মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার উদ্বোধন

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১৯
গতকাল শুক্রবার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ এবং দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনে আজ শনিবার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে এই ফ্লাইওভার। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টার কিছুক্ষণ পর বহুল প্রতীক্ষিত এই ফ্লাইওভারের কুতুবখালী সীমানায় ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে প্রধানমন্ত্রী গুলিস্তান পয়েন্টে রাজধানীবাসীর পরম আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নের এই ফ্লাইওভারের ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ফ্লাইওভারের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে গুলিস্তান থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের উপস্থিতিতে উত্সবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুলেট প্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জ জিপে চড়ে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যাত্রাবাড়ির কুতুবখালী প্রান্তে পৌঁছান। সেখানে ফলক উন্মোচন শেষে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মোনাজাত করেন। মোনাজাতের পর ফ্লাইওভারে সর্বপ্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি অঙ্কিত ৫০ টাকার স্মারক মুদ্রা দিয়ে টোল পরিশোধ করেন। এ সময় ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম একটি বাঁধানো স্মারক টোল টিকেট প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। টোল দেয়া শেষে প্রধানমন্ত্রী পায়ে হেঁটে টোল প্লাজা পার হন। গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ি আসার পথে সায়েদাবাদ সুপার মার্কেটের কাছের একটি স্থানে গাড়ি থামিয়ে নেমে কিছুদূর হেঁটে ফ্লাইওভার থেকে আশপাশের এলাকা দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় প্লাজার নিচে ও ফ্লাইওভারের আশপাশে জড়ো হওয়া হাজার হাজার জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল সায়েদাবাদ থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়। তারা স্লোগান ও তুমুল করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে সমবেত জনতার অভিবাদনের জবাব দেন। হর্ষোত্ফুল্ল প্রধানমন্ত্রী ফ্লাইওভারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছানোর সময় উভয় পাশে বাসাবাড়ি ও ভবনের ছাদে অপেক্ষমাণ অসংখ্য নারী-পুরুষ তাকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে রওয়ানা হয়ে ফ্লাইওভারের গুলিস্তান পয়েন্টে উদ্বোধন স্থানে পৌঁছালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শামসুল হক টুকু, স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহিদ খানসহ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ফ্লাইওভার বাস্তবায়নকারী ওরিয়ন গ্রুপের প্রধান কর্ণধার মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম তাকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে ফ্লাইওভারের নির্মাণ সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন ওবায়দুল করিম। ওবায়দুল করিম প্রধানমন্ত্রীকে ফ্লাইওভারের অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করা হবে বলে জানান। দেশে এই প্রথম বারের মতো সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ফ্লাইওভারটি নির্মিত হয়েছে। এটির নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। ফ্লাইওভারটির ডিজাইন করেছে কানাডিয়ান কোম্পানি লি কানাডা। এটি নির্মাণ করছে ভারতের খ্যাতনামা সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল লিমিটেড। নির্মাণকাজের ব্যবস্থাপনা করছে লাসা নামে ভারতের আরেকটি কোম্পানি। ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই ফ্লাইওভারটির নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রথমে এ ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য ছিল ৭ কিলোমিটার। পরে মহানগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা মাথায় রেখে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সমন্বয় ও পলাশী অভিমুখে ফ্লাইওভার সম্প্রসারণের কারণে এর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। দেশের সবচেয়ে বড় এ ফ্লাইওভারের সঙ্গে আশেপাশের প্রধান সড়ক ও বাস টার্মিনালের সংযোগ রাখা হয়েছে। চার লেনের এই উড়াল সড়কে প্রবেশের জন্য ছয়টি এবং বের হওয়ার জন্য পাঁচটি পথ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২২ জুন এ ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। ফ্লাইওভারের গুলিস্তান, পলাশী, মতিঝিল ও শনির আখড়া পর্যন্ত পথ খুলে দেয়া হয়েছে। সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডের জনপথের কিছু কাজ বাকি আছে। ঢাকা ওয়াসার ইউটিলিটি লাইন, বিভিন্ন প্রকার অবৈধ দখলদারদের অপসারণে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে জনপথ, ঢাকা - মাওয়া মহাসড়ক এবং পুরাতন ডেমরা সড়কের সংযোগকারী র্যাম্প নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যেই এসব কাজ শেষ হবে। ফ্লাইওভারে যানবাহন প্রবেশের সময় কোন টোল দিতে হবে না। বের হওয়ার পথে টোলের জন্য নির্ধারিত অর্থ প্রদান করতে হবে। তবে জনসাধারণের প্রবেশের জন্য কোন বাধা থাকবে না এবং কোন প্রকার টোল প্রদান করতে হবে না। টোলের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ট্রেইলার ২০০ টাকা, ট্রাক ১৫০, বাস ১৫০, ট্রাক (চার চাকা) ১০০, মিনি বাস ১০০, পিকআপ ৭৫, মাইক্রোবাস ৫০, জিপ ৪০, কার ৩৫, অটোরিক্সা ১০, দুই চাকার বাহন ৫ টাকা। উদ্বোধনের পর ওরিয়ন গ্রুপ নিজেই এর ব্যবস্থাপনা, টোল আদায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ করবে। চালুর পর থেকে ২৪ বছর টোল আদায় করবে ওরিয়ন গ্রুপ। টোল আদায় করেই তারা নির্মাণ ব্যয় তুলে নেবে। তারপরে এটি হস্তান্তর করা হবে ডিসিসির কাছে। তবে প্রতিদিন যে টোল আদায় হবে তার শতকরা ৫ ভাগ দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের খাতে জমা হবে। ফ্লাইওভারটির ধারণক্ষমতা ২০০ টন এবং স্থায়ীত্বকাল ১০০ বছর। টোল আদায়েও থাকছে প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিকতার ছোঁয়া। এই প্রথমবারের মতো টোল আদায়ে ব্যবহার করা হবে এভিসি (অটোমেটিক ভেহিকেল ক্লাসিফিকেশন) পদ্ধতি। ফ্লাইওভারটি যারা ব্যবহার করবেন, তারা আগেই টোল পরিশোধ করবেন। গাড়িতে লাগানো থাকবে একটি প্রি-পেইড স্টিকার। কোন গাড়ি ফ্লাইওভার অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল কেটে নেয়া হবে। পরিশোধিত টাকা শেষ হয়ে গেলে আবারও রিচার্জ করা যাবে। এছাড়াও থাকছে দৃষ্টিনন্দন টোল প্লাজা। সেখানে নগদ টোল পরিশোধ করা যাবে। এমপিকে ডেকে নিলেনপ্রধানমন্ত্রী বিশেষ প্রতিনিধি \ মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার উদ্বোধনকে ঘিরে গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালি পর্যন্ত গতকাল শুক্রবার ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী যখন কুতুবখালি প্রান্তে ফলক উন্মোচন ও মোনাজাত শেষে গাড়িতে করে গুলিস্তানের দিকে রওয়ানা হন তখন অন্যান্য নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ফ্লাইওভারের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা। প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানানোর জন্য তিনি হাত নেড়ে গাড়ির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে বাধা দেয়। এসময় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে হাবিবুর রহমান মোল্লাকে তার কাছে আসার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি গাড়ির কাছে গেলে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং ফ্রাইওভার নিয়ে কথা বলেন।