ড. ফাল্গুনী রাণী চক্রবর্ত্তী
‘‘কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী, প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।”[ কাজী নজরুল ইসলাম ]
শুধু প্রেরণা নয়, সাহস নয় । পুরুষের পাশাপাশি অস্ত্র হাতে অসীম সাহসে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে - বাংলার ‘সহজ-সরল’ নারীরাই। ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী’- এই ধ্যান-ধারণাই তাদেরকে আটপৌরে শাড়ির বন্ধন আলগা করে রণাঙ্গনে নিপুণ কৌশলে শত্রুপক্ষের সাথে লড়তে সাহসী করে তোলে। এমনি একজন সংগ্রামী নারী - প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১-১৯৩২) ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত মুক্তিসংগ্রামে প্রথম আত্ম্যোসর্গকারী নারী। প্রীতিলতা ১৯১১ সালে চট্টগ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রধান কেরানী। প্রীতিলতা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন । তিনি ইডেন কলেজ থেকে ঢাকা বোর্ডের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ গ্র্যাজুয়েশন করেন। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন তিনি লীলানাগের নেতৃত্বাধীন দীপালী সংঘের অন্তর্ভুক্ত শ্রী সংঘের সদস্য এবং কলকাতার কল্যাণী দাসের নেতৃত্বাধীন ছাত্রী সংঘের সদস্য হন। গ্রাজুয়েশন করার পর তিনি চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপর্ণাচরণ নামক একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৩০ সালে সমগ্র বাংলা জুড়ে বিভিন্ন বিপ্লবী দল সংগ্রামরত ছিল। প্রীতিলতার এক ভাই এই বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং তার মাধ্যমে তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ লাভ করেন। সে সময় মহিলাদের বিপ্লবী রাজনীতিতে যোগদানের কোন নিয়ম ছিল না। প্রীতিলতার ভাই মাস্টারদাকে তার রাজনৈতিক উত্সাহের কথা জানান এবং তার দৃঢ়তা ও গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত করেন।
মাস্টারদা অনুমতি দিলে প্রীতিলতাই হন সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের প্রথম মহিলা সদস্য। প্রীতিলতা টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস ও রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখলের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যেখানে তার দায়িত্ব ছিল বিস্ফোরক সংগ্রহ করা।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা পাহাড়তলীতে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের জন্য গঠিত দলটির নেতৃত্ব প্রদানের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এসময় জনৈক ইংরেজ যুবকের গুলিতে আহত অবস্থায় তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে পটাশিয়াম সায়ানাইড ভক্ষণ করে মাত্র তেইশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃতদেহের পোশাকে লেখা ছিল ‘আমরা দেশের মুক্তির জন্যে এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি।
