মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৩৪
মানুষের মন এক রহস্যের খনি। একেকজনের মন-মানসিকতা একেকরকম। কারও মন সহজ-সরল, কারও মনে থাকে ভীষণ জটিলতা। মানুষের মনের জট খুলে দেওয়াই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাজ। আমাদের নানাবিধ মানসিক সমস্যা নিয়ে তারা নিরন্তর গবেষণা করে থাকেন। মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে বের করেন একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাই এই প্রজন্মের মেধাবী কয়েকজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়জন। গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ড. মো. আমিনুর রহমান সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্ট যশোর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল তিনি তখন কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার, সদ্য বিসিএস-এর মাধ্যমে যোগদান করা চিকিত্সক। সেখানে অনেক রোগীর চাপ সামাল দিতে হয় তাকে। একদিন রোগী দেখতে দেখতে বাইরে এলেন, দেখলেন এক বৃদ্ধা লাইনে দাঁড়ানোর জন্য বাকবিতণ্ডায় মগ্ন, তাকে অন্য একজন ডাক্তারের লাইনে দেওয়া হয়েছিল, কিছুতেই বৃদ্ধা তা শুনবেন না, তাকে যে এই ডাক্তারই দেখাতে হবে। সেদিনের সেই সৌভাগ্যবান মেডিকেল অফিসারের নাম ডা. মো. আমিনুর রহমান। কতটা সৌভাগ্য নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন এর বড় প্রমাণ তার প্রতি রোগীদের অখণ্ড আস্থা ও অজস্র ভালোবাসা। একজন চিকিত্সকের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! তিনি বর্তমানে যশোর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। আর দশজন ছেলের মতো শৈশবে খেলাধুলার প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল আমিনুরের, হা-ডু-ডু খেলতে খেলতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতো তা মনেই থাকত না। এদিকে বাড়িতে সান্ধ্যআইন—সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফেরা চাই! আমিনুর সময়মতো ফিরে আসতেন বাড়িতে নিজ তাগিদে। হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যেতেন। তার বাবা ছিলেন শিক্ষক। পাঠ্য বিষয়ে কোনো কিছু না বুঝলে বাবাই তাকে সাহায্য করতেন। তাই এসএসসির আগ পর্যন্ত কখনও প্রাইভেট শিক্ষকের দ্বারস্থ হতে হয়নি। শৈশবের সেই দুরন্ত দিনগুলো তিনি কাটিয়েছেন যশোরে বাঘারপাড়ার আজমপুর গ্রামে। স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি দিয়ে চলে আসেন যশোর শহরে। সরকারি এমএম কলেজ থেকে এইচএসসি দিয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার কঠিন যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। পরবর্তীতে সাইকিয়াট্রিতে এমফিলসহ আরও অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। নতুনদের কাজ দেখে আমিনুর রহমান বেশ সন্তুষ্ট। কারণ তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে চায়। কিন্তু অনেক সময়ই কাজের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায় না, যেমন ইউনিয়ন পর্যায়েও এখন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, অথচ দেখা যায়, তাদের বসার জন্য চেয়ার-টেবিলও নেই। দুই ছেলে রিফতি এবং রাহাতকে সাথে নিয়ে কাটে তার অবসর সময়। শিক্ষিকা স্ত্রী তার ব্যস্ত জীবনকে গুছিয়ে রাখেন সযত্নে। দুই ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলতে চান আর সবাইকে সু-চিকিত্সা দিয়ে যেতে চান আজীবন—এটাই তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন। ড. মো. আমিনুর রহমান নাম :ডা. মো. আমিনুর রহমান ডাকনাম :আমিনুর জন্মতারিখ ও স্থান :১২ ডিসেম্বর, যশোর। মায়ের নাম :ফজিলাতুন্নেসা বাবার নাম :মো. লুত্ফর রহমান প্রথম স্কুল :রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :হযরত মুহম্মদ (স.) প্রিয় উক্তি :সততাই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা প্রিয় পোশাক :প্যান্ট ও শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :সংবাদপত্র পড়ে আর টিভি দেখে। সাফল্যের সংজ্ঞা : অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারাটাই সফলতা। ০০০ ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী মেডিকেল অফিসার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ মেডিকেলের ৫ম বর্ষেই সিদ্ধান্ত নেন অধিক পরিশ্রমের কোনো পেশা বেছে নেবেন না, যেমন গাইনি বা হূদরোগ। কারণ তিনি পেশার পাশাপাশি পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসেন এবং পেশার বাইরে তার কিছু একান্ত সময় চাই। শুরুতে রেডিওলোজি বিভাগে কিছুদিন ট্রেনিং করে দেখলেন রোগীর সাথে গল্প বা আলাপ না করে আরাম পাচ্ছেন না তাই মনোরোগ বিভাগে যোগ দেন। এখানে রোগীর সাথে আলাপ করার অফুরন্ত সুযোগ। জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এ এক অদ্ভুত অনুভূতি! সেই থেকেই শুরু ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরীর। বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গাতে ছোটবেলা কেটেছে, কখনও দেশে কখনোবা দেশের বাইরে। সে সময় বাবা তাদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন আর ঘুরে বেড়ানোর একটা পোকা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তার বাবা প্রকৌশলী ও মা শিক্ষিকা। মা-বাবা, এক ভাই, চিকিত্সক স্বামী ও একমাত্র ছেলে রামীনকে নিয়ে তার পারিবারিক আবহ। মনোচিকিত্সক হিসেবে কাজ নিয়ে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ সম্পর্কে বলেন, ‘চিকিত্সা পেশার অন্যান্য বিষয়গুলোর মতো আমার পেশায় রোগীর মৃত্যু হার নেই বললেই চলে—এটা আমার নিজের মনের একটা প্রশান্তি। প্রতিদিন নানা মানুষের নানা রকমের জটিল সব সমস্যা শুনে শুনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই আমাকে তিনি অনেক ভালো রেখেছেন তিনি। তাই সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করি নিজের পেশাটিকে।’ পেশা হিসেবে এটা আমাদের দেশে কতটা সমাদৃত জানতে চাইলে ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিদিন বাড়ছে নানা রকম চাপ তাই বাড়ছে অ্যাঙজাইটি, ডিপ্রেশন এবং আরও গুরুতর মানসিক রোগ। আমাদের চারপাশে মাদকাসক্তি, শিশু-কিশোরদের আবেগ ও আচরণগত সমস্যাগুলো বাড়ছে প্রতিদিন যা পরবর্তীতে সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাই এই পেশার কোনো বিকল্প নেই। তারচেয়েও বড় কথা মানসিক সুস্থতা ও শারীরিক সুস্থতা একে অপরের উপর নির্ভরশীল।’ এ পেশায় নতুনদের কাজ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুনরা অনেক মেধাবী এবং নিবেদিতপ্রাণ। তারা এখন অনেক আগ্রহ নিয়ে এ বিষয়ে পড়তে আসে। এ ছাড়া এই বিষয়ে আমাদের দেশেই এখন অনেক গবেষণামূলক কাজ হচ্ছে তাই সেবার মানও অনেক উন্নত হয়েছে আগের চেয়ে। মনোরোগ বিদ্যায় আছে অনেক শাখা প্রশাখা, ক্যারিয়ার হিসেবে এখন এটা অনেক সম্ভাবনাময় একটি বিষয়’ তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন, যতদিন সুস্থ থাকবেন মানসিক রোগীদের চিকিত্সা করে যাবেন এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের সাথি হয়ে থাকবেন। ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী ডাকনাম :রুমা জন্মতারিখ ও স্থান :২২ ডিসেম্বর, ঢাকা মায়ের নাম :সাবেরা খানম বাবার নাম :মো. শামসুল হক চৌধুরী প্রথম স্কুল :লায়ন্স কিন্ডারগার্ডেন স্কুল প্রিয় মানুষ :বাবা-মা প্রিয় উক্তি :It is nice to be important but it is more important to be nice. প্রিয় পোশাক :সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি অবসর কাটে যেভাবে : গল্পের বই পড়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :আপেক্ষিক একটা ব্যাপার, নির্ভর করে জীবনে কী চাই এবং কতটুকু চাই তার উপর। ০০০০ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট তার বাবার কাছ থেকে পান কষ্টসহিষ্ণুতা, পরিশ্রম এবং ‘সিম্পল লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং’-এর প্রথম পাঠ; আর মায়ের কাছ থেকে অপার ধারণশক্তি ও মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা পান তিনি। আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়বার সময় ছাত্ররাজনীতি তাকে নতুন জীবনদর্শনের পাঠ দেয়। তিনি গর্ব করে বলেন, ‘আমাদের সময় ছাত্ররাজনীতি ছিল মেধাচর্চার স্থান, সব অনাচার মুক্ত ছিল সে সময়কার ছাত্ররাজনীতি। নেতৃত্ব বিকাশ, সংস্কৃতি চর্চার চারণভূমি ছিল রাজনীতির ক্ষেত্রটি।’ কথাগুলো বলছিলেন ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তার শৈশব কেটেছে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের পৈত্রিক বাড়িতে। বড় পরিবারে নয় ভাইবোনের মধ্যে হেলাল উদ্দিন সবার ছোট, তাই তার ডাকনাম ছোটন। সবার ছোট বলে ভাইবোন সবার কাছ থেকে বাড়তি স্নেহ পেতেন। এখন তার দুই সন্তান ছেলে যুহায়ের, মেয়ে যুনাইরা, স্ত্রী ডা. তানজিনা হোসেন, মা আশরাফুন্নেসাকে নিয়েই তার পারিবারিক আবহ। মনোচিকিত্সক হিসেবে নিজের কাজ সম্পর্কে ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি চাকরিজীবন শুরু করি বারডেম হাসপাতালে স্নায়ুরোগ বিভাগে, সেখানে কাজ করতে করতেই আমার মনোচিকিত্সার প্রতি আগ্রহ জন্মে। পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করি। বর্তমানে কাজ করছি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। হাসপাতালে রোগীদের সেবা দান করা, আগামী দিনের মনোচিকিত্সকদের পড়ানো ছাড়াও নানা গবেষণা কর্মের সাথে জড়িত আছি। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, ২০০৯ সালে দেশে প্রথমবারের মতো শিশু-কিশোরদের মানসিক রোগ নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের জরিপে অন্যতম রিসার্চ অফিসার হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা ছিল আমার। এ ছাড়া ভারত-নেপাল-বাংলাদেশে পরিচালিত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিষণ্নতা পরিমাপের উপর আরেকটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় রিসার্চ সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে কাজ করেছি। বর্তমানে সাভারের রানা প্লাজায় ভবন ধসে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত মনোসামাজিক সেবা ও সে সংক্রান্ত একটি গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। দেশি-বিদেশি চিকিত্সা জার্নালে মূল বা সহযোগী লেখক হিসেবে আমার প্রকাশিত মোট বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের সংখ্যা ৩৭টি।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন আমার পেশা ও বিষয়কে আর্ন্তজাতিক মানে উন্নীত করা।’ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ ডাকনাম :ছোটন জন্মতারিখ ও স্থান :১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩, ঢাকা মায়ের নাম :আশরাফুন্নেসা বাবার নাম :মরহুম জাঈনউদ্দিন আহমেদ প্রথম স্কুল :গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল ঢাকা প্রিয় মানুষ :আমার আব্বা প্রিয় উক্তি :পা বাড়ালেই পথের শুরু। প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, লেখালেখি করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :চারপাশের মানুষজনের ভালোবাসা পাওয়া, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া।