[ রা জ নী তি ]

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে পত্র-কূটনীতি

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩০
আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী, দাতা দেশ ও সংস্থা এবং সর্বোপরি বঙ্গোপসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় অনুপ্রবেশ ইচ্ছুক স্বার্থচক্র একের পর এক ‘পত্র-কূটনীতি’ চালিয়ে যাচ্ছে। বহিঃশক্তিসমূহের বহুমুখী ক্রীড়া-কৌশলের নেপথ্যে যে বহুমুখী স্বার্থার্জনের নীল-নকশা লুক্কায়িত থাকে তা অনুধাবনে ব্যর্থ হলে আমাদের এ দেশ সমূহ-ক্ষতির সম্মুখীন হবে। গত দু’-তিন বছর ধরে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা অস্থিরতার প্রেক্ষিতে ঢাকাতে নিযুক্ত ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকীয় কূটনীতিকবৃন্দসহ মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রবণতাকে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ হিসেবে আশঙ্কা ব্যক্ত করা সত্ত্বেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সচেতনতা ও সমঝোতার অভাবে সেই উত্কণ্ঠা উদ্বেগের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়ে ওঠেনি কারো। মহাশূন্যের দিক-দিগন্ত যেমন কখনোই ফাঁকা থাকে না, বাতাসে পূর্ণ টইটুম্বুর থাকে, তেমনি জাতিরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক অঙ্গনের মহাস্পর্শকাতর জটিল এলাকাগুলোও কখনো ফাঁকা থাকে না, সেখানে কেউ না কেউ জেঁকে বসে থাকে। জাতীয় নেতৃবৃন্দের কর্তব্য হলো এ অঙ্গনগুলোতে সবসময়ই দেশীয় পদচারণায় মুখরিত রাখা। অনুতাপের বিষয় হলো, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিজেদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের কোন্দলে এতই দ্বিধাবিভক্ত যে, ঐ শূন্যস্থানগুলোতে আসন গেড়ে বসার সময় কদাচিত্ তাদের হাতে থাকে। সেই মোক্ষম সুযোগে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে পরদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এমনভাবে পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে, যা প্রতিস্থাপন করা সহজসাধ্য হবে বলে মনে হয় না। আসন্ন সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সমঝোতার উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে নিমন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে পত্র লিখেছেন সেই অস্বস্তিকর অনুভূতি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২২শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এ পত্র-কূটনীতি কি আদৌ সফল হবে? একটু পেছনে যাওয়া যাক। জন কেরির পত্র প্রেরণের ১৫ দিন পূর্বে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে সকল দলের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ-সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করার অনুরোধ জানিয়ে ফোনালাপ করেছিলেন। এর ৫ মাস পূর্বে গত মে মাসে জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দজ তারানকো রাজনৈতিক সংলাপের উপযোগী পটভূমি তৈরির জন্য ঢাকা এসেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পীকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সাথে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। গত ২/৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউসহ অনেক উন্নত দেশের সিদ্ধান্ত প্রণয়নকারী ব্যক্তিবর্গ বাংলাদেশে সফর করে একই বিষয়ে একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন। দুঃখজনক হলো, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মহাস্পর্শকাতর বিষয়টিতে বিদেশিদের এতো খোলাখুলি জড়িত হওয়া সত্ত্বেও আমরা সতর্ক হতে পারিনি। দিন দিন অস্থিরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে এসে সেই অস্থিরতা আরো ঘনীভূত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক শূন্য স্থানগুলোর সর্বত্র এখন প্রভাবশালী বৈশ্বিক শক্তিসমূহ স্ব স্ব স্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছে। সেপ্টেম্বর মাস শুরু হতে না হতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে বহিঃশক্তিসমূহের সেই নগ্ন পদচারণা প্রতিদিনের সংবাদ শীর্ষে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের অনমনীয় অবস্থার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ, জাতিসংঘ প্রভৃতি বহিঃশক্তিচক্র আমাদের রাষ্ট্রিক ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। বাহ্যিকভাবে এ বহিঃশক্তির সংশ্লিষ্টতাকে বহিঃহস্তক্ষেপ মনে হলেও আমাদেরই ব্যর্থতার কারণে যে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, একথা প্রায় সকলেই অনুধাবন করছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ১৪/১৫টি দেশের কূটনীতিক ও জাতিসংঘের প্রতিনিধি নির্বাচন কমিশনে ঢুকে নির্বাচন বিষয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এর পরপরই জাতিসংঘের মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাকে সর্বদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগাদা দিয়ে চিঠি লেখেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের পার্শ্বদেশে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি উভয় দলকে নিমন্ত্রণও পাঠান। ব্রিটিশ এমপি রুশনারা ও শাবানা ঢাকায় এসে গত ১৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন সংক্রান্ত অনেক দিক-নির্দেশনা দেন। ইইউ প্রতিনিধিদল ঢাকা অবস্থান করে নির্বাচন কমিশনের সঠিক নির্বাচন প্রস্তুতি ও নির্বাচনী কার্যাবলীর প্রতি তীক্ষ্ন নজরদারি করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত বছরগুলোতে বাংলাদেশ সফর করেছেন, ইইউ ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশের অনেক কূটনীতিক একই সুরে সরকার ও বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দকে সকল বিতর্ক দূর করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে তাগাদা দিয়ে আসছেন। এতসব বৈদেশিক অনুরোধ, উপদেশ সত্ত্বেও যখন সরকার ও বিরোধীদল নির্বাচন ইস্যুতে সমাধানে আসতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, তখনই তাদের আলোচনার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানালেন ওয়াশিংটনের পত্র-কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে বিএনপি প্রতিনিধিদল অক্টোবর মাসের প্রথমদিকে ওয়াশিংটন যাচ্ছেন বলে একাধিক বিএনপি শীর্ষ নেতা গণমাধ্যমকে অবহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত ১৯ সেপ্টেম্বর ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ পত্রিকাকে ওয়াশিংটনের পত্র প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করেছেন। ইতিমধ্যে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া জন কেরির চিঠির উত্তর প্রেরণ করেছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পত্রোত্তর লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় আছে। এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণের মনে একটি দুর্দান্ত প্রশ্ন: পত্র-কূটনীতি কি দু’নেত্রীর অনমনীয় অবস্থা থেকে সরিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগের সম্পর্কে বরফ গলাতে সক্ষম হবে? ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমীর হোসেন আমু ক্ষিপ্ত স্বরে বলেছেন: “কথা বলার জন্য আমাদেরকে ওয়াশিংটন যেতে হবে কেন? বাংলাদেশেই তো অনেক সুন্দর জায়গা রয়েছে।” আমু সাহেবের এ বক্তব্য স্পর্ধিত মনে হতে পারে কিন্তু এতে রয়েছে স্বদেশপ্রেমের অহংকার। সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটন বৈঠক প্রত্যাখ্যানের সুযোগ কি আছে আমাদের নেতৃবৃন্দের? হ্যাঁ, এখনি নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামোর ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হলে ওয়াশিংটনে গমন করে আমাদের জাতীয় সৌভাগ্য-কপালে অপমানের তিলক আঁকতে হতো না। আমাদের আওয়ামী লীগ, আমাদের বিএনপি, বিশেষত আমাদের প্রাণপ্রিয় দু’নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ইচ্ছেটাই এক্ষেত্রে নাটকীয় সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মীসমূহ সকলের সকল উত্কণ্ঠা-উদ্বেগ দূর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা চূড়ান্ত করা যেতে পারে। আমি দু’নেত্রীকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করবো, এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনেক সরকার কাঠামো, অনেক নির্বাচনী মডেল উপস্থাপন করেছেন। এগুলো অধ্যয়ন করে গ্রহণযোগ্য একটি ফর্মুলা নিয়ে অচিরেই সকল অস্থিরতা দূর করতে যেন তারা সক্রিয় হন। ইতিমধ্যে উভয় দলের মধ্যে বেশ সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি কেয়ারটেকার দাবি থেকে সরে এসে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে নেমেছে। আর আওয়ামী লীগও সংসদের বাইরে আলোচনায় রাজী হয়েছে, এমনকি সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থার একটা রূপরেখার আভাস তারা দিয়েছেন। আমি নিশ্চিন্ত যে, একটু অকপট হলেই সরকার ও বিরোধীদল ওয়াশিংটনের বৈঠক এড়িয়ে দেশমাতৃকার সম্মানের উচ্চৈশির স্থির রাখতে পারবেন। আর যদি তারা এখনো কোন সমাধানে আসতে ব্যর্থ হন তাহলে ওয়াশিংটনের চেয়েও ভয়ংকর কোন আলোচনা স্থলে তাদেরকে যাত্রা করতে হতে পারে। আজ আর আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, ১/১১ এর বিরাজনীতিকীকরণের সেই ভয়ংকর “মাইনাস টু” সময়ের চিত্র। আমরা সেই ভয়াবহ দিনগুলো এখনও ভুলিনি। আমাদের প্রিয় নেত্রীদ্বয়সহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর উপর নানা নিপীড়ন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদেরকেও নাজেহাল করা হলো। দেশকে রাজনীতিমুক্ত করতে জুলুম-নির্যাতনের সকল পদ্ধতি চালু করা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামরিক-বেসামরিক আমলাদের যোগসাজশে সেই বিরাজনীতিকীকরণের নীল নকশা বাস্তবায়িত হলো না। নির্বাচন হলো। প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলেন, প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেত্রী হলেন। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমর্থন ও বিদেশি সহযোগিতা একাকার হয়ে গেলে কোন নীল নকশাই বাস্তবায়িত হয় না। গভীর মনোযোগ সহকারে দেখলে নিশ্চয়ই বুঝা যাবে, বাংলাদেশ আজ কি চাচ্ছে? দেশের অগণিত মানুষের নাড়ীর স্পন্দনে কিসের সুর জাগছে। বিদেশিদের সহযোগিতা কোন সে গন্তব্যে ধাবিত হচ্ছে? দু’নেত্রীকে আবারো অনুরোধ করছি, প্লিজ জনগণের হূদয়ের গভীরে প্রোথিত সেই প্রত্যাশা শুনতে চেষ্টা করুন, আমাদের ভাষা বুঝুন। আমরা সত্যি ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন, উত্কণ্ঠিত। সকলের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে স্বস্তি ও প্রত্যাশার আলোয় নিয়ে যেতে পারেন শুধু আপনারা দু’জনই। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]