শরতের আকাশ। এই মেঘ, এই বৃষ্টি। খানিক বাদেই রোদের হাসি। এ যেন প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালিপনা। প্রকৃতি তার খেয়াল নিয়েই থাক, আমরা ‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের দল তার তোয়াক্কা না করে ছুটে চলি প্রাকৃতিক কোনো এক বিস্ময়ের পানে। আমাদের এবারের ভ্রমণ ছিল দু’টি পাতা একটি কুড়ি—দুই শত ষাট আউলিয়ার পূণ্যভূমি সিলেট জেলার গোয়াইন ঘাট উপজেলার অন্তর্গত অপরূপ সৌন্দর্যের জলবন রাতারগুল। চৌদ্দজনের দল নিয়ে রাতের গাড়িতে রওয়ানা হয়ে সকালে গিয়ে সিলেট পৌঁছালাম। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা আগে ভাগেই আমাদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণের জন্য সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলেন। ধন্যবাদ তার বদান্যতাকে। হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে গেলাম লালাখাল। এরইমধ্যে প্রশাসনের আরেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পলাশ ভাই সুনামগঞ্জ হতে এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। তাকে সঙ্গী করতে পেরে আমি দারুণ খুশি। ট্রলারে চেপে দুপুর পর্যন্ত সময়টা সেখানেই কাটালাম। সৌন্দর্য্যের উপমা লালাখালের বর্ণনা আজ নাই দিলাম। অতঃপর জোহরের নামাজ শেষে মটরঘাট গিয়ে ইটালি (হোটেলে চেয়ার টেবিলের বদলে খোলা আকাশের নিচে তিনটি দশ ইঞ্চি ইটের উপর বসে) খিচুরি খেলাম। আলাল আর কামাল আলু ভর্তায় মরিচের গুঁড়া খেয়ে বেসামাল। ইটের উপর বসার জন্যই নামকরণ করা হয়েছে ইটালি হোটেল। ক্ষুধার্ত অবস্থায় সেই খিচুরিই অমৃত লেগেছে। ‘দে ছুট’ মানেই যখন যেমন তখন তেমন... নাক সিটকানোর সুযোগ নেই। গাইড এমরানের ঠিক করা নৌকায় উঠে বসলাম, সাঁতার না জানা কবিরকে নিয়ে কিঞ্চিত সংশয়, তবুও সে বেশ উত্ফুল্ল। ‘দে ছুটের’ দলকে নিয়ে ছয়টি ডিঙ্গি নৌকা লতা-গুল্ম ভেদ করে সাপ, বিচ্ছুকে সঙ্গী করে বনের গভীরে যাচ্ছে। নৌকাগুলো যতই এগিয়ে যায়, ততই মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি। এমএ কালাম এখানে এসে যেন নিজের ফটোসেশন করতে ভুলে গেল। আজ শুধু সে তার ক্যামেরায় প্রকৃতির হরেক রূপ ধারণ করল। গাছের ডালপালা দেখে এমন মনে হয় যেন পর্যটকদের আগমনে তারা আনন্দে নৃত্যরত। ভিন্ন রকমের এক মায়াময় বন ভ্রমণে হাবিব, যাকে আমি হাবু বলে ডাকি, সে এতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিল যে, বাংলা সিনেমার প্রয়াত হাবা হাসমতকেও হার মানাল। ৫০৪ একর আয়তনের এই বনে হিজল, করচ, তমাল, অর্জুন, কদম, বনজাম, মুর্তা আর জারুল বৃক্ষের সমারোহ। গভীর বনে আছে বানর, নানা প্রজাতির সাপ, মেছোবাঘ, ভোঁদরসহ বিভিন্ন প্রাণী। নীলাভ স্বচ্ছ জলের উপর ভাসমান বন রাতারগুল। বর্ষা মৌসুমে এই বনের গাছপালা গড়পরতা ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে। স্বচ্ছ জলে ভ্রমণ পিপাসুরা তাদের নিজ চেহারার প্রতিচ্ছবি দেখে ভুল-ভ্রান্তি হতে নিজেকে শুধরে নেয়। যেমনটি হয়েছে মোস্তাক আর কচি ভাইয়ের। পুরো বিকেলটা জলবনে ঘুরে যখন সন্ধ্যায় ডাঙায় ফিরছি, তখনই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। অলস এক সাপের ছবি খুব কাছ থেকে তুলতে গিয়ে ডিঙি ডুবল। সেই নৌকায় আমি আর আবু নাসের কচি ভাই ছিলাম। ভাগ্য ভালো যে কিছুটা সাঁতার জানা ছিল। পা যখন ডুবন্ত লতাপাতায় জড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন বেশ ভয় পেয়েছিলাম। কচি ভাই চিত্কার করে অভয় দিলেন, ‘জাভেদ তুমি ভয় পেয়ো না।’ ভয় পেয়ো না বললেই কি আর হয়! জীবনে এই প্রথম নৌকাডুবির অভিজ্ঞতা, তাও আবার সাপ-বিচ্ছুর বনে। আলম আর হানিফ তাদের নৌকায় টেনে ওঠানোর আগ পর্যন্ত ভেবেছিলাম, এই বুঝি দে ছুটের ইতি। নিজেকে স্বাভাবিক করতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছে। এই ফাঁকে পিন্টু আমার বিধ্বস্ত করুণ অবস্থা ক্যামেরায় ধারণ করে নিয়েছে। আজ জসিম কেন যেন ক্ষিপ্ত, হয়তো খাবার মেন্যুতে দেশি মুরগির ফ্রাই না থাকার কারণে! যাই হোক ভ্রমণপিয়াসি বন্ধুদের নিয়ে আগামীতে ‘দে ছুট’ ঘুরে বেড়াবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বর্ষা মৌসুমেই রাতারগুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো। শুষ্ক মৌসুমে ভিন্নরূপ। এবারের রাতাগুল ভ্রমণের প্রতিপাদ্য স্লোগান ছিল ‘সুযোগ করে ভ্রমণ করুণ, নিজেকে সুস্থ রাখুন। সিলেটের সুন্দরবন বলে খ্যাত রাতারগুল ভ্রমণে, ভ্রমণপিয়াসিরা পাবেন এক অন্যরকম অনুভূতি, মনে জাগবে ভিন্ন রকম শিহরণ, যা শুধু নিজের চোখে দেখে বুঝা যায়। সারা পৃথিবীতে বাইশটি সোয়াম্প ফরেস্ট (জলার বন) আছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি, সত্যিই জাতি হিসেবে আমরা প্রকৃতির কৃপাকে পুঁজি করে বিশ্বের পর্যটন দরবারে গর্ব করতে পারি।
যাতায়াত :সিলেট শহর হতে গোয়াইন ঘাট উপজেলার মটরঘাট, সেখান হতে নৌকায় বন ভ্রমণ। একদিনের ভ্রমণে জনপ্রতি ১৭০০ টাকা হলেই চলবে।
