চকলেট কেকের আল্পনা করা নিয়ে ব্যস্ত মেয়েটি। এটা তার নিয়মিত কাজের মধ্যে পড়ে। প্রতিদিন তিনি খুব সকালে উঠেই চলে আসেন কাজে। তিনি ম্যানিলার একটি হোটেলে কাজ করেন। ‘এডসা সাংরি লা হোটেল’-এর রান্নাঘরে কাজ তার। সে এই হোটেলের রান্না বিষয়ক তদারকির চিফ। অল্প বয়সী এ মেয়েটির একটি হোটেলে কাজ করে আলোচনায় উঠে আসার ব্যাপারটির পেছনে কাজ করছে তার অক্ষমতাকে জয় করার গল্প।
খুব ছোট থাকতেই অনেক উত্সাহ নিয়ে রান্নার কাজ করতেন তিনি। কিন্তু তার অক্ষমতা তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়। তার হাতে কব্জি না থাকায় তিনি এখন আর কেকের উপর মজা করে বাদাম সাজাতে পারেন না। এখন তার কাজ করার জন্য দু হাতের অবশিষ্ট অংশ ব্যবহার করতে হয়। কষ্ট করে হলেও কিছুু কাটার জন্য চাকুর পেছনের অংশটা তিনি দু হাতের মাঝে ধরেন। এভাবেই তিনি সবজিসহ সব কাটাকুটি করার কাজের অভ্যাস করে ফেলেছেন। আর খুব সুন্দর করেই তিনি স্ট্রবেরি ও কিউই ফলগুলোকে দুভাগ করে ফেলতে পারেন। একই সাথে কেক বানানো, এতে সুগন্ধি যোগ করাতেও এখন তিনি বেশ পটু। এসব কাজ তিনি তার অক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে করতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই অনুপ্রেরণামূলক। কারণ তিনি তার এ অবস্থার পরেও এমন কঠিন কাজ করে হেড অব দ্য হোটেল ফুড ডিপার্টমেন্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে মেয়েটি হয়তো কাজ করতে গিয়ে ব্যথা পাবে। কিন্তু তার কাজ দেখলে বুঝা যায় এ কাজের জন্য তিনি নিজেকে ভালোভাবেই প্রস্তুত করে নিয়েছেন। সেই হোটেলের ম্যানেজার রেইস মারসেইল সম্পর্কে বলেন, ‘মেয়েটিকে কখনও অন্যরকম হিসেবে দেখা হয় না। তিনি সব সময় অন্য সবার মতোই কাজ করে গেছেন, তার প্রতিবন্ধকতার কারণে তিনি কখনোই বিশেষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি।’ আর এসব গুণাবলি ও তার কাজের দক্ষতা এত অল্প বয়সেই তাকে এত বেশি সুনাম এনে দিয়েছে।
মারসেইল সম্পর্কে কিছু কথা
মারসেইল ও তার পরিবার ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সপরিবারে তাদের গ্রাম মিন্ডানাও জামবোয়ানগা থেকে চলে আসে। অন্যভাবে বলা যায় তাদেরকে একরকম গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। জোর করে তাদের ভিটে ছাড়া করা হয় এবং তাদের সব সম্পত্তি দখল হয়ে যায়। সে সময় মারসেইলের বয়স মাত্র ১১ বছর ছিল। সেসময় তিনি এ অন্যায়ের বাধাও দিতে পারেনি। ভাগ্যকে মেনে নিতে হয়েছিল। ওই ঘটনায় হাত হারান মারসেইল। তাকে হাসপাতালে নিতে কিছু দেরি হয়ে গিয়েছিল। কৃত্রিম হাত সংযোজন করা যেত কিন্তু তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না বলেই এ দুর্ভাগ্য তাকে মেনে নিতে হয়েছিল। জীবনটা বলতে গেলে থেমেই গিয়েছিল তার। পুরোপুরি তার মায়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন মারসেইল। একসময় তিনি সাহস করে স্কুল যাওয়া শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও দেখা দেয় সমস্যা। তার সহপাঠীরা তাকে বিভিন্ন ভাবে তার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে খোঁচায়। অশ্রু ছাড়া তার কাছে সান্ব্তনা বলতে আর কিছুই ছিল না। এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য আর্চবিশপ লেডসমা মারসেইলের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ভর্তি করে দেন প্রতিবন্ধীদের স্কুলে। এটি ২০০৪ সালের ঘটনা। সেখান থেকে তার শেখার শুরু হয়। জীবনটাকে তিনি দেখা শুরু করেন নতুনভাবে। ধীরে ধীরে ঘরের কাজ করা শুরু করেন তিনি। তার অক্ষমতাকে জয় করতে অনেকটাই সফল হন। বলা যায় সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন তিনি। খোদার উপর তার এটুকু ভরসা ছিলা বলেই এত সহজে সব সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন ২২ বছরের এ মেয়েটি।
পড়াশোনা
মারসেইল হোটেল ম্যানেজমেন্টে গ্র্যাজুয়েশন করেন। এরপর ‘কাগায়েন ডি ওরকো সিটি’-তে রান্না বিষয়ক আরও একটি কোর্স করেন। এ ব্যাপারে তিনি জানান, ৭ বছর বষয় থেকেই তিনি এ ধরনের কাজে খুব আগ্রহ পেতেন। তার সেই আগ্রহ থেকেই একসময় সুযোগ পেয়ে যান খ্যাতি সম্পন্ন এক হোটেলে কাজ করার। প্রথম দিকে তাকে দিয়ে টুকটাক হালকা কাজ করানো হতো। পরে তিনি কেকের অলঙ্করণের কাজ করা শুরু করেন। আস্তে আস্তে তার কাজের পরিধি আরও বাড়তে থাকে।
