অন্য তারুণ্য

ভিনদেশে সারার সাফল্য

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:২২
সারাবিশ্বের মতো সুদূর অস্ট্রেলিয়াতেও রয়েছেন অসংখ্য বাঙালি। বিদেশ বিভূঁইয়ে থেকেও যে তারা বাংলাকে লালন করেন অস্তিত্বে, সেটার প্রমাণ সারা। অস্ট্রেলিয়া সরকার প্রতিবছরই নিজ নিজ ভাষায় অসাধারণ সাফল্য দেখানো শিক্ষার্থীদের উত্সাহিত করার জন্য পুরস্কার দিয়ে থাকে। লেখাপড়া, সেইসাথে বিভিন্ন সহপাঠ্যক্রমিক কাজে সারার রয়েছে অনেক আগ্রহ, আর তার সবই বাংলাতে। সিডনির এপিং ওয়েস্ট পাবলিক স্কুলের ছাত্রী সারা হোসেনই প্রথম বাংলাভাষী যে বাংলা ভাষায় ব্যুত্পত্তির জন্য সম্মানজনক এ পুরস্কার লাভ করল। তাকে নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র যারা নিজ দেশ থেকে বহু দূর দেশে বাস করেন তাদের পক্ষে বাংলা ভাষা চর্চা করা কঠিন কাজ। প্রথমত লেখাপড়া সেখানে বাংলায় করা যায় না। দ্বিতীয়ত চাকরিবাকরিতে বাংলার প্রয়োগ নেই। তৃতীয়ত বিনোদনে বাংলা অনুপস্থিত, চতুর্থত বাংলার সাংস্কৃতিক পরিবেশ নেই। এত সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে বাংলা ভাষার চর্চা করা হয় না। বহু দূরে থাকার জন্য দেশের মানুষ ও সংস্কৃতির সহায়তাও পাওয়া যায় না। কারও যদি বাংলা শেখার ইচ্ছেও হয় সেখানে বইপত্র বা শিক্ষকই তো পাওয়া যাবে না। তাই অনেক বাবা-মায়ের ইচ্ছে থাকলেও সন্তানদের বাংলা শিখিয়ে উঠতে পারেন না। বাংলা হরফের সঙ্গেই তাদের পরিচয় ঘটানো কঠিন। এত দূর দেশ থেকে বাংলা বইপত্র সংগ্রহ করাও কঠিন কাজ। তাই সে ইচ্ছে অনেক সময় অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। তবুও সারা বাংলাকে ভুলে যাননি, নিজের মাঝে লালন করেছেন, আর ভাষার প্রতি তার এই ভালোবাসাই সারাসহ সব বাংলাদেশিকে এনে দিল বিরল সম্মান। সিডনির এপিং ওয়েস্ট পাবলিক স্কুলের ছাত্রী সারা হোসেন ‘মিনিস্টার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলা ভাষার এক নতুন ইতিহাস গড়ল। অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালিদের প্রবাসী জীবন যাপনের প্রায় অর্ধশত বছর হতে চলল। দীর্ঘ এ সময়ে ‘মিনিস্টার অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার ঘটনা বাঙালিদের মধ্যে এটিই প্রথম। গত ৭ বছরে সারা ‘বাংলা একাডেমি অস্ট্রেলিয়া’র বাংলা স্কুলে বাংলা লিখতে, পড়তে ও বলতে শিখেছেন। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্মানজনক এ প্রাপ্তিতে ভূষিত আরও যে তিনজন কমেন্ডেবল ও হাইলি কমেন্ডেবল পুরস্কার পেয়েছেন তারাও বাংলা একাডেমি অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন স্কুল শাখার শিক্ষার্থী। একাডেমির ব্ল্যাকটাউন শাখার বলকাম হিলস্ হাই স্কুলের ছাত্রী শতাব্দী রাশেদ ও লাকেম্বা শাখার ওয়াইলি পার্ক পাবলিক স্কুলের ছাত্র এএসএম শাহরিয়ার ইফতি দুজনেই কমেন্ডেবল অ্যাওয়ার্ড পান। আর এপিং শাখার হরন্সবি গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রী আশা হোসেন পেয়েছে হাইলি কমেন্ডেবল অ্যাওয়ার্ড। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতি বছর ভাষা শিক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য মিনিস্টার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে। ভাষায় বিশেষ দক্ষতার এ পুরস্কার প্রদান করেন নিউ সাউথ ওয়েলসের শিক্ষামন্ত্রী। এ বছর মোট ৬০টি সাম্প্রদায়িক ভাষা ও এর ৩০ হাজার ভাষাভাষীর সঙ্গে লড়ে প্রথম দশ জনের মধ্যে ঠাঁই পায় সারা। বাংলা ভাষার শিক্ষা বিস্তারে অস্ট্রেলিয়াস্থ বাঙালিদের চেষ্টার কোনো অন্ত নেই। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে শুরু হওয়া এই প্রবাস প্রচেষ্টা ক্রমান্বয়ে আলোর মুখ দেখতে চলেছে। বাংলা একাডেমি অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন যাবত এখানকার বাঙালি ছেলেমেয়েদের বাংলায় লিখতে, পড়তে ও বলতে শেখার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখন প্রয়োজন শুধু অভিভাবকদের সদিচ্ছা। আমাদের মাতৃভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য রক্ত দিয়েছেন অসংখ্য ভাষা শহীদ। মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া মাতৃভাষায় আমরা খুঁজে পেতে চাই আমাদের শেকড়। প্রযুক্তি ও প্রগতির এ স্বর্ণযুগে প্রবাসী অন্যান্য অনেক জাতি তাদের শেকড় সন্ধানে উদ্যোগী। একটু চেষ্টা করলে আমরাও নিশ্চয়ই পারব। সারা মনে করেন, আকাশ-সংস্কৃতির একতরফা আগ্রাসন, বিদেশ-প্রীতি ও অন্ধ অনুকরণ প্রবণতার যে স্রোত বহমান তার প্রতিকূলে বিচক্ষণতার সাথে আমাদের করণীয়গুলো স্থির করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্যের সকল পরিসরে বাংলা ভাষার অবাধ ও বাস্তবভিত্তিক প্রচলন ঘটুক—এটাই হোক একুশের অন্যতম প্রত্যয়।