সৈয়দ সাফাত উদ্দিন আহমেদ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মার্কেট এন ট্রান্স লিমিটেড
শুরুতে কাজ করেছেন অনেক জায়গায়। বিজ্ঞাপন সংস্থা, টিভি চ্যানেল, তিনটি টেলি কোম্পানিসহ আরও অনেক জায়গায়। কিন্তু মজা পাচ্ছিলেন না কোথাও। এর মাঝে প্রায়ই ফ্রিল্যান্স ইভেন্টে কাজ করতেন। অফিসের বন্ধুরা ডাকতো ইভেন্টের জন্য। তখন ওদের ইভেন্টসগুলো করে দিতেন। কিন্তু কখনও ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নেননি। এক সময় মনে হলো ইভেন্ট ম্যানেজার হয়ে গেছেন। এর মাঝে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জম্পেশ ঘুরেছেন। দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশিম একদম রপ্ত করে ফেলেছিলেন তখন। হঠাত্ মনে হলো, ‘আরে আমি দেখি ট্যুর ম্যানেজার হয়ে গেছি’। তারপর বাবাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাবা কি করব? আবার চাকরিতে ঢুকব কোনো একটা?’ বাবা বললেন, ‘তোমার জীবন তোমার সিদ্ধান্ত।’ বাবার সেই দিনের উত্তরের জন্য আজকে তিনি এ অবস্থানে আছেন এবং ভালোই আছেন বলে জানালেন। বলছিলাম মার্কেট এন ট্রান্স লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাফায়াত উদ্দিন আহমেদ তমালের কথা। শৈশবটা তার ভালোই ছিল। পুরান ঢাকার আবহে কেটেছে তার সেই দিনগুলো। কৈশোরে তমাল প্রচুর পড়াশোনা করতেন। এখন বাবা আর মাকে নিয়ে তার পরিবার। তার দুই বোন—একজন কানাডাতে, অপরজন ঢাকাতেই বাস করছেন।
পেশা হিসেবে এটা আমাদের দেশে কতটা উপযোগী? উত্তরে তমাল বলেন, ‘খুবই উপযোগী। তবে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু পাল্টাতে হবে আর কি। আমি এমনও শুনছি অনেকেই জানে না, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কী, অ্যাক্টিভেশন কী। আবার অনেকেই বলেন ট্যুরিজমের ব্যবসা হচ্ছে আদম ব্যবসা! মানুষ কিন্তু সব কিছুই রপ্ত করতে পারে। শুধু একটু নিজে থেকে যাচাই করার প্রয়োজন আছে, জানার প্রয়োজন আছে আমাদের দেশে প্রচুর কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আছে আর অনেক নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানও আছে। তাই এখানে কাজ করার অনেকটা জায়গা এখনও খালি আছে বলে আমি মনে করি। প্রয়োজন শুধু একটা শক্ত সিদ্ধান্তের। কাজকে ভালোবাসতে হবে।’ নতুনদের কাজের সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেখুন নতুনরা যে সাহস করেছে এইটাই বেশি। আমি বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে চিনি যারা এখনও শিক্ষার্থী। কিন্তু চেষ্টা চালায় যাচ্ছে, জানার চেষ্টা করছে, শেখার চেষ্টা করছে, যা ইতিবাচক। শুধু মনে রাখতে হবে হাল ছাড়া যাবে না। মনে রাখতে হবে মূল্য যখন দিচ্ছি তখন শেষটা দেখেই যেতে হবে।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন এমন একদিন আসবে যেদিন বাংলাদেশের এয়ারপোর্টগুলোতে প্রচুর বিদেশি পর্যটক থাকবে। শুধু এয়ারপোর্ট না, মার্কেটে, রাস্তায়, দোকানে সবখানে হাজার লাখো বিদেশি পর্যটক দেখা যাবে। রিকশাওয়ালারা ইংরেজিতে পর্যটকদের গাইড করবে, ইন্সট্রাকশন দেবে। রাস্তায় বের হলে শত শত ট্যুরিস্ট কোচ দেখা যাবে।
সৈয়দ সাফাত উদ্দিন আহমেদ
ডাক নাম :তমাল
জন্মতারিখ ও স্থান :২৬ অক্টোবর, ঢাকা
মায়ের নাম :আক্তারি বেগম
বাবার নাম :সৈয়দ শাহবুদ্দিন আহমেদ
প্রথম স্কুল :ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা ও রাশেদ জামান(আমার স্কুল শিক্ষক)
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট, শর্টস,
অবসর কাটে যেভাবে :বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :‘আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ, ওয়ার্কস লাইক হেল, ডু অ্যাডভারটাইস।’
০০০০
ইকবাল হোসাইন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্যুরিস্ট চ্যানেল বাংলাদেশ
পর্যটন শিল্পের বিকাশের ওপর বাংলাদেশের অনেকখানি উন্নয়ন নির্ভর করছে। দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থান ঘটবে ও বেকারত্ব দূরীকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। আমাদের পর্যটনের সম্ভাবনাকে এভাবেই তুলে ধরলেন ট্যুরিস্ট চ্যানেল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হোসাইন। ছেলেবেলা থেকেই ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন ইকবাল। সঙ্গত কারণেই আগ্রহ ছিল যে পর্যটন শিল্পে কাজ করবেন। সেই ভাবনা থেকেই শুরু, প্রথম প্রথম গাইড ট্যুরসের গাইড হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি মূলত ওই প্রতিষ্ঠানের ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল ডেস্কের ইনচার্জ ছিলেন, তারপর কিছুদিন ওরিয়ন গ্রুপের প্রটোকল বিভাগে কাজ করেন। এর মাঝেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও সম্পন্ন করেন তিনি। মাস্টার্স সম্পন্ন করে এমবিএ করেছেন, করেছেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা। ইংল্যান্ড থেকেও ব্যবসায় প্রশাসনে উচ্চশিক্ষা নেন, আর নিজের কাজটা আরও ভালোমতো বুঝে নিতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন থেকে ট্যুরিজম ডিপ্লোমাও করেন। ইকবাল মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা কর্মক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করে। ইকবাল তার যোগ্যতায় অনেক বহুজাতিক কোম্পানিতে দিব্যি আরামে চাকরি করে যেতে পারতেন। তিনি সেটা করেননি, দাঁড় করিয়েছেন নিজের প্রতিষ্ঠান, আর সেটা অবশ্যই অভিজ্ঞতা অর্জনের পরে। এ দেশের ট্যুরিজম ব্যবসায়ী ও ব্যবস্থাপকদের কাছে তিনি হতে পারেন পথপ্রদর্শক। তিনি বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট গাইড অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি বিষয়ক সম্পাদক। সব দায়িত্বই তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই পালন করছেন, কাজ করছেন শতভাগ আত্মতৃপ্তি নিয়ে, দেশকে জানার ও জানানোর এ রকম সরাসরি সৌভাগ্য কতজনের ভাগ্যে হয়!
তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, পেশা হিসেবে এটা আমাদের জন্য কতটা উপযোগী? ইকবাল বললেন, ‘দেশে পর্যটন খাতে প্রচুর লোকের অভাব। অনেকেই হয়তো কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন অথচ বৈচিত্র্যময় এই দিকটা সম্পর্কে কোনোই অভিজ্ঞতা নেই, তারা খুব সহজেই এই বিষয়ে পড়াশোনা করে ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভাবতে পারেন, সময়ের সাথে সাথে আমাদের সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত হচ্ছে। সেজন্যই অনেক অভিজ্ঞ আর চটপটে লোক দরকার হবে এ শিল্পে, যারা নিজেদের এগিয়ে রাখতে পারবেন, তারাই এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবেন, সেটা বলাই বাহুল্য।’ বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান ইকবালের ছেলেবেলা কেটেছে বেশ আনন্দে। বন্ধুদের সাথে দিনভর আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতেন, তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে চাইতেন অবস্থানটা ধরে রাখতে। এখন স্ত্রী ইভাই তার পথচলায় সঙ্গী ও অনুপ্রেরণা।
কথার শেষ পর্যায়ে ইকবাল বলেন, ‘নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে গড়ে তুলেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণীয় অনন্য পর্যটন গন্তব্য হিসেবে’ ইকবাল হোসাইন তার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করে যেতে চান এই খাতকে, পর্যটন শিল্পে নিজেকে যোগ্য একটা আসনে দেখতে চান নিকট ভবিষ্যতে।
ইকবাল হোসাইন
ডাকনাম :বাবু
জন্মতারিখ ও স্থান :১ মার্চ, চাঁদপুর
মায়ের নাম :মনোয়ারা আক্তার
বাবার নাম :মো. আবুল হোসাইন
প্রথম স্কুল :মতলবগঞ্জ জিবি পাইলট হাইস্কুল
প্রিয় উক্তি :সততাই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা।
প্রিয় পোশাক :সাদা-কালো যেকোনো পোশাক।
প্রিয় মানুষ :আমার মা
অবসর কাটে যেভাবে :গিটার বাজিয়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :আকাঙ্ক্ষিত জায়গাতে পৌঁছানো।
০০০০০০
তানভীর আহমেদ
পরিচালক, সিলভার ওয়েভ ট্যুরস লি.
‘পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য পড়ে মনে হয়, ওখানকার মানুষজন ছুটি পেলেই কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়ে। সুনীল-শীর্ষেন্দু-বুদ্ধদেবের প্রচুর পাঠক আছেন এ দেশে। সেই সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বা ফি বছর বাড়ি যাওয়ার বিড়ম্বনা এড়াতে কিংবা মানসিকতার পরিবর্তন যে কারণেই হোক, মানুষের এই বেড়ানোর অভ্যাসটি ইতিবাচকভাবে দেখা দরকার। আমরা নানা সময় নিজের দেশকে অপরূপ হিসেবে উপস্থাপন করি, বিশেষত আবেগের জায়গা থেকে প্রায়ই বলে থাকি—এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! কিন্তু দেশটিকে দেখার ক্ষেত্রে আমাদের একটা জন্মগত অবহেলা ছিল সব সময়। যদিও এ অবহেলার পেছনে খোদ পর্যটনের প্রতি মানুষের অনীহা নাকি নানা অসুবিধার কারণে মানুষ বেড়াতে অনাগ্রহী—সেটি অন্য বিতর্কের বিষয়’, বললেন তানভীর আহমেদ, যিনি সিলভার ওয়েভ ট্যুরসের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই মুহূর্তে।
প্রজন্মের মেধাবী এই ট্যুরিজম ব্যবস্থাপক তার নিজের প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তানভীর পড়াশোনা শেষ করেই বন্ধুর কথায় যোগ দিলেন রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরে, কাজ শুরু করেন, সেটাকে আরও পোক্ত করার জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন থেকে ডিপ্লোমা করেন। আর এরপর কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে শুরু করেন আজকের এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে পথচলা। আর সে যাত্রায় তিনি অনেকটাই সফল। তানভীর মনে করেন, পেশা হিসেবে এখন ট্যুরিজম খুবই আশাব্যঞ্জক। তারা যখন শুরু করেছেন অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তবে যতই দিন যাচ্ছে আস্তে আস্তে অনেক পথনির্দেশনা তৈরি হচ্ছে। নতুনরা যতই তাদের দায়িত্ব, আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে আসবে ততই ভালো হবে বর্ণিল এই পেশাটার জন্য। আরও একটা বিষয়ের উপর জোর দিলেন তানভীর। তিনি বললেন, ‘খুব অল্প সময়েই অনেকে নিজে প্রতিষ্ঠান খুলে বসতে চান, এটা ঠিক নয়, কিছু বুঝে জেনেশুনে তবেই যাত্রা শুরু করা উচিত।’
প্রজন্মের মেধাবী এই ট্যুরিস্ট ব্যবস্থাপক তানভীর মনে করেন, বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪ লাখ লোক জড়িত। বাংলাদেশের পর্যটন স্থানসমূহের যেমন—কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুয়াকাটাসহ প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধ জেলাসমূহে বহুলসংখ্যক লোক এ শিল্পের সাথে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিভিন্ন জেলায় পর্যটন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে হস্তশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম, মত্স্য খামারসহ নানা ধরনের শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারমূলক কাজের সাথেও অনেক লোক জড়িত। পর্যটনের সুবিধা সমাজের নিম্নস্তরে পৌঁছে দিয়ে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব। এমনটাই মনে করেন তানভীর।
বাবা-মা আর চার ভাইবোনের পরিবারে তানভীর বরাবরই সবার ভালোবাসা পেয়ে এসেছেন। তাদের আত্মতৃপ্তিও তার কাজের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। অদূর ভবিষ্যতে তিনি তার স্বপ্নের পথ ধরে দেশের পর্যটন শিল্পকে বড় একটা পর্যায়ে নিয়ে যাবেন, আশাবাদ আমাদের।
তানভীর আহমেদ
ডাকনাম :তানভীর
জন্মতারিখ ও স্থান :২২ মার্চ, গাজীপুর
মায়ের নাম :আকলিমা খাতুন
বাবার নাম :আব্দুল বাতেন
প্রথম স্কুল :ফুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :হযরত মুহম্মদ (স.)
প্রিয় উক্তি :ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লও সহজে।
প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :মুভি দেখে, ভ্রমণে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :কঠোর পরিশ্রম, সেই সাথে সততা।
