উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা মত অনুন্নত অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেও যারা নিজেদের মেধা ও নেতৃত্বের গুণে দেশের রাজনীতি এবং শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রেখেছেন গৌরবময় ভূমিকা। নিজের খ্যাতির পাশাপাশি গাইবান্ধাকেও তাঁরা করেছেন গৌরাবান্বিত। যুগ যুগ ধরে এই বরেণ্য ব্যক্তিদের গাইবান্ধাবাসী শ্রদ্ধার সংগে স্মরণ করবেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
কবি সাকের মামুদ
১১৮৮ থেকে ১১৮৯ বঙ্গাব্দের মধ্যে সাকের মাহমুদ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মধুমালা রচনা করেন। সাকের মামুদের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি ১৭৪৯ কিংবা ১৭৫০ সালে গাইবান্ধা সদরের বাদিয়াখালি ইউনিয়নের রিফাইত্পুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শেখ মামুদ। সাকের মামুদ গোবিন্দগঞ্জ বর্ধ্বন কুঠিরের রাজা গৌরনাথের পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যচর্চা করতেন। রাজা গৌরনাথ ছিল সাহিত্যপ্রেমী। তাই তার কাছে সাহিত্যসেবীদের কদর ছিল। সাকের মামুদ তার সাহিত্যে রাজা গৌরনাথ ও তার পূর্ব পুরুষের প্রশংসা কীর্তন দেখে এমন ধারণা করা হয়।
খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ
খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ গাইবান্ধা সদরের কোমরনই গ্রামে ১৮৮০ সালে তিনি সর্দার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজরা যখন এদেশে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে, তাতে হিন্দুরা অংশগ্রহণ করলেও কুসংস্কার বশে মুসলমানরা এ থেকে বিরত থাকে। এসময় খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ অনগ্রসর মুসলমানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার মহান দায়িত্বপালন করেন। গাইবান্ধা কেন্দকাল সদস্য ছিলেন এবং একজন অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নীলকমল লাহিড়ী
গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা জমিদার পরিবারে ১৮২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ লেখক ছিলেন। ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ’ এর জন্মলগ্ন থেকে তিনি সংগঠনটির সাথে জড়িত ছিলেন। পাঁচ বছর পর্যন্ত ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৮৯৭ সালে তিনি পরলোকগমন করেন।
মোহাম্মদ উদ্দিন আহম্মদ আনছারী
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানার গোপালপুর মতান্তরে আমলাগাছি গ্রামে তিনি ১৮৬৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হায়াত্ মাহমুদ। মোহাম্মদ উদ্দিন আনসারী ছিলেন একজন স্বতন্ত্রধর্মী লেখক। তিনি আমলাগাছি উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া তিনি সে সময় ইসলাম ধর্মের প্রতি খ্রীস্টান ধর্মযাযকদের আক্রমণ প্রতিরোধ ও এবং ধর্মত্যাগী মুসলমানদের স্বধর্মে ফিরিয়ে আনতে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। মুসলমান সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় কুসংস্কার মূলোচ্ছেদ করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে মহরমকাণ্ড ও বিশ্বনবী পাঠক সমাজে সর্বাধিক প্রচারিত। ১৮২৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সুরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী
নলডাঙ্গার জমিদার পরিবারের আর এক কৃতিসন্তান সুরেন্দ চন্দ লাহিড়ী। আনুমানিক ১৮৭৫ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শিবচন্দ লাহিড়ী। সুরেন্দ চন্দ লাহিড়ী ছিলেন একজন সঙ্গীত ও নাট্যশিল্পী। রঙ্গপুরের নাট্যচর্চার আদি প্রতিষ্ঠান রঙ্গপুর নাট্যসমাজ ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম সদস্য ছিলেন সুরেন্দ চন্দ লাহিড়ী। রঙ্গপুর নাট্যসমাজের নাট্যশিল্পী ও কলাকুশলীদের দ্বারা মঞ্চস্থ ‘মেঘনাদ বধ,’ ‘সাজাহান’সহ বিভিন্ন নাটকের অভিনয়ে অংশগ্রহণকারী নাট্যশিল্পীদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ইংরেজ আমলে সুরেন্দ চন্দ লাহিড়ীর প্রচেষ্টায় নলডাঙ্গার জমিদার বাড়ীতে সঙ্গীতচর্চা বিস্তার লাভ করেছিল। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সাধনায় তিনি নিয়োজিত করেছিলেন স্বীয় প্রতিভা। এছাড়া ক্লারিওনেট, করনেট, এস রাজ, বেহালা ও সেতারের তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিল্পী। এককথায় সঙ্গীতের প্রায় সকল বিভাগে তার দক্ষতা ছিল অসামান্য। ১৯৪৭ সালে দেশবিভক্ত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে সুরেন্দ চন্দ লাহিড়ী পরলোকগমন করেন।
আবুল হোসেন ভট্টাচার্য রঙ্গপুরী
তিনি ছিলেন একজন ধর্মান্তরিত মুসলমান। ১৮৮০ সালে তিনি গাইবান্ধায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রখ্যাত আলেম ও বক্তা হিসাবে তার সুখ্যাতি ছিল। এছাড়া তিনি বিশ্বনবীর বিশ্ব সংসার, মরুরর ফুল, সুরা ফাতেহা, রোজাতত্ত্ব বা রমযান ও সংযম সাধনা, শান্তিধারা, ইসলামতত্ত্ব, ‘কোরান ও বেদ’ এবং আমি কেন ইসলাম গ্রহণ করিলামসহ অনেক বই রচনা করেছেন।
টি আই এম নুরুনুরী
১৮৮৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার চন্দিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নিয়ামত উল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন বড় জোতদার। টি আই এম নুরুন্নবী চৌধুরী ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম মুসলমান আই সিএস অফিসার। এছাড়া তিনি ছিলেন এদেশের স্বনির্ভর আন্দোলনের প্রবক্তা। এই কাজের জন্য তিনি শুধু দেশেই নয় বিদেশেও প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন।
কে আই এম কেজের আলী
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর থানার গড়েয়া গ্রামে ১৮৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তার রচিত সামাজিক চিন্তামূলক গ্রন্থ ঘরের কথা, পীরখাঞ্জা, রাইরের ডাক, কবিকার বই খুদকুঁড়ো, রেখা। তিনি ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন রংপুরে ইন্তেকাল করেন।
তুলসী লাহিড়ী
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গার জমিদার সুরেন্দ চন্দ লাহিড়ীর ছেলে তুলসী লাহিড়ী ১৮৯৭ সালে পিত্রালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রসিদ্ধ নাট্যকার। তুলসী লাহিড়ীর পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল হেমন্দ চন্দ লাহিড়ী। ১৯০৫ সালে স্কুল ছাত্রাবস্থায় বন্ধুদের সাথে মিলে বড়লাট “কার্জন বিরোধী” আন্দোলনে সামিল হন। ফলে তার নামে জারি হয় গ্রেফতারী পরোয়ানা। পরবর্তীতে কলকাতা থেকে কোচবিহারে গিয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে হেমন্দ চন্দ লাহিড়ী থেকে হয়ে যান তুলসী লাহিড়ী। সেখানে বিএ পাস করে চলে আসেন কলকাতা। কলকাতা আইন কলেজ থেকে বি এল পাস করার পর রংপুরে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এছাড়া তিনি ওই সময়ে রংপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পরেন। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক শিল্পপ্রতিভার অধিকারী। একাধারে মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রাভিনেতা, নাট্যকার, সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, চিত্র নাট্যকার, চিত্র পরিচালক ও বিভিন্ন ধরনের বাধ্য যন্ত্রও বাজাতে পারতেন। ওই সময় তার গাইবান্ধার নলডাঙ্গা জমিদার বাড়ীতে প্রায় নাটক মঞ্চস্থ হতো। এখনও তার বাড়ীতে সেই কাচারী ঘরের সাথে মঞ্চটি দাঁড়িয়ে আছে। তুলসী লাহিড়ী রচিত নাটকগুলো হল, ছেঁড়াতার, দুঃখীর ঈমান, পথিক, লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার, ক্ষণিকের অতিথি প্রভৃতি। ১৯৫৯ সালের ২২ মে জনু তিনি পলোকগমন করেন।
সিরাজ উদ্দিন আহমেদ
সিরাজ উদ্দিন আহমেদ ১৯৫২ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পীকার ছিলেন। তিনি ১৮৯৫ সালে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর থানার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের আমডহর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। সিরাজ উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ১৯৪৬ সালে পূর্ববাংলার ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচিত সদস্য হিসেবে। ১৯৫২ সালে তিনি ২য় বার এমএলএ নির্বাচিত হয়ে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি মুসলিমলীগের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। সিরাজ উদ্দিন আহমেদ তত্কালীন রংপুর জেলার মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত থেকে বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। ১৯৬৯ সালের ১৯ জুন তিনি গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানী পাড়ার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।
আহমেদ হোসেন
আহমদ হোসেন সাঘাটা থানার যাদুর তাইর গ্রামে ১৮৯৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবীতে বিএ পাস করেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করে তিনি গাইবান্ধায় আইন ব্যবসা শুরু করেন। তিনি এ সময় অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন এবং ১৯৩৭ সালে মুসলীম লীগের প্রার্থী হিসেবে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তিনি যুক্ত ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভায় কৃষি মন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। মন্ত্রী থাকাকালে আহমেদ হোসেন গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে রংপুর চিনিকল, গাইবান্ধায় কৃষি সমপ্রসারণ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও মহিমাগঞ্জের বিশাল আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। তিস্তা থেকে পাবনার বেড়া থানা পর্যন্ত দীর্ঘ এ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটিও তার চিন্তার ফসল।
হামিদ উদ্দিন খাঁ
তিনিই ছিলেন বৃটিশ আমলে এ অঞ্চলের প্রথম এম এল এ। আইন ব্যবসা দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ইংরেজ সরকার ১৯২১ সালে ব্যবস্থাপক সভা নামে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে যে আইন পরিষদ গঠন করেন। হামিদ উদ্দিন খাঁ গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম মহকুমা নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক এলাকার সেই আইন পরিষদের প্রথম সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় তিনি ইংরেজ প্রদত্ত ‘খান সাহেব’ উপাধি পরিত্যাগ করেন। হামিদ উদ্দিন খাঁ গাইবান্ধা মিউনিসিপ্যালিটিরও প্রথম মনোনীত ভাইস চেয়ারম্যান।
তছলিম উদ্দিন খাঁ
১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা মিউনিসিপ্যাল পার্কে শহীদদের স্মৃতির স্মারক হিসাবে প্রথম শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তছলিম উদ্দিন খাঁর ভাষা আন্দোলনে সংগ্রামী ভূমিকা রয়েছে। তিনি গাইবান্ধা কেন্দ ীয় সমবায় ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী ও গাইবান্ধা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি কলিকাতা ‘ল’ কলেজ থেকে আইন পাস করে গাইবান্ধা কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তছলিম উদ্দিন খাঁ রাজনীতির ক্ষেত্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর অনুসারী ছিলেন।
আবু হোসেন সরকার
আবু হোসেন সরকার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর থানার খোর্দকোমরপুর গ্রামে ১৮৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সরকার আবদুল্যাহ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু হলে আবু হোসেন সরকার রংপুরে সক্রিয়ভাবে তাতে যোগ দেন। ১৯১৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। সাদুল্লাপুর ও বাসুদেবপুর হাইস্কুলে কিছুদিন শি?ক্ষকতার পর কলকাতা আইন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রী লাভ করেন। গাইবান্ধা ও রংপুরে আইন ব্যবসা শুরু করেন। স্বল্প সময়ে তিনি এ পেশায় খ্যাতি অর্জন করেন। কলকাতায় আইন অধ্যায়ন এর সময় তিনি কংগ্রেস পরিচালিত বিট্রিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯২২ সালে কারাবরণ করেন।
শেখ শাহ মোহাম্মদ আলী
শেখ শাহ মোহাম্মদ আলী ১৮৯৮ সালে সাঘাটার পদুমশহর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শেখ আব্দুল্লা ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তিনি কারমাইকেল কলেজের ছাত্র থাকাকালীন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন এবং সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার কারণে তিনি ১৯২১ সালে, ১৯৩১ সালে এবং ১৯৩২ সালে কারারুদ্ধ হন। শেখ শাহ মোহাম্মদ আলী রংপুর জেলা কৃষক প্রজাপার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মূল পেশা আইন ব্যবসায় থেকে রাজনীতির সাথে জড়িত হয়েও শেখ শাহ মোহাম্মদ আলী দীর্ঘকাল সাহিত্য চর্চা করেছেন। তার রচিত কবিতার সংখ্যা প্রায় একশ’।
শাহ আব্দুল হামিদ
বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম স্পীকার শাহ আব্দুল হামিদ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানার গুমানিগঞ্জ ইউনিয়নের খলসী গ্রামে তিনি ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শাহ আব্দুল হামিদ ছাত্র জীবন থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ১৬ জন ছাত্র আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেছিলেন শাহ আব্দুল হামিদ তাদের অন্যতম। ১৯৩৬ সালে তিনি মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট হিসাবে গাইবান্ধায় পার্টিকে সংগঠিত করেন এবং ১৯৪৬ সালে পার্টির মনোনয়নে কেন্দ ীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে কেন্দ ীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম স্পীকার নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ট সাহচর্যে থেকে রাজনীতি করেছেন। তিনি ক্রীড়াবিদ, সংগঠক এবং একজন বিশিষ্ট সংস্কৃতি সেবী ছিলেন। তিনি নিজে নাটক করেছেন এবং নাট্য সংস্থার (সাবেক জি সি ডি সি) সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ সালে শাহ আব্দুল হামিদ রংপুর জেলা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসাবে গোবিন্দগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে শিক্ষায়াতন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি গাইবান্ধা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। শাহ আব্দুল হামিদ ১৯৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মৌলভী এ কে এম খোদাবকস্ সরকার
মুন্সী আসের মামুদ সরকারের পুত্র খোদাবকস্ সরকার ১৯০৪ সালে পলাশবাড়ি থানার দুর্গাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১০ম শ্রেণীর ছাত্র থাকাবস্থায় খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন এবং ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করেন। পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। সর্বভারতীয় আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ভারতে স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হয়েও মহাত্মাগান্ধী কর্তৃক স্থগিত ঘোষিত হওয়ার সংবাদ পলাশবাড়ীতে যথাসময়ে না পৌঁছার কারণে ১৯২০ সালের আগস্ট মাসে কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের পলাশবাড়ীর নেতা-কর্মীর স্থানীয় নেতা ফজর উদ্দিন তালুকদারকে দিয়ে পলাশবাড়ীতে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করিয়ে ছিলেন। ফলশ্রুতিতে এই এলাকা ১৩ দিন বৃটিশ আধিপত্য মুক্ত ছিল। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন খোদাবকস্ সরকার। এই স্বাধীনতা ঘোষণা সমগ্র ভারতকে আলোড়িত করে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের কারণে সংশ্লিষ্ট অন্য নেতাদের সাথে খোদাবকস্ সরকার সে সময় গ্রেফতার হয়ে তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন।
শেখ মুহাম্মদ ছদরুদদীন
গাইবান্ধার সুন্দরড়ঞ্জ থানার বেলকা গ্রামে ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩২ সালে সালে তিনি কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে বি এ (সম্মান) ডিগ্রী অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ জিলা স্কুল ও ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান টেক্সটবুক বোর্ডের সদস্য সচিব এবং অবসরের আগে ডিডিপি আই এর দায়িত্ব পালন করেন। তার রচিত বইয়ের মধ্যে কবিতার বই মানুষ, তিসতা, এক ফালি চাঁদ, সংগ্রাম, পয়গাম, শিশুদের জন্য দেশ বিদেশের রূপকথা, ছোটদের কোরান, আওরঙ্গজেব, খেলার পতুল, স্বপ্নে পাওয়া দেশ, স্মৃতি কথা বিষয়ক বই দেশকালপাত্র, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই রক্তকণ্ঠ, মুক্তিযাদ্ধোত্তর বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৯০ সালের ২০ মে ইন্তেকাল করেন।
হরিশ চন্দ্র চৌধুরী
১৯১২ সালে গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর থানার দামোদরপুর ইউনিয়নের এক সম্ভান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশুনার জন্য তিনি তাদের গাইবান্ধা শহরস্থ মধ্যপাড়ার স্কুল লেনের বাড়িতে থাকতেন। কলেজে পড়ার সময় হরিশ চন্দ চৌধুরী তদানীন্তন কংগ্রেসে যোগদান করেন। তিনি ১৯৩৩-৩৪ সালে অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। উক্ত আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে গাইবান্ধা থেকে হরিশ চন্দ চৌধুরীসহ ২৬ জন গ্রেফতার হন। হরিশ চন্দ চৌধুরী বহরমপুর জেলে ২ বছরের অধিককাল কারারুদ্ধ ছিলেন। কারামুক্ত হয়ে তিনি গাইবান্ধা শহরস্থ বাড়িতে এসে বসবাস করার সময় বিপ্লবী সংস্থা ‘যুগান্তর’ এর সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দামোদরপুরে নিজ বাড়িতে স্বাধীনতার পক্ষের অনেককে আশ্রয় দেয়ার কারণে তাকে অক্টোবর মাসে পাক হানাদার বাহিনীর দোসররা ধরে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে।
পরেশ চন্দ্র চৌধুরী (ব্যাঙ চৌধুরী)
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত এদেশের মানুষের কল্যাণে সৃষ্ট সকল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার অপরাধে যাকে জীবনের অধিকাংশ সময় কারাগারের অন্তরালে কাটাতে হয়েছে তিনি হচ্ছেন গাইবান্ধার পরেশ চন্দ চৌধুরী। ‘ব্যাঙ চৌধুরী’ নামে সর্বাধিক পরিচিত। তিনি ১৯১৯ সালে সাদুল্লাপুরের দামোদরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। এতদাঞ্চলে রাজনৈতিক কারণে দীপান্তরিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ব্যাঙ চৌধুরী ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। রাজবন্দীদের মুক্তি আন্দোলনের ফলে ব্যাঙ চৌধুরী জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন। ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ার কারণে ১৯৪২ সালে পুনরায় তাকে গ্রেফতার করে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে আটকে রাখা হয় এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। ভারত বিভক্তির পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের সময় তিনি মুক্তি পান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে সামরিক সরকার ব্যাঙ চৌধুরীকে আটক করে এক বছর কারারুদ্ধ করে রাখে। অগ্নিযুগের সংগ্রামী পুরুষ ব্যাঙ চৌধুরী ১৯৯২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
দৌলতুন নেছা
তার পিতা মোঃ ইয়াছিন আলী ছিলেন রেলওয়ে স্টেশন মাষ্টার। তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক অংগনের আলোচিত ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা পালনকারী। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি ডাঃ হাফিজুর রহমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং গাইবান্ধা শহরের পি, কে, বিশ্বাস রোডস্থ বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করেন। দৌলতুন নেছার সাহিত্য প্রতিভা অবিস্মরণীয়। সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে নিজেকে সুপরিচিত করে তোলেন। তার প্রকাশি বই স্বর্ণাদ্যান, জীবন তারা প্রভৃতি।
কাজী মোঃ বদরুদ্দোজা
তিনি ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারী গাইবান্ধা সদরের পি কে বিশ্বাস রোডস্থ তার পৈত্রিক বাসভবনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ও সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক এন্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিষয়ে ডিপ্লোমা লাভ করেন। কাজী মোঃ বদরুদ্দোজা বিশাল সাইজের কাজী পেয়ারার উদ্ভাবক। জাতীয় কৃষি গবেষণা কেন্দে র আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন গবেষক ও বিজ্ঞানী কাজী মোঃ বদরুদ্দোজার গবেষণালব্ধ নতুন জাতের এই পেয়ারাটির নামকরণ তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ তার নামের সাথে সংগতি রেখে ‘কাজী পেয়ারা’ রাখা হয়। এছাড়াও তিনি উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল গম বীজ উত্পাদন করেছেন। তিনি কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেছেন।
মুকিতহরণ সরকার
শিশু-সাহিত্যিক মুকিতহরণ সরকার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের ধনকুঠি গ্রামে ১৯৪৮ সালে ১৬ আগষ্ট জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নীলমাধব সরকারের পেশা ছিলো শিক্ষকতা। পণ্ডিত পিতার তত্ত্বাবধানেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষার অনেকটা পথ পাড়ি দেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এম.এ ডিগ্রী নেন ১৯৮০ সালে। আক্ষরিক অর্থে চাকরি বলতে যা বোঝায় তার সাথে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি কামারপাড়া মানময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার করেন। তার প্রত্যহিক জীবনাচারে এবং স্ব-সৃষ্ট সাহিত্যকর্মের ছত্রে-ছত্রে তার স্বাক্ষর অঙ্কিত। তার প্রকাশিত বই হলো, গল্প সঙ্কোলন ‘জানা কয়েকের গল্প’, বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ক বই নাম ‘বাংলা ব্যাকরণের কয়েকটি বিষয়’। শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ‘কেয়াপাতার নৌকা, ‘রাহু রাজা শনি মন্ত্রী’, ‘সংকলিত শিশুতোষ ছড়া’ ‘মুকতিহরণ সরকার রচনা সমগ্র’।
