রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের কাজ উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করল পরমাণু বিদ্যুত্ শক্তি কর্মসূচিতে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে এই কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন রাশিয়ান ফেডারেশনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাশিয়ার স্টেট এটমিক এনার্জি কমিশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক সের্গেই কিরিয়েনকো।
পরমাণু বিদ্যুত্ প্রকল্প মাঠে আয়োজিত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি আমরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী।’ সের্গেই কিরিয়েনকো প্রতিশ্রুতি দেন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করার।
প্রধানমন্ত্রী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ১০ ভাগ হবে পারমাণবিক বিদ্যুত্ থেকে। বিভিন্ন উত্স থেকে আমরা বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছি। শুধু গ্যাস নয়, কয়লা, পারমাণবিক শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে জোর দেয়া হচ্ছে। গত সাড়ে চার বছরে বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ৯ হাজার ৭১৩ মেগাওয়াট এ উন্নীত করেছি। যা আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে সহযোগিতা দেয়ার জন্য রাশিয়া সরকার ও সেদেশের বন্ধুপ্রতিম জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ভারত, চীন ও মালেশিয়ার সাথে সরকারিভাবে সহযোগিতাসহ আমরা ১১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছি। রামপালে ভারতের সহায়তায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন শুরু হয়েছে। মোট ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে ৫ অক্টোবর বিদ্যুত্ আনা শুরু হবে। এ পর্যন্ত ৫৬টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র করা হয়েছে। আরো ৩৪টি হচ্ছে। ৯ হাজার কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন করা হয়েছে। ৩ লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন করা হয়েছে। ২০টি উপকেন্দ্র করা হয়েছে। এখন ৬২ ভাগ মানুষ বিদ্যুত্ পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে দৃষ্টান্ত রেখেছে। দারিদ্রেও হার ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। এখন তারা মধ্যবিত্ত। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৪ ডলার হয়েছে। রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬ বিলিয়ন। আমরা থ্রিজিতে প্রবেশ করেছি। আগামীতে ফোরজিতে যাব। আর এসব করতে বিদ্যুত্ প্রয়োজন হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৬১ সালে এই বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনে প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এরপর কিছুদূর অগ্রগতি হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় এসে জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই। এবার দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন করে কাজ শুরু করি। তিনি বলেন, পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইএইএ’র দিক-নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা হচ্ছে।
কিরিয়েনকো বলেন, রাশিয়া বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এজন্য রূপপুরে ফুকুশিমার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে না। বাংলাদেশ এই বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে টেকসই ও কমদামে বিদ্যুত্ পাবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই কেন্দ্র অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এখন পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুত্ কেন্দ্র করছে। রাশিয়া বাংলাদেশে তাদের সকল অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই কেন্দ্র করবে। কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হলে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। রাশিয়া এই অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। বক্তৃতা করেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্সাল (অব) এ কে খন্দকার, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল ইসলাম টুকু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম, পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ, বিজ্ঞান সচিব রফিকুল ইসলাম, পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান আবু সাইদ মো. ফিরোজ ও পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসান।
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই রূপপুরে রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট ও বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন একটি চুক্তি করে। ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এই চুক্তি অনুযায়ী অ্যাটমস্ট্রয় পরমাণু কেন্দ্রের নকশা করে দেবে।
