আদালত অবমাননার কোন আইনই উচ্চ আদালতে টিকছে না। এ নিয়ে দু’বার আদালত অবমাননা আইন বাতিল করেছে হাইকোর্ট। এর আগে অগণতান্ত্রিক (১/১১) সরকারের আমলে প্রণীত আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ-২০০৮ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিলো। চলতি বছরে প্রণীত আদালত অবমাননা আইনটি ছিলো ২০০৮ সালের আইনের আদলেই তৈরি করা। এতে একদিকে যেমন সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আদালত অবমাননার দায় থেকে রেহাই দেয়া হয়েছিলো। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের আদালতের রায়, আদেশ, নির্দেশ প্রতিপালনে বিরত রাখতে সুকৌশলে কিছু বিধান ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওই বিধান বহাল থাকলে আদালতের আদেশ নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকত না। অন্যদিকে আদালত অবমাননা আইন ২০১৩ বাতিল হওয়ায় বিচার বিভাগ ও বিচারকের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে এবং বিচারকের ব্যক্তিগত অবৈধ কর্মকাণ্ডের ওপর কোন সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। এ ধরনের সংবাদ সত্য হলেও তা আদালত অবমাননা বলে গণ্য হবে। ইতিপূর্বে দেয়া হাইকোর্টের রায়ে এ অভিমত দেয়া হয়েছে। এর ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়বে। আদালত অবমাননার দুটি আইনই বাতিল হওয়ায় সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ ও ৮৭ বছরের পুরনো আইন দিয়ে আদালত অবমাননার বিচারকার্য পরিচালিত হবে। যদিও এই আইনে আদালত অবমাননার কোন সংজ্ঞা নেই।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বর্তমান সরকারের আমলে প্রণীত আদালত অবমাননা আইন ২০১৩ বাতিল এবং সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করে। এর আগে ২০০৮ সালের ২৪ জুলাই বিচারপতি এ, বি, এম, খায়রুল হক ও বিচারপতি মো. আবু তারিক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ১/১১ সরকারের আমলে অধ্যাদেশ আকারে প্রণীত আদালত অবমাননা আইন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছিলো। বাংলাদেশের ইতিহাসে উচ্চ আদালতে আর কোন আইনই সম্পূর্ণভাবে বাতিলের নজির নেই। আলোচ্য দুটি আইনই সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্প্রতি বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেনকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ২০১৩ সালে প্রণীত আইনটিকে বাতিল ঘোষণা করেন। তাদের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশ হয়নি। সম্পূর্ণরূপে কেন আইনটি বাতিল করা হয়েছিলো বিচারপতি খায়রুল হক তার রায়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, তর্কিত অধ্যাদেশের প্রায় সকল প্রধান ধারা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। যে সকল ধারা-উপধারা অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি, সেই সকল বিধান দ্বারা অধ্যাদেশটি কার্যকর করা যাবে না। এই অবস্থায় সম্পূর্ণ অধ্যাদেশটি বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করা হলো।
২০১৩ সালে প্রণীত আইনের আটটি ধারা যথা, ধারা-৪ (নির্দোষ প্রকাশনা বা বিতরণ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৫ (পক্ষপাতহীন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৬ (অধস্তন আদালতের সভাপতিত্বকারী বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৭ (কতিপয় ক্ষেত্র ব্যতীত খাস কামরায় বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৯ (আদালত অবমাননার পরিধি বিস্তৃত না হওয়া), ধারা-১০ (কতিপয় কর্ম আদালত অবমাননা নয়), ধারা-১১ (আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির বিধান) ও ধারা-১৩ (২) (আদালত অবমাননার শাস্তি) ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছিলো। কিন্তু হাইকোর্ট সম্পূর্ণ আইনটিই বাতিল ঘোষণা করে। বিচারপতি খায়রুল হক যে বিবেচনায় সম্পূর্ণ অধ্যাদেশটি বাতিল ঘোষণা করেছিলেন, সেই একই বিবেচনায় এক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়েছে।
আলোচ্য দুটি আইনের ক্ষেত্রে মৌলিক কোন পার্থক্য ছিলো না। প্রধান কয়েকটি ধারা দুটি আইনেই ছিলো। বিচারপতি খায়রুল হক এসব ধারা অবৈধ ঘোষণা করার পরেও সুকৌশলে ২০১৩ সালের আইনে তা আবার ঢুকিয়ে দেয়া হয়। যেমন, আগের (২০০৮ সালের) আইনের ৩ (৩) ধারায় বলা হয়েছিল, বিদ্যমান আইন, বিধি বা অন্য কোন বাস্তব কারণে আদালতের কোন রায়, আদেশ বা নির্দেশ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোন ব্যক্তির পক্ষে যথাযথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করা অসম্ভব হলে অনুরূপ কারণে বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করতে ব্যর্থতার কারণে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন বা কার্যধারা রুজু করা যাবে না বা ক্ষেত্রমত, রুজুকৃত বা চলমান আদালত অবমাননার কার্যধারা বাতিল হবে।
(৪) চলমান বিচারিক কার্যধারার অংশ নয় এমন কোন বিষয়ে কোন বিচারক বা আদালত কর্তৃক বা তার পক্ষে উহার প্রশাসনিক বা অন্য কোন ক্ষমতায়, প্রদত্ত কোন আদেশ, নির্দেশ, মতামত বা অভিমত এর লংঘন বা ব্যত্যয়কৃত কোন কার্য আদালত অবমাননা হিসাবে গণ্য হবে না।
(৫) এই অধ্যাদেশে অনুমোদিত হয়নি বা নিষিদ্ধ হয়েছে বিচারকের এইরূপ কোন কার্য দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ কোন ব্যক্তি প্রতিকার দাবি করিয়া উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত নালিশ দায়ের বা আবেদন পেশ কালে তা আদালত অবমাননা হিসাবে গণ্য হবে না।’
চলতি বছরের প্রণীত আদালত অবমাননা আইনের ১০ ধারায় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেগুলো হলো, ধারা ১০। আপাতত বলবত্ অন্য কোন আইনে কিছুই থাকুক না কেন - (১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোন ব্যক্তি কর্তৃক রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন, বিধিমালা, সরকারি নীতিমালা, যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন, স্মারক ইত্যাদি যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক জনস্বার্থে ও সরল বিশ্বাসে কৃত বা সম্পাদিত কর্ম আদালত অবমাননা হিসাবে গণ্য হবে না।
(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন কৃত কর্মের বিষয়ে কোন ব্যক্তি আদালতে শরণাপন্ন হলে এবং সেই ক্ষেত্রে আদালতের কোন রায়, আদেশ বা নির্দেশ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোন ব্যক্তির পক্ষে যথাযথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করা অসম্ভব হলে, অনুরূপ কারণে বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করতে ব্যর্থতার কারণে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন করা যাবে না।
যে ধারাগুলো একবার হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছে- সে একই ধারা দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচ্চ আদালতকে অবজ্ঞার শামিল বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মূলত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আদালত অবমাননার দায় থেকে রক্ষা করার জন্যই এই প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিলো। বিচারপতি খায়রুল হক এই ধারাগুলোকে আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছিলেন। তার রায়ে বলা হয়, সম্ভাব্য আদালত অবমাননাকারী সরকারি কর্মচারীগণকে অবৈধভাবে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই এই বিধান প্রণীত হয়েছে। উচ্চ আদালতের যে কোন আদেশ নির্দেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আপিল করতে পারেন কিন্তু কোন অজুহাতেই রায় বাস্তবায়ন করা হতে বিরত থাকতে পারেন না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আদালতের হাজিরা থেকে অব্যাহতি প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়, এটি একটি বৈষম্যমূলক আইন। বৈষম্যমূলক আইন সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কারণ, আইনের দৃষ্টিতে সকল অপরাধী আদালতের নিকট একই আচরণ পাবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীগণ আদালতের নিকট কোনরূপ প্রাধিকারমূলক আচরণ পেতে পারে না। এটি ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।
দুই আইনেই আদালতের চলমান বিচারিক কার্যধারা সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ কোন তথ্য, মন্তব্য বা সংবাদ প্রকাশ; বিচারিক কোন কার্য বা দায়িত্ব পালন সংশ্লেষে দুর্নীতি, অনিয়ম, অজ্ঞতা বা অদক্ষতার বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ কোন তথ্য, মন্তব্য বা সংবাদ জনস্বার্থে প্রকাশ; আদালত বা বিচারক সংশ্লেষে জনগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে কোন তথ্য, মন্তব্য, সংবাদ বা প্রতিবেদন জনস্বার্থে প্রকাশ; বিচারকের কার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন বিষয়ে কোন বিচারকের ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে তথ্য, মন্তব্য বা সংবাদ প্রকাশ আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো। এর মাধ্যমে আদালত অবমাননার একটি সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ৮৭ বছর আগের প্রণীত আদালত অবমাননা আইন ১৯২৬ এ অবমাননার কোন সংজ্ঞা ছিলো না। কিন্তু হাইকোর্ট এই বিধানগুলো সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করায় কোন বিচারকের দুর্নীতি এবং ব্যক্তিগত অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। এর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা হয়েছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ফলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জনগণের হতাশা, ক্ষোভ জনস্বার্থেও প্রকাশ করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে বলা হয়, বিচারিক কোন কার্য বা দায়িত্ব পালন সম্পর্কে কোন তথ্য, মন্তব্য বা সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ হলেও তা যদি জনসাধারণের সম্মুখে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে- তবে তা আদালত অবমাননাকর হতে পারে। কোন বিচারিক কার্য, অজ্ঞতা বা অদক্ষতা প্রসূত কিনা-তা নির্ধারণ করতে পারেন শুধুমাত্র সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, অন্য কেউ নন। কোন বিচারক ভ্রমাত্মক সিদ্ধান্ত প্রদান করলে আপিল আদালত তা পর্যালোচনা করতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র সে কারণে কোন বিচারককে জনসাধারণের সম্মুখে হেয় বা হাস্যকর করা যাবে না। তাহলে কোন বিচারকই সমালোচনার ভয়ে নির্ভিকভাবে রায় বা আদেশ প্রদান করতে পারবেন না। যদিও বিচার করা ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনের শপথ গ্রহণ করে থাকেন।
সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে আদালত অবমাননার কোন সংজ্ঞা নেই। বিচারপতি খায়রুল হক মনে করেন, কোন কোন ক্ষেত্রে বা কি পরিস্থিতিতে আদালত অবমাননা হবে বা হবে না তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। এটি কোন আইন দ্বারা সম্পূর্ণ নির্ধারণ করা যায় না। যদিও সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “সুপ্রিম কোর্ট একটি কোর্ট অব রেকর্ড হবেন এবং এর অবমাননার জন্য তদন্তের আদেশদান বা দণ্ডাদেশ দানের ক্ষমতাসহ আইনসাপেক্ষে অনুরূপ আদালতের সকল ক্ষমতার অধিকারী থাকিবেন।” সংবিধানে ‘আইন সাপেক্ষে’ কথাগুলো থাকলেও অতীতে আইনে নির্ধারিত দণ্ডের চেয়েও বেশি দণ্ড দিতে দেখা গিয়াছে।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন ও ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ৮৭ বছরের পুরনো আইন দিয়ে আদালত অবমাননার বিচার হচ্ছে। ঔপনিবেশিক আমলের আইন গণতান্ত্রিক এবং আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চলতে পারে না। ২০১৩ সালের আদালত অবমাননা আইনে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে সাংবাদিকদের সামনে কোনটি করলে আদালত অবমাননা হবে এবং কোনটি করলে হবে না- তার একটা স্পষ্ট ধারণা ছিলো। এই আইন বাতিল করায় আদালত অসীম ক্ষমতা ভোগ করবে। বিচারকের ব্যক্তিগত অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং ঘুষ দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে এটি আদালত অবমাননা হতে পারে না। কেননা একজন বা দু’জন খারাপ মানুষ দিয়ে সমগ্র বিচার বিভাগকে বিবেচনা করা যায় না। কিন্তু সংবাদপত্র যদি খারাপ মানুষের খারাপ কাজকে তুলে না ধরে তাহলে পাপী লোক বিচার আসনে বসে স ষ্টার দায়িত্ব পালন করেই যাবেন। তারা বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হবে। আশা করি আপিল বিভাগ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
