অচল অবরোধে আবদ্ধ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৭
অবরোধ-আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও ভাবমূর্তি দিনের পর দিন ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ভিসি বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ অচলাবস্থার সৃষ্টি। দীর্ঘ বিশ মাসের আন্দোলনের রেশ ধরে বর্তমানে ভিসি অবরুদ্ধ হয়েছেন ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশের দ্বারা। অবস্থা এতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোন শক্তি বা প্রশাসনের সাহায্যে তা নিরসন সম্ভব নয়। আবার ভিসি পদত্যাগ করলেই যে এর আশু সমাধান হবে এমনটাও ভাববার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নয় বলে মনে করছেন অনেকেই। তাহলে কি জাবির ভাগ্যে এ অনাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যয়ই কালক্ষেপণ হয়ে ক্রীড়নকের ভূমিকায় থাকবে নাকি এর যৌক্তিক সমাধান হবে- এসব ধূম্রজালের বাণী আকাশে বাতাসে আজ ধ্বনিত হচ্ছে বার বার। বর্তমান ভিসি ড. আনোয়ার হোসেনও আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও সমূহ বিপদাপদ কিছুটা আঁচ করতে সমর্থ হয়েছেন। শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মহামান্য রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করতে বাধ্য হয়েছেন। আলোচ্য নিবন্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত সমস্যার সমাধান নয়; বরং যে সব প্রভাষক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেছে বা করছে তার স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করা হবে। প্রাক্তন ভিসি ড. শরীফ এনামুল কবির ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি কে হবেন তা নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাবির বর্তমান রাজনৈতিক, চৌকস, সুকৌশলী ও সফল ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে সরিয়ে ড. আনোয়ার হোসেন ভিসি হবেন এমন গুঞ্জন ঢাবির ক্যাম্পাসে অনেকের মুখে শোনা যায়। সরকার অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বানিয়ে ‘সাপ মারা ও লাঠি না ভাঙ্গা’ নীতি অনুসরণ করে সে সমস্যার আপাতত সমাধান দেন। কিন্তু ঢাবির সমাধান হলেও জাহাঙ্গীরনগরের সমস্যার সমাধান তো হয়নি বরং তা ঘনীভূত হয়েছে। শিক্ষক-ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি অংশ শুরু থেকেই ড. আনোয়ার হোসেনকে মেনে নিতে পারেননি। ভিসি হতে ইচ্ছুক আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক এবং তাদের সতীর্থরা ভিসি বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। সে সময় তারা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় ভিসি নিয়োগের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে রাষ্ট্রপতিকে এ ব্যাপারে স্মারকলিপি দেয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পরেই ড. আনোয়ার হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভিসি প্যানেল নির্বাচনের ঘোষণা দেন। আর তখন থেকেই শুরু হয় বৈরি প্রতিবেশ। এ ঘোষণার বিরোধিতা করেন মেয়াদোত্তীর্ণ ডিন, সিন্ডিকেট, সিনেট সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। শেষে এক শিক্ষক ভিসি প্যানেলের বৈধতা নিয়ে রিট করলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের রায় মোতাবেক গত বছরের ২০ জুলাই ভিসি প্যানেল নির্বাচনে ভিসি হিসেবে নির্বাচিত হন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। ভিসি বিরোধী শিক্ষকগণ এ সময় প্রশাসনিক ভবন এক সপ্তাহকাল অবরুদ্ধ করে রাখেন। শুরু হয় জাবির অবরোধ কাহিনী। ধর্মঘট, আন্দোলন, অবরোধ হিসেবে কুখ্যাতিতে জাহাঙ্গীরনগরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে থাকে চরম থেকে চরমতম। ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ব্যক্তি হিংসা ও লোভ, ক্ষমতার মোহ প্রভৃতি এ আন্দোলনের মূল কারণ বলে অনেকের ধারণা। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থরক্ষা নয় এক শ্রেণির শিক্ষক তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই এ আন্দোলনে প্রণোদনা দিচ্ছেন বলে মত দিচ্ছেন কেউ কেউ। অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- তিনি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দলীয় আনুগত্যকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে তিনি দূরত্ব তৈরিতে গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানে তিনি শিক্ষক সমিতির সঙ্গে নয় তিনি বৈঠক করেন দলীয় ছাত্র নেতাদের সাথে ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্মিলিত শিক্ষক পরিষদের আন্দোলনে তার দলীয় অনুগত ছাত্রলীগ বাধা ও হামলা করলেও দোষীদের তিনি বিচার করেননি। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রায় বিশ মাসের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা যদি সত্য হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক থাকার তার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। আর যদি তা হয় তাহলে একজন নির্বাচিত ভিসিকে এভাবে জিম্মি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্টকারীদের শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানের সূতিকাগার। শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক জ্ঞান লাভের এটাই সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্জিত জ্ঞান তারা জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তাদের মানসপটে নানাভাবে প্রভাব ফেলে। শিক্ষার ইতিবাচক পরিবেশ তাই একান্তভাবে কাম্য। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে যে শনিরদশা শুরু হয়েছে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জরুরি। দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় কোন্দল, দলীয় অনুগতদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, অযোগ্য ভিসি নিয়োগ প্রভৃতি কারণে আমাদের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হয়। নীতি বিবর্জিত এ ধারাবাহিকতায় উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের নীতি-নৈতিকতাকে গ্রাস করছে পরতে পরতে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় এ যাঁতাকলের নিষ্পেষণ কতটা ভয়াবহ। সরকারি মদদপুষ্টতা কত জটিল ও নীতি বিবর্জিত হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে তার দৃষ্টান্ত এটি। যে কারণে উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে অসুরের পদধ্বনি মাঝে-মধ্যেই অনিবার্য হয়ে ওঠে। এরূপ কষাঘাতে জর্জরিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সচেতন সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে আন্দোলন শুরু করেছিলেন শুরুতে। পরে এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ ও পদ পাওয়া না পাওয়ার হিসেব নিকেশ। ভিসি প্রত্যাশীরা ড. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই যে অঙ্গুলি প্রদর্শন করে আসছেন তার তীব্রতা আরও বাড়ছে। সত্, নিষ্ঠাবান, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার প্রত্যয়ী হলে বর্তমান ভিসি নিশ্চয়ই সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আনুকূল্য পেতেন। কিন্তু শুরু থেকেই তিনি সে আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। অতিমাত্রায় রাজনৈতিক অবস্থান তার এ অবস্থানকে নড়বড় করে দিয়েছে। তা না হলে শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত ভিসির এরূপ পরিণাম হবার কথা নয়। সুন্দর বাচনভঙ্গি, রাজনৈতিক কুশলী ভিসি সবার মনে আসীন হবেন ভেবে সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তার উপর যে আস্থা পোষণ করেছিলেন তার সঠিক মূল্য দিতে অনেকের দৃষ্টিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমানে তিনি নিজেও ভিসি বাংলোর বাইরে সস্ত্রীক অবস্থান করছেন। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার ভবনেও চলছে অচলাবস্থা। শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি এখন দিবালোকের মত পরিষ্কার। এক ভিসির সঙ্গে আছেন; অন্যপক্ষ ভিসি বিরোধী আন্দোলনে ব্যাপৃত। এভাবে চলতে থাকলে জাবির ১ম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হবে। এ অবস্থা নিরসনকল্পে সরকারের পুনরায় পদক্ষেপ চান শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন শিক্ষক মহল। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে জাবির অচল, অবরোধ নিরসন করা জরুরি। বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষামন্ত্রী কিছুদিন পূর্বে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও ভিসির সঙ্গে আলোচনা করে ক্যাম্পাসে স্থিতাবস্থা নিশ্চিত করেন। কিন্তু সে প্রচেষ্টা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই তা নতুন আন্দোলনে রূপ নেয়। শিক্ষামন্ত্রীর উচিত পুনরায় শিক্ষকদের সঙ্গে বসে এর সুষ্ঠু সমাধান দেয়া । ভিসি মহোদয় ও শিক্ষকগণের মধ্যে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করে বর্তমান সমস্যার সমাধান দিতে না পারলে আপাতত সমাধানে এ আন্দোলন স্তিমিত করা যাবে না। নানা অনুষঙ্গ বিবেচনায় রেখে সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হতে হবে। কারণ বর্তমান ভিসি মহোদয়কে সরিয়ে অন্য কাউকে ভিসি বানালেই এ সমস্যার সমাধান হবে তা মনে করেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন ও নিরপেক্ষ শিক্ষক-ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারী। কারণ অতীতের ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। এর আগে চার-চারবার ভিসি পরিবর্তন করেও কোন ফল হয়নি বরং আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির তীব্রতা বেড়েছে। আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি কেমন সিদ্ধান্ত নেবেন তার উপরই নির্ভর করছে জাহাঙ্গীরনগরের ভবিষ্যত্। যে কোন সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব- তা যদি গুরুত্ব ও নিয়ম-নীতির মাধ্যমে করা হয়। জাহাঙ্গীরনগরের সৃষ্ট সমস্যা অধিক গুরুত্ব দিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সমাধানে সচেষ্ট হবেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মহল আশা করছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পড়তে আসা সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার অবসান হবে শীঘ্রই এমনটা আশা করছেন তারা। শিক্ষামন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি কী সিদ্ধান্ত নেন সে দিকেই সবার দৃষ্টি এখন। আলোচনার মাধ্যমে বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই জাবির সমস্যার পথ সুগম হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়