রাসেল আমাদের ভালোবাসা

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৪৭
সবচেয়ে যে শেষে এসেছিল সেই গিয়েছে সবার আগে সরে ছোট্ট যে জন ছিল রে সবচেয়ে সেই গিয়েছে সকল শূন্য করে। রাসেলের জন্ম তারিখটি হলো ১৮ অক্টোবর ১৯৬৪। বয়সে আমার অনেক ছোট। জন্মদিনে ওকে খেলনা বা অন্য কিছু উপহার দিতাম। ছোট কেক এনে কাটতাম। মাকে বলতাম, আজ রাসুমণির জন্মদিন। মা বাসায় ভালো কিছু একটা রান্না করে আমাদের সবাইকে খাওয়াতেন। আমাদের দু’বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে রাসেল ছিল সবার ছোট্ট। তাই আমাদের সবার আদরের ভালোবাসার চোখের মণি ছিল ও। মা বলতেন, লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থেকো, তাহলে তোমাকে একটা ছোট্ট বাবু এনে দেব। মার কথামতো লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকার চেষ্টা করতাম। গভীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম কখন মা আমাকে একটা বাবু এনে দেবে। রাসেলের জন্ম হয় অনেক রাতে। আমি ঘুমিয়েছিলাম। আমার মেজফুফু ঘুম ভাঙিয়ে বললেন, জলদি ওঠ, তোমার ভাই হয়েছে। জন্মের পরে ওকে আমার মনে হয়েছিল একটা পুতুল। কী সুন্দর হাসে, আবার কাঁদেও। রাসেল একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠে। মা ও আব্বা নাম রাখলেন রাসেল। স্কুলের নাম ছিল শেখ রিসালউদ্দীন। হাসু আপা ওকে কোলে করে কত গান শোনাত, কত কবিতা শোনাত। কামাল ভাই আর জামাল ভাইও কোলে নিত। আমিও নিতাম। ভয়ও করতাম যদি পড়ে যায়। যদি ব্যথা পায়। ওর খুব কষ্ট হবে। আব্বা খুব আদর করতেন ওকে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই প্রথমে রাসেলকে খুঁজতেন। ওকে কোলে বসিয়ে কত কথা বলতেন। রাসেলও কত কথা জিজ্ঞেস করত। ওর কথা বলার ভঙ্গি দেখে আমাদের খুব মজা লাগতো। রাসেল বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দু মিশিয়ে একটা নিজস্ব ভাষায় কথা বলত। ও খুব দুষ্টু ছিল। পিছন থেকে এসে ভয় দেখাত। তবে ওর হাসিটি খুব মিষ্টি ছিল। সামনের দাঁত পোকায় খায়— তাই ফোকলা মুখে কথা বলত। আব্বা তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। যেদিন সবাই মিলে মায়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় কারাগারে আব্বাকে দেখতে যেতাম সেদিন রাসেল ফেরার সময় খুব কাঁদত। একবার খুব মন ভার করে ঘরে ফিরল। জিজ্ঞেস করতেই বলল, আব্বা আসল না। বলল, ওটা তার বাসা এটা আমার বাসা। এখানে পরে আসবে। কখনো রাতেরবেলা মা, হাসু আপা, কামাল ভাই, জামাল ভাই সবাইকে ডেকে নিয়ে খুব কাঁদত। আমরা প্রথমে বুঝতাম না। মা বলতেন, বোধহয় পেটব্যথা করছে। পরে বুঝতাম আব্বার জন্য ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। রাসেলের জন্মের পর দীর্ঘ সময় আব্বার জেলে কেটেছে। আব্বাকে দীর্ঘ সময় দেখতে না পেয়ে রাসেলের মন খারাপ করত। কাঁদত আব্বার কাছে যাবার জন্য। ওর জন্য আমাদেরও খারাপ লাগত। ওকে তাই খেলার মধ্যে ভুলিয়ে রাখতাম। মা ওকে প্রথমে একটা তিন চাকার সাইকেল কিনে দেন। সারাদিন সাইকেল নিয়ে ব্যস্ত থাকত। ওর খুব প্রিয় ছিল সাইকেলটা। আব্বা কারাবন্দি থাকার সময় আমাদের বাড়িটা খুবই নীরব থাকত। লোকজন বেশি আসত না। রাসেলের স্কুল যাওয়া শুরু চার বছর বয়সে। ও ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়। প্রথম প্রথম ওর সঙ্গে আমাদের কাউকে যেতে হতো। হাসু আপা, কামাল ভাই, জামাল ভাই অথবা আমি ওকে স্কুলে নিয়ে যেতাম। দাঁড়িয়ে থাকতাম বাইরে। ক্লাসে নাম ডাকার সময় রাসেল হাত তুলে ‘এই যে আমি’ বলত। চোখ রাখতো বাইরে আমরা আছি কিনা দেখার জন্য। কিছুদিন পর আমরা আর যেতাম না। স্কুলে ওর অনেক ভালো বন্ধু জুটে যায়। প্রথম প্রথম স্কুলে যেতে চাইত না সে। বলত— আজ তো সোমবার, স্কুলে যাব না। পরে স্কুলের প্রতি ওর আকর্ষণ বেড়ে গেল। স্কুলে যাবার জন্য নিজেই তৈরি হতো। আমাদের প্রতিবেশী ইমরান ও আদিল ছিল ওর বন্ধু। তাদের সাথে সে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলত। আমাদের বাসায় ছোটদের অনেক গল্পের বই ছিল। রাসেলকে পড়ে শোনাতে হতো। একই গল্প পরদিন শোনাতে বসলে দু’এক লাইন বাদ পড়ত। রাসেল ঠিকই ধরে ফেলত এবং বলত কালকের সেই লাইনটা আজ পড়লে না কেন? ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আমাদের ৩২ নম্বর ধানমন্ডি রোডের বাড়ি ঘেরাও করে ইচ্ছেমতো গুলিগোলা ছোঁড়ে। রাসেল ঘুমিয়েছিল ঘরে। একটা গুলির খোসা সেই ঘরে এসে ওর পায়ের ওপর পড়ে। রাসেলকে তুলে মা বাথরুমে লুকিয়ে রাখেন। ২৫ মার্চ রাতে হানাদাররা আব্বাকে বন্দি করে নিয়ে যাবার পর আমরা মায়ের সঙ্গে অনেকের বাসায় থেকেছি। তারপর একদিন পাকিস্তানি সেনারা আমাদের বন্দি করে ধানমন্ডি আঠারো নম্বর রোডের একটি বাসায় নিয়ে রেখেছিল। রাসেল সেই বন্দিজীবন পছন্দ করত না। সে বাসার বাইরে গিয়ে খেলতে চাইত। তার প্রিয় সাইকেল এনে দেবার জন্য জেদ করত। মা তাকে অনেক কষ্টে সামলাতেন। পাকিস্তানি সেনাদের ব্যবহার এতটাই খারাপ ছিল যে, মনে হতো যে কোনো সময় আমাদের মেরে ফেলতে পারে। কামাল ভাই, মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছেন। আব্বারও কোনো খবর নেই। রাসেল একাকী বসে বসে কাঁদত। কাউকে কিছু বলতে পারত না। মনের মধ্যে কষ্ট চেপে রাখত, প্রকাশ করতে চাইত না। চোখে পানি কেন জানতে চাইলে বলত, ধূলো লেগেছে। কামাল ভাই মুক্তিযুদ্ধে যাবার আগে আমাদের একটা ছোট্ট রেডিও দিয়ে যান। আমরা যখন স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতাম রাসেল মুক্তিযুদ্ধের গান শুনে মুখস্থ করে পরে সে নিজেই গাইত। পাকিস্তানি সেনারা জিজ্ঞেস করত যদি— কী গান? রাসেল গাইত জয় জয় জয়, গাছের পাতা হয়, যাতে ওরা কিছু বুঝতে না পারে। ছোট্ট হলেও সে বুঝতে পারত— জয় বাংলা বললে হয়তো সেনারা গুলি করতে পারে। পরে তো সেই গুলি খেয়েই সে চলে গেল আমাদের ছেড়ে। আমাদের বন্দিজীবনের শেষদিকে বোমারু বিমানের আওয়াজ পেলে সৈন্যরা সব ট্রেঞ্চে গিয়ে বসত। একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর আমরা মুক্ত হলাম। পাকিস্তানি আর্মিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর মেজর তারা আমাদের মুক্ত করেন। রাসেল গিয়ে প্রথমে তাঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে। আব্বা পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসার পর রাসেল সবসময় তাঁর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকত। প্রতিদিন বিকালে সে সোবহানবাগে ছোটফুফুর বাসায় যেত। বাড়িতে যে দুধ সে খেতে চাইত না, সেই দুধ মা ছোটফুফুর বাসায় পাঠিয়ে দিতেন। সেখানে ও ঠিকই খেত। রাসেলের প্রিয় খাবার ছিল চকলেট, সমুচা, কোক। কখনো যদি পোলাও ও ডিম পোচ খেত তাতে আবার চিনি দিতে হতো। আমাকে ডাকত ‘দেনা আপু’ বলে। আমার হাতের রান্না দুধ সেমাই খেতে বায়না ধরতো। ছোটফুফার একটা মোটর সাইকেল ছিল। অফিস থেকে ফেরার পথে ছোটফুফাকে প্রতিদিন মোটর সাইকেলে রাসেলকে বসিয়ে বত্রিশ নম্বর রোডে একটা চক্কর দিতেই হতো। ছোটফুফার পেট চেপে ধরে ও বসে থাকত আর খুব মজা পেত। ওর একটা ছোট্ট খেলনা মোটর সাইকেল ছিল, তাতে একটা ছোট্ট ছেলে পুতুল ছিল যেটাকে রাসেল ফুফাজান বলে ডাকত। রাসেল পোশাক পরা নিয়ে খুবই সচেতন ছিল। আব্বার মতো প্রিন্স কোট, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও মুজিবকোট পরত। কোথায় কোন পোশাক পরে যেতে হবে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিল। একবার আব্বাকে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে যেতে হবে। রাসেল আব্বাকে কিছুতেই পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে সাধারণ জুতো পরতে দিতে চাইল না। স্যান্ডেল স্যু না পরা পর্যন্ত চুপ করে বসে রইল। আব্বা বাধ্য হয়ে ওর আবদার রাখলেন। আব্বার সঙ্গে আমার ও রাসেলের জাপান, মস্কো ও লন্ডন বেড়াবার সুযোগ হয়। রাষ্ট্রীয় সফর বলেই রাসেল বিদেশিদের সাথে খুব সৌজন্যমূলক ব্যবহার করত। সে ছোট্ট হলেও বুঝতে পারত কোথায় কীভাবে চলতে ফিরতে হবে। ঢাকায় ফিরে আমি যখন মা ও সবার কাছে ওর এই সুন্দর ব্যবহারের গল্প করেছি সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনেছে। লন্ডনে বিখ্যাত মাদাম তুশোর মিউজিয়ামে আমরা যখন বেড়াতে যাই— রাসেলের বিস্ময় আর কাটে না। আমরা দু’জন আব্বার সাথে নাটোরের উত্তরা গণভবনেও গিয়েছি। রাসেল সেখানে মাছ ধরত। আমরা বাগানে ঘুরে বেড়াতাম। ঢাকার গণভবনেও রাসেল মাছদের খাবার খাওয়াত। ফুফাতো ভাই আরিফ তার খুব ভালো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তারা দু’জন একই স্কুলে পড়ত এবং একসঙ্গে খেলত। টুঙ্গিপাড়ায় তাদের একটা খুদে বাহিনী ছিল, যাদের সঙ্গে খালের পানিতে সাঁতার কাটা, ফুটবল খেলায় মেতে থাকত তারা। টুঙ্গিপাড়া যাবার আগে আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসের রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য কাপড়, চকলেট কিনে দিতেন। চাচা রাসেলের সব আবদার রাখতেন। চাচা ও আরিফ ১৫ আগস্ট রাসেলের সঙ্গেই ঘাতকদের বুলেটে নির্মমভাবে নিহত হয়। ১৯৭৫ সালে আমাদের সঙ্গে রাসেলেরও জার্মানি যাবার কথা ছিল। কিন্তু মা যেতে দেননি। গেলে আজ আর আমরা তাকে হারাতাম না। জার্মানিতে বেড়াবার ফাঁকে ফাঁকে রাসেলের জন্য খেলনা ও জুতো কিনেছিলাম, সেগুলো এখনও আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে আছে। আমি রাসেলকে একটা চিঠি লিখে পোস্ট করেছিলাম, রাসেলের হাতে তা পৌঁছেনি। পঁয়ত্রিশ বছর পরে সে চিঠি আমার হাতেই ফিরে আসে। রাসেলকে নিয়ে কিছু লিখতে হবে কখনো কল্পনা করিনি। আজো রাসেল আমার চোখে সেই দশ বছরের ভাইটি রয়ে গেছে। ঐ বয়সের কাউকে দেখলে আমার চোখে রাসেল ভেসে ওঠে। আমার ছেলে ববি জন্ম নেবার পর ওকেও আমি অনেকদিন রাসেল বলে ডেকেছি। আমার আজো সেই কবিতার লাইনটি মনে পড়ে— ‘সবচেয়ে যে শেষে এসেছিল সেই...।’ ভাবতেই আমার কষ্ট লাগে যে, আজ রাসেল নেই। রাসেলকে আর দেখতে পাব না। রেহানা আপু বলে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে না। কী অপরাধ ছিল তার? মাত্র দশ বছরের পবিত্র এক শিশু ছিল। রাজনীতি কী, ও কি বুঝত? রক্ত দেখলে চোখ বন্ধ করে ফেলত। গোলাগুলির শব্দ শুনলে মাকে জড়িয়ে ধরত, বুকের ভিতর কষ্ট চেপে রাখত— সেই রাসেল সবার রক্ত দেখে দেখে তারপর নিজের রক্ত দিয়ে গেল। এই রক্তাক্ত দৃশ্য সে কেমন করে সহ্য করেছিল? রাসেল আমাদের ব্যথা, আমাদের শোক এবং আমাদের ভালোবাসা। ২৮-০৯-২০১১ সংকলিত