১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল । ঐ দিনে পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শহীদ নগর ডাব বাগানে পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয় স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধে ১৭জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকবাহিনী ঢাকা শহরের ঘুমন্ত মানুষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যদিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা শহর ও উপজেলা প্রবেশ মুখে পাকবাহিনীদের প্রতি রোধে প্রস্তুত থাকেন মুক্তিকামী যোদ্ধারা। পাকবাহিনীর লেলুচো চোখ পড়ে পাবনা জেলার সাঁথিয়ার শহীদ নগর ডাব বাগানে।
পূর্ব থেকেই এই এলাকাকে পাকবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করতে ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, তত্কালীন এমসি, এ অধ্যাপক আবু সাঈদ-এর নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সংগঠিত হতে থাকেন। হাবিলদার আলি আকবরের নেতৃত্বে সাঁথিয়ার মুক্তিযোদ্ধা ও ই.পি.আর সদস্যরা নিরিবিলি স্থান হিসাবে বেছে নেন সাঁথিয়ার শহীদ নগর এলাকার ডাব বাগানকে। এখানে প্রচুর ডাব গাছ ও মধ্যস্থলে জমিদারের একটি বিশাল পুকুর থাকায় স্থানটির নামকরণ করা হয় ডাব বাগান। ইপি,আর সদস্যদের সাথে মুক্তিযোদ্ধারা বাংকার করে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সংবাদ নগর বাড়ির পাকসেনাদের ক্যাম্পে এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদররা পৌঁছে দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন পাকসেনারা। ১৯শে এপ্রিল দুপুর বেলা প্রখর রোদ। বেড়া থেকে জীপ যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার এসেছে। এ সময় খাবার খাওয়ার জন্য অনেকে বাংকার থেকে যার যার অবস্থান ত্যাগ করে বিশ্বাস পাড়া ও সমাস নাড়ী ধনি হাজীর পুকুরে গোসল করতে গেছে। অল্প কিছু মুক্তিযোদ্ধা প্রস্তুত রাখা ছিল। এমন সময় হঠাত্ নগরবাড়ী থেকে ভারি অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল পাকবাহিনীর গাড়ি বহর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সোজা দাঁড়িয়ে যায়। যখন উভয় গ্রুপের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় তখন আশপাশের ২৫/৩০টি গ্রাম বন্দুকের গুলিতে কম্পিত হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে থাকে। আবাল বৃদ্ধ বনিতাদের হাহাকার ও আত্মচিত্কারে ভারি হয়ে ওঠে এলাকার আকাশ। ছেলে মেয়েরা মায়ের হাত ধরে এলাকা ছাড়তে থাকে। এছাড়াও আকাশে পাকবাহিনীর যুদ্ধ বিমান অবিরাম মহড়া দিতে থাকে। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও পাকবাহিনী কর্তৃক ধ্বংসযজ্ঞসহ বিভীষিকাময় স্মৃতি এখনও মানুষকে শিহরিত করে। তাদের ভারি অস্ত্রের গুলি সবাইকে আতঙ্ক করে তুললেও প্রাণপণে লড়তে থাকে মুক্তিযোদ্ধারা। এমন এক অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা ভারি অস্ত্রের মুখে পাকবাহিনীর সামনে দাঁড়াতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সুযোগে পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানসহ আশপাশ ঘিরে ফেলে গ্রামবাসী, ই.পি.আর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে হত্যা করে। হত্যা করবার পর লাশ যাতে না চেনা যায় সেক্ষেত্রে তারা পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরের দিন শ্রী বসন্ত নারায়ণ বিশ্বাসের চৌচালা টিনশেড কাচারি পুড়ছিল এবং সেখান থেকে জগত্ নারায়ণ বিশ্বাস এবং একজন ই.পি.আর সদস্যের লাশ পাওয়া যায়। ১৯৭২ সাল থেকে সাঁথিয়াবাসী এ দিবসটি পালন করে আসছে। সাঁথিয়ার মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমান প্রজন্ম এ দিনটি ইতিহাসের পাতায় রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে আরও বৃহত্ পরিসরে উক্ত স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণসহ স্বাধীনতার ৪১ বছর পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার দাবি করে আসছে।
