দেশের গার্মেন্টস খাত আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে রাজপথ তোলপাড় করে চলেছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হাজার হাজার বস্ত্রবালিকা ও বস্ত্রবালকবৃন্দ নিজ-নিজ কারখানায় কাজ বন্ধ করে বাঁচার মতো মজুরির দাবিতে সপ্তাহকাল ধরে প্রতিদিনই মিছিল-সমাবেশ করছে।
অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই। তাদেরকে ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেয়া হয়নি ও করতে দেয়া হয় না। কিন্তু তাতে করে কি পেটের দাবি বন্ধ করা যায়? পেটের জ্বালায় গড়ে ওঠা শ্রমিকদের এই আন্দোলন অনেকটা নেতৃত্বশূন্য অবস্থাতেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ কারণে আন্দোলনের প্রাণশক্তি দুর্দমনীয় হলেও, সামগ্রিক আন্দোলনে একটি এলোমেলো, অগোছালো, অসমন্বিত ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা বিরাজ করছে। কিছু জায়গায় ভাঙ্গচুরের ঘটনাও ঘটছে। আন্দোলনের মূল চালচিত্র ও শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় দাবির ন্যায্যতাকে ‘বদনামের’ ভাগীদার করে জনমতকে তার বিরুদ্ধে বিরূপ করে তোলার জন্য একশ্রেণির বুর্জোয়া প্রচার মাধ্যমে ভাঙ্গচুরের এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে হাইলাইট করে খবরা-খবর প্রকাশ করা হচ্ছে।
ন্যূনতম মজুরির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলনের স্বার্থের কথা ধরলে এসব বিছিন্ন ভাঙ্গচুরের ঘটনা মোটেও সহায়ক ও আকাঙ্ক্ষিত বলা যায় না। এসব ঘটনা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জন্য অবাঞ্ছিত ও ক্ষতিকর। হতাশা ও ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয়া কিছু শ্রমিকদের বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খলতা এসব ঘটনার জন্য কিছুটা দায়ী। শ্রমিকদের এ ধরনের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতাকে চেতনা ও সংগঠন প্রসূত ‘কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল’ দ্বারা নিয়মতান্ত্রিক ধারায় শ্রেণি-সংগ্রামের পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো যদি কারখানায়-কারখানায় শ্রমিকদের নিজস্ব নির্বাচিত ট্রেড ইউনিয়ন থাকতো। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ ও দাবি দাওয়ার সংগ্রামকে সঠিক ধারায় পরিচালনা করবে কে? জাতীয় শ্রমিক সংগঠন অথবা বিভিন্ন গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন অনেক আছে ঠিকই। কিন্তু কারখানাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতির কারণে এগুলো ঢাল-তলোয়ারহীন ‘নিধিরাম সর্দার’ হয়ে আছে। ‘শ্রমিক-মালিক ঐক্যের’ শ্লোগান দিয়ে জবরদস্তিমূলকভাবে কৃত্রিম যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দ্বারাও গার্মেন্ট শ্রমিকদের বুঝ দিয়ে রাখা যায়নি। হঠাত্ করে গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জনৈক মন্ত্রী মহোদয়ের সে উদ্যোগ বরঞ্চ ব্যাক-ফায়ার করে পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করেছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীর ডাকে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গার্মেন্ট শ্রমিকদের মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। যদিও এই সমাবেশের দাবি ছিল একাধিক, কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকদের কাছে সমাবেশের উদ্দেশ্য এ বলে প্রচার করা হয়েছিল যে, এই সমাবেশ ডাকা হয়েছে শ্রমিকদের ৮ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরির দাবিতে। সরকারের মন্ত্রী, যাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিনা গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিষয়টি ‘দেখার’ দায়িত্ব দিয়েছেন, যেহেতু নিজে মহাসমাবেশে উপস্থিত থাকবেন তাই সকলেরই এরূপ ধারণা হয়েছিল যে, সমাবেশে তার মুখ থেকে ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির ঘোষণা হতে চলেছে। শ্রমিকরা সেরূপ আশা নিয়ে সমাবেশে এসেছিল। কিন্তু যখন মন্ত্রী মহোদয় ৮ হাজার টাকার ঘোষণার বদলে ‘মাঝামাঝি সমঝোতার’ কথা বললেন তখন শ্রমিকরা ভাবলো যে, মন্ত্রী তাদেরকে আশা দিয়ে সমাবেশে ডেকে এনে চরমভাবে প্রতারিত করেছে। ফলে গোটা বিষয়টি হয়ে উঠলো ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো ব্যাপার। কারখানায় ফিরে গিয়ে শ্রমিকরা ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির জন্য তাদের দাবির সাথে প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের খেলার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
শ্রমিকের মনে আগুন জ্বলে উঠেছিল আরো আগে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সার্বজনীন ৮ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যখন মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ প্রভৃতি সংস্থা ঘোষণা করলো যে, তারা খুব বেশি হলে ৩ হাজার ৬শ’ টাকা ন্যূনতম মজুরি দিতে প্রস্তুত। সব শ্রমিকরা সেই ঘোষণাকে তাদের সাথে মালিকদের তামাশা ও চরম অপমানজনক প্রবঞ্চনা বলে বিবেচনা করলো। শ্রমিকরা তখন থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছিল। ‘শ্রমিকের জান’ বলে পরিচয়দানকারী মন্ত্রী মহোদয় এর সমুচিত জবাব হিসাবে ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জোরের সাথে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণার বদলে যখন ‘মাঝামাঝি ফয়সালার’ ফর্মুলার কথা বললেন তখন শ্রমিকরা নিজেদেরকে প্রতারিত মনে করলো। পুঞ্জীভূত সেই ক্ষোভ ফেটে পড়লো স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে।
দেশের গার্মেন্টস খাতে বর্তমানে যেসব ভাঙ্গচুরের ঘটনা ঘটছে তার প্রধান ও একমাত্র সূত্র শ্রমিক ও তাদের হতাশা-ক্ষোভের বিস্ফোরণ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ঘটানো হচ্ছে বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বারা। উস্কানি দেয়া হচ্ছে বাইরে থেকে। এমনকি বহিরাগত ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে ‘ঘটনা’ ঘটানো হচ্ছে। এক মালিক অন্য মালিককে প্রতিযোগিতায় কোণঠাসা করার জন্য বিপক্ষের কারখানায় ভাঙ্গচুর উস্কে দিচ্ছে। আন্দোলন দমনের জন্য অজুহাত তৈরির উদ্দেশ্যে ‘এজেন্ট প্রভোকেটর’ ঢুকিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি ভাঙ্গচুর ও নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার ছক কার্যকর করা হচ্ছে। ‘ঝুট’ ব্যবসা দিয়ে লালিত মালিকদের মাফিয়া-গুণ্ডা দল মালিকের কাছে নিজেদের অপরিহার্যতার প্রমাণ তুলে ধরার জন্য ‘সর্প হয়ে দংশন কর, ওঝা হয়ে ঝাড়ো’-এর কৌশল প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রিত ভাঙ্গচুর চালাচ্ছে। সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠতে না দেয়ার কারণেই গার্মেন্টস খাতে নৈরাজ্য দূর না হয়ে তা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
শ্রমিকের মজুরি কি হবে তা নিয়ে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে যৌথ দরকষাকষি হলো একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। এই দরকষাকষির ক্ষেত্রে শ্রমিকের জন্য যথাসম্ভব বেশি মজুরি আদায় করে নেয়াই হলো শ্রমিক নেতৃত্ব ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অন্যতম প্রধান কর্তব্য। পক্ষান্তরে, মালিক বা তাদের সমিতির দায়িত্ব হলো কতো কম মজুরিতে ফয়সালা করা যায় সে জন্য দরকষাকষি করা। দু’পক্ষের দরকষাকষির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত মজুরির হার কি হবে। উভয়ের হাতে দরকষাকষির জন্য নানা অস্ত্র আছে। সেগুলো প্রয়োগ করে, অথবা প্রয়োগ করার সক্ষমতা ও শক্তির জোরে নিজ-নিজ মতো তারা তাদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করে। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক্ষেত্রে সরকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার দায়িত্ব হলো, মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে দরকষাকষির ব্যাপারটি যেন আইনসম্মতভাবে সম্পাদিত হয় তা তদারক করার জন্য এবং ফয়সালায় উপনীত হতে সহায়তা করার জন্য নিরপেক্ষ ‘ফ্যাসিলিটেটরের’ ভূমিকা পালন করা। সেই ধারণার ভিত্তিতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে মজুরি নির্ধারিত হয়।
এমনটিই হওয়ার কথা। কিন্তু পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মালিকের স্বার্থের পক্ষ নিয়ে থাকে। ফলে শ্রমিক পক্ষকে মালিক ও সরকার— এই দুই পক্ষের সম্মিলিত শক্তিকে মোকাবেলা করে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। সরকার ও রাষ্ট্রের এই ভূমিকা সম্পর্কে শ্রমিকরা ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠতে থাকে ও এক সময় তা নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসার জন্য বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলে। যেসব ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন মজুরিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক দাবি আদায় করার কাজ এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি এই চেতনা জাগিয়ে তুলতে প্রয়াসী হয় সেগুলোকে ‘বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এর বিপরীতে, যেসব ট্রেড ইউনিয়ন শুধু শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের প্রশ্নে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ রাখে তাদেরকে ‘সংস্কারবাদী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন’ বলে চিহ্নিত করা হয়।
ট্রেড ইউনিয়নের ‘বিপ্লবী’ ও ‘সংস্কারবাদী’— এই দুই ধারার মধ্যে প্রতিযোগিতা বহু পুরানো বিষয়। বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিকের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে সংগ্রাম করার সাথে সাথে শ্রমিকদেরকে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে শ্রমিকদের ওপর শোষণ-বঞ্চনা-দুর্দশা দূর হবার নয়—অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সেই সত্যটিকেও স্পষ্ট করার জন্য বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সচেতন প্রয়াস চালায়। অন্যদিকে, সংস্কারবাদী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিকদের একথা বোঝানোর চেষ্টা করে যে, প্রচলিত ব্যবস্থাতে থেকেই শ্রমিকরা সংগ্রাম করে তাদের ওপর চলতে থাকা শোষণ-বঞ্চনা-দুর্দশা থেকে একদিন পরিত্রাণ পেতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন তো বটেই সংস্কারবাদী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকেও বহুদিন ধরে গলা টিপে হত্যা করার পথ অনুসরণ করা হচ্ছে। এখন শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক যা করা হচ্ছে তা হলো, হয় ট্রেড ইউনিয়নের ‘যন্ত্রণা’ মুক্ত ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া, কিম্বা একান্ত বাধ্য হলে মালিকদের ‘পে-রোলে’ থাকা পেটোয়া দালাল ট্রেড ইউনিয়ন দাঁড় করিয়ে সে সবের নেতৃত্বে থাকা ‘ট্রেড ইউনিয়ন মাফিয়াদের’ মাধ্যমে শ্রমিকদেরকে ‘ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা রাখার’ পথ অনুসরণ করা। বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন ধারার ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি সংস্কারবাদী ট্রেড ইউনিয়ন ধারার মৌলিক কথা হলো শ্রমিক শ্রেণির অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুবিধা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশে এখন ট্রেড ইউনিয়নের নামে যা প্রতিষ্ঠা করে রাখা হয়েছে তার মূল কথা হলো শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পথে বিভ্রান্তি, অন্তরায় ও বাধা তৈরি করে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করা। এগুলোকে মালিকের ম্যানেজমেন্ট টিমের প্রসারিত আরেকটি অঙ্গ বলে আখ্যায়িত করাটা ভুল হবে না। ট্রেড ইউনিয়নের নামে মালিকের দালালি ও পদলেহনের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলকে শান্ত রাখা যাবে বলে মনে করা হলেও, শিল্পে স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হওয়ার বদলে গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শিল্পে তা লুটপাট ও নৈরাজ্যকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। মালিকদের সামনে উভয় সংকট। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিলে ভয় যে তার ফলে শ্রমিকদের অনেক ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা করে চলা তখন আর তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। অন্যদিকে সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়নের বিকাশ রোধ করতে হলে মাফিয়া চক্রের সহায়তায় ও সরকারের হস্তক্ষেপে যেসব ব্যবস্থা নিতে হয় তাতে নৈরাজ্য আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কোন্ পথ নিবে মালিকরা? বর্তমানে অধিকাংশ মালিক আত্মঘাতী দ্বিতীয় পথের চোরাগলি দিয়ে হাঁটছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গার্মেন্ট শ্রমিক সমাবেশটি বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন সমাবেশ তো ছিলই না, তা সংস্কারবাদী ট্রেড ইউনিয়নের নীতিমালাও অনুসরণ করেনি। ন্যূনতম মজুরি নিয়ে যখন দরকষাকষির পর্যায় চলছে, ওয়েজ কমিশন যখন মাত্র গঠিত হয়েছে এবং উভয়পক্ষ যখন সর্বোচ্চ দাবি সম্বলিত তাদের সুপারিশ তুলে ধরছে তখন যে কোনো শ্রমিক-সমাবেশ শ্রমিকের সর্বোচ্চ দাবিটিই বলিষ্ঠভাবে উচ্চারণ করবে,— এরকম হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। মনে রাখতে হবে যে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশটি মালিক পক্ষের অথবা ওয়েজ বোর্ড কিম্বা আরবিট্রেশন বোর্ডের আহ্বান করা সমাবেশ ছিল না, সেটিকে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সমাবেশ বলে ঘোষণা দিয়ে আহ্বান করা হয়েছিল। ‘৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি চাই’— এই স্পষ্ট উচ্চারণই হওয়া উচিত ছিল সমাবেশের রণধ্বনি। কিন্তু তা না হয়ে ‘নেতার’ বক্তৃতার প্রধান সুর ছিল শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য মালিকদের কাছে কাকুতি-মিনতি এবং মালিক-শ্রমিক মিলিতভাবে সমঝোতা করে শিল্প টিকিয়ে রাখার আহ্বান। মালিকরা কিন্তু তেমন কাজ করেনি। তারা তাদের সভা থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে, তারা ৩ হাজার ৬শ’ টাকার বেশি ন্যূনতম মজুরি দিতে প্রস্তুত নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ যদি শ্রমিকদের নিজস্ব সমাবেশই হবে তাহলে সেখান থেকে কি একই রকম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই মেসেজই দেয়া উচিত ছিল না যে, শ্রমিকরা ৮ হাজার টাকার কম ন্যূনতম মজুরি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। দরকষাকষির সময় যখন আসবে তখনকার ব্যাপার তখন দেখা যাবে। দরকষাকষি শুরুর আগেই দাবি-দাওয়া শিথিল করে ছাড় দেয়া হলো কেন? এটি কি মালিকদেরকে আসন্ন দরকষাকষিতে সুবিধা করিয়ে দেয়ার জন্য?
শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার ঘোষিত লক্ষ্যে ২১ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ডাকা শ্রমিক সমাবেশটি শ্রমিকের হাত থেকে হাইজ্যাক করলো কে, কারা ও কী স্বার্থে?
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি
E-mail : [email protected]
