প্রজন্ম আইকন

ভিন্নধারার নির্মাতা

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ২০:১০
আপনার শুরুর গল্পটা জানতে চাই। শুরুটা বলা যায় আকস্মিকভাবেই। একটু একটু মিউজিকের সাথে জড়িত ছিলাম। দশ-বার বছর আগের কথা হবে। মাইলসের হামিন ভাই বললেন, তাদের একটা মিউজিক ভিডিও করতে হবে। তারপর আমার সেই কাজটা সবাই বেশ পছন্দ করেছিল। সেই সময় নিয়মিত ওঠা-বসা ছিল গানের মানুষদের সাথে। আর আমার বন্ধুদের মধ্যে সেই সময়কার ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর সিইও পলের কথা না বললেই নয়। সেও গানের সাথে জড়িত ছিল। সপ্তাহের শেষে বন্ধুরা মিলে গানের আসর বসাতাম। একটা সময় পল চাকরি ছেড়ে চলে গেল ইংল্যান্ডে। এখানে এত পসার ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে পল বলেছিল, যে কাজটা তার সবচেয়ে ভালো লাগে, সে সেটাই করতে চাই, তাতে কতটা লাভ হলো সেটা বিষয় না, কাজ করতে পারার আনন্দটাই বড়। বলা বাহুল্য, আজ সে ইংল্যান্ডের নামকরা একটা মিউজিক স্কুলের মালিক। পলের সেই কথাটা আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। যাই হোক সে সময় ‘কবিতা ও গান’ নামে ব্যতিক্রমী একটা সংগীতানুষ্ঠান করলাম। তারপর করি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র ‘একাত্তরের যুদ্ধযাত্রা’। এভাবেই কখন জানি এই নির্মাণ শিল্পের সাথে আস্তে আস্তে জড়িয়ে গেলাম। আপনার বিজ্ঞাপন আর মিউজিক ভিডিও বরাবরই প্রশংসা কুড়িয়েছে, এ প্রসঙ্গে যদি কিছু বলেন? আসলে যখন অল্প কিছু কাজ শুরু করলাম, তখন থেকেই এর প্রতি অন্য রকম ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল, সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে আমি কাজ করার চেষ্টা করি সবসময়। যাই হোক, প্রথম ক্লোজআপ ওয়ান চলাকালীন ইউনিলিভারের নওশাদ ভাই ক্লোজআপের ১১ জনকে নিয়ে একটা মিউজিক ভিডিও করতে বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে সেবার ভালো একটা কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। জেমসের ‘দোস্ত-দুশমন’ করলাম। তারপর ক্লোজআপ থেকেই বিজ্ঞাপন করতে বলা হলো, সেটাই মনে হয় প্রথম বিজ্ঞাপন। এরপর সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড পেলাম তিনবার। সেটাও মিউজিক ভিডিওর জন্যই। এ ধরনের প্রাপ্তি আসলে কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বাড়ায়। আপনার অন্যতম সেরা কাজ ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ সম্পর্কে বলুন? একদিন রাতে হঠাত্ ফোন আসে। আইসিসি’র জন্য বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশের একটা প্রামাণ্যচিত্র বানাতে হবে। আইসিসি’র বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘গ্রে’ এর সাথে যুক্ত ছিল। এক মাসের মধ্যেই আমাকে কাজ শেষ করতে হবে। বিদেশি একজন মডেল দরকার, খোঁজ পাওয়া গেল ভিকি ভিক্টোরিয়ার। মিশেল মাউন্ট নামে আরও একজন কাজ করেন তাতে। তাদের সাথে নিয়েই কাজ শুরু করলাম। প্রথমেই কক্সবাজারে শুট করা হয়। এরপর রাঙামাটি। নীলগিরি, চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, মংলা, সুন্দরবন, খুলনা, কুষ্টিয়া, নাটোর, রাজশাহী অবশেষে ঢাকার শহীদ মিনারে এসে শেষ হয় শুটিং। তারপর বাকি সম্পাদনার কাজ ব্যাংককে করি। দুঃখের বিষয়, এই শুটিং চলাকালীনই কাপ্তাইতে ফেরি থেকে পড়ে নিখোঁজ হয় আমাদের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জাহিদ। তাকে হারানোর এই সময়টা কখনোই আমরা ভুলতে পারি না। ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখানোর সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ দেখানোর সময় স্টেডিয়ামে ছিল পিনপতন নীরবতা। দর্শকরা কীভাবে নিচ্ছে বিষয়টা বুঝতে পারছিলাম না। খানিকটা সময় নিঃস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। পুরো ভিডিওটা শেষে দর্শকদের যে উল্লাস দেখলাম! আমি রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যাই। দেশের জন্য কাজ করে দেশের মানুষের এত ভালোবাসা পাওয়াটা তো সহজ কথা না। আমি সাধারণ দর্শকদের সাথেই বসেছিলাম। তারা যখন শুনল, এটা আমার তৈরি করা। রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেল। তারা যেভাবে আমাকে অভিবাদন জানিয়েছে তার কোনো তুলনা নেই। বিদেশিরা যারা বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বসে থাকে, তারাও নতুন করে চিনতে পারে বাংলাদেশকে। ভালোলাগার বিষয় হলো চার লাখের বেশি বার মানুষ এটা অনলাইনে দেখেছে, কিন্তু কোনো নেগেটিভ কমেন্ট করেনি। আপনার ছেলেবেলার কথা জানতে চাই। ছোটবেলা থেকেই আসলে একটা সাংস্কৃতিক আবহ ছিল বাড়িতে। বাবা সচিত্র সন্ধানী নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সন্ধানী প্রকাশনী নামে আমাদের প্রকাশনাও ছিল। সেখান থেকে নিয়মিত বই প্রকাশ পেত। জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র মতো নামকরা অনেক বই-ই এখান থেকেই প্রকাশিত হয়। ‘যায় যায় দিন’ও তখন সন্ধানী প্রকাশনী থেকে বের হতো। বাসায় নিয়মিত কবি-সাহিত্যিকদের আসা-যাওয়া ছিল। নটরডেম কলেজ থেকে বের হওয়া বন্ধুরা সব বিদেশ পাড়ি জমাতে লাগল। আমিও খালার কাছ থেকে টাকা নিয়ে টোফেল দিয়ে ফেললাম। ভিসা হাতে পাওয়ার পর বাবাকে বিস্তারিত বললাম। তিনি বললেন, যেতে হলে আমাকেই আমার দায়িত্ব নিতে হবে। সবচেয়ে বড় উপদেশ ছিল নিজের পরিচয়েই নিজেকে পরিচিত হতে হবে। তারপর খানিকটা দ্বিধা রেখেই চলে যাই আমেরিকা। অনেকেই দেশের বাইরে গেলে আর আসেন না, অথচ আপনি ফিরে এসেছিলেন, তখন কী চিন্তাভাবনা কাজ করেছিল? আমেরিকায় নিজেকে খুব একাকী লাগত। বাংলাদেশকে খুব মিস করতাম। ১৯৮৯ সালের দিক দেশে ফিরে আসি। ঠিক করলাম, হয় দেশেই থাকব আর আমেরিকায় যদি যাই তাহলে আর কখনো দেশে ফিরব না। তারপর আর আমেরিকা যাওয়া হয়নি। দেশেই শুরু করি ব্যবসা। বনানীতে ‘শেহনাই’ নামে একটা রেস্টুরেন্ট দিই। তার পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোতে কাপড় রফতানি করতাম। একটা সময় আবার মনে হলো জীবনটা একঘেয়েমি হয়ে যাচ্ছে। নতুন কিছু করার স্পৃহা কাজ করত সবসময়। সেই ভাবনা থেকেই সরে আসি নির্মাণ শিল্পে। নগরবাউলের জেমস ভাই, আমি আর জিয়াউল পাইকার জুয়েল মিলে শুরু করলাম রেড ডট। ভারতীয় ছবি আমদানির বিষয়টিতে আপনার বক্তব্য কী? আমি সঙ্গত কারণেই বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির পক্ষপাতী। আমাদের দেশে এখন আর সেই রকম সিনেমা হল নেই। কেনই বা হবে? দশ বছরে একবার ‘মনপুরা’ প্রদর্শনের জন্য তো কেউ হল বানিয়ে রাখবে না। হল দরকার সিনেমা দেখানোর জন্য। সব ধরনের ছবি তারা দেখাবে, ব্যবসা করবে, হলের মানোন্নয়ন করবে। তাহলে যখন আমাদের দেশের ভালো ভালো ছবি মুক্তি পাবে, সবাই হলে যেয়ে ছবি দেখার সুযোগ পাবে। ছেঁড়া সিট আর বাজে সাউন্ড সিস্টেমের কারণে সেটা এখন সম্ভবই না। তাই ভালো সিনেমা বানাব। দেখানোর সুযোগ পাব না, এমনটাতো হতে পারে না। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই বিদেশি চলচ্চিত্রের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এর ফলে প্রেক্ষাগৃহের উন্নয়ন ঘটবে, তার পরোক্ষ প্রভাব এসে পড়বে আমাদেরই চলচ্চিত্রে। আপনার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাই? রেড ডট-কে ঘিরেই আসলে এখন সব স্বপ্ন। বলা যায়, রেড ডট নিজেই একটা স্বপ্ন। বলা যায়, রেড ডট নিজেই একটা স্বপ্ন। রেড ডটের কোনো কাজই আমি একা করি না। টিম ওয়ার্কের মাধ্যমেই সুন্দর একটা কাজ হয়। ভবিষ্যতে আরও ভালো ভালো কাজ করতে চাই। আর আমার এক ছেলে আশায আর মেয়ে আর্নাজকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।