রদর্শনীর প্রথম চিত্রকর্মটি উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। তেল-রংয়ের বিশাল ক্যানভাসের ঠিক মধ্যখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চারপাশের লাখো জনতার ভিড় থেকে তাকে তার তর্জনী উঠিয়ে ভাষণ দেয়ার বিখ্যাত ভঙ্গিমায় দেখা মিললো। আর তার পিছনে মুক্ত বাতাসে উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। ‘৭ই মার্চ, ১৯৭১’ শিরোনামের এই চিত্রকর্মটি দিয়ে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটেছে ‘বিজয়’ শিরোনামের ছবিটির মাধ্যমে। এটিতে সবুজ প্রান্তরে লাল-সবুজ পতাকা হাতে মুক্তিযোদ্ধার বিজয় উল্ল¬াস পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রদর্শনীতে মোট ৩০টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে, চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
