সিলেটের কমলা মাল্টা ও সাতকরার ভুবনে

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১৭
কমলা খেতে কার না ভালো লাগে। আর তা যদি হয় সুমিষ্ট তাহলে তো কথাই নেই। শীত মৌসুমে আমাদের দেশে সিলেটসহ আরো কয়েকটি অঞ্চলে যেমন কমলা উত্পাদিত হয়, তেমনি বাইরে থেকে আমদানিও হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তবে আমাদের দেশীয় জাতের কমলার মিষ্টতা বৃদ্ধির বিষয়টি এমনি এমনিই হয়নি। ২০ বছর আগেও দেশে উত্পাদিত কমলা ছিল টক। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। দেশের কমলাও এখন মিষ্টি হয়। সেই সঙ্গে বেড়েছে উত্পাদনের পরিমাণও। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধীনে পরিচালিত সিলেটের সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের জন্য। শুধু ফলের গুণ-মান উন্নয়ন নয়, বিভিন্ন জাতের মসলা উন্নতকরণেও গবেষণা চলছে এই কেন্দ্রে। তাদের গবেষণার কারণেই দেশে দশ বছরে কমলার ফলন বেড়েছে চার গুণ। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহ মোহাম্মদ লুত্ফুর রহমান বলছিলেন, ‘আমরা একটি ফলকে উন্নত করতে দীর্ঘদিন গবেষণা করি। তার উন্নত জাত তৈরি, ফলের স্বাদ বাড়ানোসহ বেশ কয়েকটি ধাপ রয়েছে। যেমন কমলার নতুন একটি জাত আমরা উত্পাদনের জন্য মাঠ পর্যায়ে পাঠিয়েছি। কমলাটি স্বাদেও বেশ মিষ্টি, আকারেও বড়। রংটাও আকর্ষণীয়। এই জাতটি তৈরিতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লেগেছে।’ সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার গৌরিশঙ্কর গ্রাম সংলগ্ন এই সাইট্রাস ফল গবেষণা কেন্দ্রে গেলে যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে। বিশাল বিশাল বেডে সারিবদ্ধ ফলের গাছ—কমলা, সাতকরা, বাতাবিলেবু। এখন ধরে আছে বাতাবিলেবু। যদিও বাতাবিলেবুর ফলন মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফল ধরেছে কমলা গাছে। কাঁচা সবুজ কমলা আর কিছুদিনের মধ্যেই হলদেটে রং ধরবে। গবেষণা কর্মকর্তারা সেসব ফলের গুণগত মান পরীক্ষা করছেন। শুধু কমলা নয়, মাল্টা, সাতকরা, বাতাবিলেবু, লেবুসহ আরো বেশ কিছু ফলের উন্নত জাত, উত্পাদন প্রযুক্তি, রোগমুক্তকরণ ও প্রক্রিয়াজাতের কলা-কৌশল উদ্ভাবনের গবেষণা চলছে এই কেন্দ্রে। একটি জাত তৈরির পর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সেই জাতের চারা ও কলম সরবরাহ করা হয়। সিলেটের বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, কুলাউড়া, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট প্রভৃতি অঞ্চলে সাইট্রাস জাতীয় ফলের উত্পাদন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে ৯ হাজার হেক্টর জমিতে সাইট্রাস জাতীয় ফলের চাষ হয়ে থাকে। শুধু সিলেটেই চাষ হয় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে। সিলেটের জমিতে বর্তমানে প্রতি হেক্টরে ১৫ টন সাইট্রাস জাতীয় ফল উত্পাদন হয়। ২০১০-১১ সালে দেশে সাইট্রাস জাতীয় ফলের উত্পাদন ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। অথচ ২০০০ সালের দিকে এর উত্পাদন ছিল মাত্র ৪০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১০-১১ সালে শুধু কমলার উত্পাদন হয়েছে ৩ হাজার মেট্রিক টন। দশ বছর আগে এর উত্পাদন ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ মেট্রিক টন। সম্প্রতি, এইসব ফলের চাষ ও উত্পাদন বাড়াতে ৫ বছর মেয়াদি সাইট্রাস ফ্রুট ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট একনেকে পাস হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রের সাফল্য এ সাইট্রাস কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ৪টি ফলের ও ১টি মসলার জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এছাড়া ১টি মাল্টা, ১টি বাতাবিলেবু ও ১টি লটকনের জাতও উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা খুব শিগগিরই মুক্ত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে বারি কমলা-১ যা ১৯৯৬ সালে মুক্ত করা হয়। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে ৩০০ থেকে ৪০০টি ফল হয়। যার একেকটির ওজন প্রায় ২০০ গ্রাম। লুত্ফুর রহমান বললেন, ‘আমাদের দেশের কমলার সম্পর্কে ধারণা ছিল এসব ফল টক। আসলে তা ঠিক নয়। এসব কমলা গাছে পাকতে দিলে মিষ্টি হয়। কিন্তু উত্পাদন ব্যবস্থার আধুনিক দিকগুলো কৃষকদের না জানার কারণে তারা কমলা পাকার আগেই গাছ থেকে নামিয়ে ফেলতেন। এখন সিলেটের কৃষকরা জানেন কিভাবে এসব ফল রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। তাছাড়া এই বারি কমলা-১ আগের দেশি কমলার চাইতে গুণগতভাবে অনেক উন্নত। এছাড়াও বারি মাল্টা-১, বারি সাতকরা-১, জৈন্তা গোলমরিচ, বারি থৈকর-১ প্রভৃতি এ গবেষণা কেন্দ্রে উন্নত করে চাষের জন্য মুক্ত করা হয়েছে। সমস্যায় মোড়া সাইট্রাস কেন্দ্র, নেই আধুনিক গবেষণাগার গবেষণা কেন্দ্রের সমস্যা অনেক। নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসহ আধুনিক ল্যাবরেটরি। প্রায় সাড়ে ১৮ একর জমি নিয়ে গবেষণা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এর সীমানা প্রাচীর করা হয়নি। কিছু অংশে সীমানা প্রাচীর থাকলেও একটা বড় অংশে তা না থাকায় অরক্ষিত অবস্থায় থাকে গবেষণার বেডগুলো। এছাড়া গ্রিন হাউজগুলোর নেট নেই বেশিরভাগ শেডে। নেই পর্যাপ্ত বিদ্যুত্ সংযোগ। এমনকি এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে বাসস্থান সেসবও খুবই নিম্নমানের। গত শতকের ষাটের দশকে টিনের ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর আর কোন ভবন বানানো হয়নি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষণা কর্মকর্তাদের জন্য। এখানকার এক গবেষণা কর্মকর্তারা জানালেন, একটি ফলের গবেষণা করতে দীর্ঘ সময় লাগে। তবে আধুনিক গবেষণাগার থাকলে এবং পর্যাপ্ত উপকরণের সরবরাহ থাকলে এসব কাজ আরো দ্রুততার সঙ্গে করা সম্ভব। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। সাইট্রাস কেন্দ্রের পটভূমি ফুল-ফল ও শাক-সবজি উত্পাদন ও গবেষণার জন্য ১৯৫১ সালে কৃষি কার্যক্রমের অধীনে ‘অর্গানাইজেশন অব হর্টিকালচার সেকশন’ নামে প্রকল্প চালু হয়। তার অধীনে তামাবিলের চৈইলাখালে ৫ একর জমি নিয়ে ১৯৫৪ সালে একটি উপকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ধরনের ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে তার মূল্যায়ন ও নির্বাচন করে মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদের উপযোগী করা। এ কার্যক্রমের অংশ হিসাবে ১৯৫৯-৬০ সালে জৈন্তাপুরে ৫৩ একর জমি নিয়ে ফল উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য ছিল লেবু জাতীয় ফলের ওপর গবেষণা করা। ১৯৬১ সালে আরো ৬৫ একর জমি নিয়ে গোলমরিচ চাষাবাদের জন্য প্রকল্প চালু হয়। পরে ১৯৭০ সালে এদের একীভূত করা হয়। ১৯৭৬ সালে একে কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধিভুক্ত করা হয়। জৈন্তাপুর এলাকা ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সাইট্রাস জাতীয় ফল যেমন কমলা, মাল্টা, সাতকরা, বিভিন্ন ধরনের লেবু, বাতাবিলেবু প্রভৃতি ফলের চাষাবাদের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে ফল উন্নয়ন কেন্দ্রকে সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র হিসাবে নামকরণ করা হয়। ১৯৯৭ সালে এখানে মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এছাড়া লেবু জাতীয় ফলসহ বিভিন্ন ধরনের ফল এবং ঔষধি গাছের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য ২০০৫ সালে একটি জিন ব্যাংক স্থাপন করা হয়। গবেষণা কেন্দ্রের মোট জমিকে গবেষণার সুবিধার জন্য ১৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে পর্যায়ক্রমে গবেষণা প্লট, মাতৃ ফল বাগান ও বিভিন্ন জাতের ফলের মাঠ পর্যায়ের ‘জিন ব্যাংক’ করা হচ্ছে।