প্রবাস ফেরত রাজা মিয়ার লাশ নিয়ে টানা-হেঁচড়া

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৮
দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৮ বছর প্রবাস জীবনশেষে ২০০৮ সালে দেশে ফেরেন আজিজুল হক রাজা মিয়া (৫০)। গত ১৮ আগস্ট রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেলে লাশ রাখা হয় বারডেমের মরচুয়ারিতে। ব্রিটেন ও কানাডা প্রবাসী দুই ভাই দেশে এলে লাশ দাফন করা হবে-এমন সিদ্ধান্ত পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু ঘটনার এক সপ্তাহ পর এক মহিলা বারডেম হাসপাতালে গিয়ে দাবি করেন আজিজুল হক রাজামিয়া নামের যে ব্যক্তির লাশ রাখা আছে, সে তার স্বামী। তার সাজিবুল হক রাজু নামে ১৬ বছরের সন্তানও রয়েছে। বিপাকে পড়ে যায় বারডেম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। খবর দেয়া হয় শাহবাগ থানা পুলিশকে। এরই মধ্যে ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে কানাডা থেকে সিরাজুল হক দেশে ফিরেন। তিনি ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান দাবিদার বিষয়টি জানার পর ২৭ আগস্ট ঢাকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে তার মৃতভাই ও সন্তান দাবিদারের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেন। অন্যদিকে ২৯ আগস্ট স্ত্রী দাবিদার কোহিনূর বেগম বারডেম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিয়ের কাবিননামা দেখিয়ে লাশ নিজের হেফাজতে নেন। ঐ দিনই লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনার পর গত ২১ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে কবরস্থান থেকে লাশ উত্তোলন করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ। এ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর জিগাতলার ১/ই/৮ নম্বর বাড়ির মালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মৃত জহুরুল হকের মেজ ছেলে আজিজুল হক রাজা মিয়ার লাশকে কেন্দ্র করে। মৃতের ভাই কানাডা প্রবাসী সিরাজুল হক জানান, ১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান তার ভাই আজিজুল হক রাজা মিয়া। ২০০৮ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি জিগাতলার ১/ই/৮ নম্বর বাসার দোতলায় বাবা-মার সাথে থাকতেন। গত ১৫ আগস্ট তিনি হঠাত্ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১৮ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। ২০০০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিয়ে করেন রাজা। তার একটি সন্তানও জন্মগ্রহণ করে সেখানে। কিছুদিন পর রাজার স্ত্রী মারা গেলে ছেলেটি তার নানীর কাছে থেকে যায়। ২০০৮ সালে দেশে ফেরার পর ২০১১ সালে তার মায়ের অনুরোধে রাজা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের এক মাস পর তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়। এই দু’টি ঘটনা ছাড়া রাজার আর কোন বিয়ের তথ্য পরিবার বা বন্ধু-বান্ধব কেউ জানেন না। সেক্ষেত্রে কোহিনূর বেগমের হঠাত্ করে লাশকে নিজের স্বামী হিসাবে দাবি করে দাফন করায় বিষয়টি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি সিরাজুল হক রাজার মৃত্যুর পর জিগাতালার ঐ বাড়িতে কোহিনূর বেগম তার সাজিবুল হক রাজু নামে এক ছেলে নিয়ে উঠেছেন। সিরাজুল হক দাবি করেন, এটি একটি প্রতারক চক্র। বিয়ের জাল কাবিননামা দেখিয়ে ঐ মহিলা বারডেম হাসপাতালের মরচুয়ারি থেকে তার ভাইয়ের লাশ গ্রহণ করেন। কোহিনূর বেগম জানান, ১৯৯০ সালে সিরাজুল হকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তবে এই বিয়ের কোন আইনগত কাগজপত্র নেই। তিনি দাবি করেন, ১৯৯১ সাল নয়, রাজা ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। ঐ সময় তিনি ৩ মাসের অন্ত:সত্ত্বা ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রাজা ফিরে না আসলে ১৯৯৭ সালে তিনি কবিরুল হক নামে এক আদম ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। কবিরুল হকের সেটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। ২০১২ সালে তিনি রাজার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফেরার খবর পান। রাজার মৃত্যুর ৭/৮ মাস আগে থেকে সাজিবুলকে নিয়ে তিনি জিগাতলার ঐ বাসায় রাজার সঙ্গে থাকতেন। এই বিষয়টি নিয়ে রাজার পরিবারের সদস্যরা পুলিশ ও র্যাবের কাছে অভিযোগ করেছে। এ ব্যাপারে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে র্যাব। এখন পর্যন্ত কোহিনূর বেগমের দাবির সপক্ষে কোন প্রমাণ মেলেনি। তার ছেলে সাজিবুল হক রাজুর জন্ম হয় ১৯৯৭ সালে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকেই দেশের বাইরে ছিলেন রাজা। পাশাপাশি রাজুর এসএসসি’র সনদে তার বাবার নাম লেখা রয়েছে কবিরুল হক। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই কবিরুল হক প্রকৃত পক্ষেই কোহিনূরের স্বামী। রাজার সঙ্গে তার বিয়ের কোন কাগজপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি। এসব কারণে মনে হচ্ছে, মৃত ব্যক্তির সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে কোহিনূর স্বেচ্ছায় বা কারো প্ররোচনায় মিথ্যা দাবি তুলেছেন। তবে চূড়ান্তভাবে বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর।