বৌদ্ধ সমপ্রদায় যখন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়া রামু ট্রাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি পালন করিতেছিলেন, কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেই সময়ে রংপুরে ও বগুড়ায় দুর্গামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে। দুইটি ঘটনাই ঘটিয়াছে গত শনিবার রাত্রে। বগুড়ার কাহালু উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি নন্দ গোপাল সাহা জানাইয়াছেন যে মন্দিরের প্রধান ফটকের তালা ভাঙিয়া অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা দুর্গাপ্রতিমা ভাঙচুর করিয়াছে। থানায় জিডি করা হইয়াছে। স্থানীয় প্রশাসনও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন। রংপুরের ঘটনা ভিন্ন। সেইখানে মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরকে কেন্দ্র করিয়া দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটিয়াছে। ঘটনার সহিত জড়িত থাকিবার অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। রংপুরের জেলা প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়াছেন। তাত্ক্ষণিকভাবে তিনি কিছু অর্থসহায়তাও প্রদান করিয়াছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিমা সংস্কার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য। বাঙালি হিন্দু সমপ্রদায়ের সর্ববৃহত্ ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজাকে সামনে রাখিয়া যখন সারা দেশেই শারদীয় দুর্গোত্সব উদযাপনের জোর প্রস্তুতি চলিতেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ধরনের ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা ইহার তীব্র নিন্দা জানাই এবং আশা করি যে, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য যে বা যাহারাই দায়ী হউক অনতিবিলম্বে তাহাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হইবে। সেইসাথে নিশ্চিত করা হইবে সকল পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ২৯ সেপ্টেম্বর রামু ট্রাজেডির এক বত্সর পূর্ণ হইয়াছে। গত বত্সরের এইদিনে দুর্বৃত্তরা সংগঠিতভাবে রামু, উখিয়া ও পটিয়ায় বেশকিছু বৌদ্ধমন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করিয়াছিল। হামলা চালানো হইয়াছিল জনবসতিতেও। পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল শত শত বত্সরের অতি মূল্যবান বেশকিছু বৌদ্ধ-ঐতিহ্যও। প্রার্থনা সভা ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সেই বীভত্সতার বর্ষপূর্তি পালন করিয়াছে বৌদ্ধ সমপ্রদায়। এই উপলক্ষে আয়োজিত সভায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পুনর্নিমাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের যেমন প্রশংসা করা হইয়াছে, তেমনি এই আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হইয়াছে যে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রত যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হইলে এই ধরনের ঘটনা ঘটিতেই থাকিবে। এই আশঙ্কা যে অমূলক নহে রংপুর ও বগুড়ায় দুর্গামণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাই তাহার অকাট্য উদাহরণ হিসাবে উত্থাপিত হইতে পারে। রামু ট্রাজেডির পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে। পত্রপত্রিকায় সবিস্তারে তাহা তুলিয়া ধরা হইয়াছে। আমরা একাধিক সম্পাদকীয়ও লিখিয়াছি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধীরা যথারীতি ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া গিয়াছে। একই অভিযোগ রহিয়াছে আলোড়নসৃষ্টিকারী রামু ট্রাজেডির ক্ষেত্রেও।
বাংলাদেশে শত শত বত্সর ধরিয়া মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করিয়া আসিতেছে। এমনকি একই গ্রামে একাধিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বসবাস এবং উত্সবমুখর পরিবেশে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উদযাপনের উদাহরণও ভূরি ভূরি। কিন্তু তাহাদের মধ্যে দাঙ্গা-ফ্যাসাদের দৃষ্টান্ত নাই বলিলেই চলে। ইহা অনস্বীকার্য যে রামু ট্রাজেডির মতো কিংবা আরও গুরুতর যেইসব কলঙ্কজনক ঘটনা বিভিন্ন সময়ে এই জনপদে সংঘটিত হইয়াছে তাহার মূলে ছিল স্বার্থান্ধ কিছু মানুষের সুপরিকল্পিত প্ররোচনা। হীন রাজনৈতিক স্বার্থে সুকৌশলে বারবার সামপ্রদায়িক সম্প্রীতির উপর আঘাত হানা হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসন হয় নীরবদর্শকের ভূমিকা পালন করিয়াছে অথবা দায়িত্বপালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে। রামুর ঘটনাও যে ইহার ব্যতিক্রম নহে— তাহা তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। আশা বা ভরসার কথা হইল, জনগণ কখনই ইহাতে সায় দেয় নাই। ফলে চক্রান্তকারীরা পিছু হটিতে বাধ্য হইয়াছে বারবার। শত চক্রান্তের মুখেও যে কোনো মূল্যে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির এই ঐতিহ্য সমুন্নত রাখিতে হইবে। ব্যর্থ করিয়া দিতে হইবে মতলববাজদের সকল দুরভিসন্ধি। জনগণ সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকিলে কোনো চক্রান্তই যে সফল হয় না— তাহা প্রমাণিত।
