যারা টাকার গাছ দেখেননি কখনও, তাদের কাছে রসিকতা মনে হবে। কিংবা যাদের টাকার গাছ আছে তারা ভাববেন টাকা গাছেও ধরে। কথায় বলে না- টাকার নাও পাহাড়েও চলে। অবিশ্বাস্য মনে হয়, তাহলে শুনুন, মাত্র ২৫ টাকা খরচা করলেই পাবেন লাখ টাকা। এও কি সম্ভব?
সত্য-মিথ্যা পরে হবে, আগে দেখে আসুন টাকার গাছটি। থোকায় থোকায় ধরে আছে শত শত টাকাকড়ি। এরই মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া। বর্ণিল সাজে সজ্জিত এমন কাণ্ড দেখতে হলে চলে যাবেন মিরপুরে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার গাছ লাগিয়েছে সেখানে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রা সচক্ষে দেখা যাবে আর অবাক হতে হবে এই ভেবে যে, বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক মানের ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীও বললেন, ‘মুদ্রা বা টাকা নির্বাক নয়, তা ইতিহাসের কথা বলে। টাকা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়। এটি ইতিহাস সংরক্ষণেরও একটি মাধ্যম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের জাদুঘর রয়েছে। বাংলাদেশও আজ সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো।’
ঘটনাটা কী ঘটেছিল গত ৫ অক্টোবর। আসলে টাকার গাছ বলি আর নানা কথাই আলোচনায় থাকুক না কেন, সময় ও ইতিহাসকে ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে কারেন্সি মিউজিয়াম বা মুদ্রা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যাকে বলা হচ্ছে টাকার জাদুঘর। এই জাদুঘরের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে এর কাগুজে নোট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ের কাগুজে নোটসহ এ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, সাবেক চেকোশ্লে¬াভাকিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী জাপানি ডলার, ইতালি, সাবেক বিভক্ত জার্মানি, আফগানিস্তান, চীন, ল্যাটিন আমেরিকা, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, ভিয়েতনাম এবং কমিউনিস্ট আমলের পোলিশ ব্যাংকনোট, চেক ও বন্ড।
মুদ্রার পাশাপাশি এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে প্রাচীন মুদ্রা দ্বারা নির্মিত অলংকার, মুদ্র্রা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহূত কাঠের বাক্স, লোহার তৈরি কয়েন ব্যাংক এবং লোহার সিন্ধুক প্রভৃতি। এ ছাড়া শস্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহূত মাটির মটকাও প্রদর্শিত হচ্ছে এ জাদুঘরে। গ্যালারির একটিতে ছোট দুটি কেবিনের মতো। এ কেবিনে ঢুকে গাদা গাদা টাকার মধ্যে তোলা যাবে নিজের ছবি। বিবিটিএ’র দ্বিতীয় তলায় স্থাপিত এ জাদুঘরে রয়েছে দুটো গ্যালারি। গ্যালারি ১-এ উপমহাদেশের বিভিন্ন শাসনামলে প্রচলিত মুদ্রা প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা, হরিকেলের মুদ্রা, ইন্দো-পার্থিয়ান মুদ্রা, কুশান মুদ্রা, কুচবিহারের মুদ্রা, বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের মুদ্রা, মোগল সম্রাটদের মুদ্রা। আরও রয়েছে মোগল শাসনের সমাপ্তির পর ১৮৩৫ সাল থেকে প্রচলিত ব্রিটিশভারতীয় মুদ্র্রা। প্রাচীন বাংলায় ব্যবহূত বেশ কিছু কড়িও প্রদর্শিত হচ্ছে এ গ্যালারিতে।
গ্যালারি ২-তে প্রদর্শিত হচ্ছে বর্তমান সময়ের যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, আর্জেন্টিনা, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশসহ প্রায় সকল দেশের মুদ্রা। মুদ্রার পাশাপাশি এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে প্রাচীন মুদ্রা দ্বারা নির্মিত অলংকার, মুদ্র্রা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহূত কাঠের বাক্স, লোহার তৈরি কয়েন ব্যাংক এবং লোহার সিন্ধুক প্রভৃতি। এ ছাড়া শস্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহূত মাটির মটকাও প্রদর্শিত হচ্ছে এ জাদুঘরে।
জাদুঘরে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির নানা ধরনের ব্যবহার। এখানে রয়েছে ডিজিটাল সাইনেজ, ডিজিটাল কিয়স্ক, এলইডি টিভি, থ্রিডি টিভি, প্রজেক্টর এবং ফটো কিয়স্ক। ডিজিটাল সাইনেজে টাকা জাদুঘর সংক্রান্ত বিভিন্ন আপডেট তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। ডিজিটাল কিয়স্কের মাধ্যমে শোকেসে প্রদর্শিত মুদ্রাগুলোর ভিডিও ও তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে। আধুুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির এই কিয়স্কে আঙুলের স্পর্শে মুহূর্তে একের পর এক নোট ও মুদ্রার পরিপূর্ণ তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
জাদুঘরে একটি স্যুভেনির শপও রয়েছে। এখান থেকে দর্শনার্থীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সময়ে মুদ্রিত স্মারক মুদ্রা, স্মারক নোট, বিভিন্ন ধরনের স্যুভেনির দ্রব্য এবং টাকা জাদুঘরের বিভিন্ন প্রকাশনা কিনতে পারবেন। কেবিনে ঢুকে গাদা গাদা টাকার মধ্যে তোলা যাবে নিজের ছবি। এক লাখ টাকা মূল্যমানের স্যুভেনির নোটও সংগ্রহ করতে পারবেন এখান থেকে, যদিও মূল্য মাত্র ২০-২৫ টাকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সংগ্রহে নজর বোলাতে পারবেন এ গ্যালারিতেই। এরই এক কোণে দেখা যাবে শত বছরের পুরোনো বিশাল এক মটকা বা মাটির হাঁড়ি। আমাদের এ অঞ্চলে তো একটা সময় এগুলোই অর্থ জমানোর কাজে ব্যবহার হতো।
গত ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন কালে গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেক সংগ্রাহক তার মূল্যবান মুদ্রা এ জাদুঘরে উপহার হিসেবে দান করেছেন। এ ছাড়া বেশকিছু মুদ্রা কেনা হয়েছে। কেনা ও সংগ্রহ করা মুদ্রার সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বমানের জাদুঘর তৈরির লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মুদ্রা ও নোট বিনিময় প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’
মিরপুর-২-এ অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেনিং একাডেমিতে এই টাকার জাদুঘর খোলা থাকবে শনি থেকে বুধবার সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। কোনো প্রবেশ ফি নেই। জাদুঘরে আসা দর্শনার্থীদের কাছে বড় আকর্ষণ ফটো কিয়স্ক। ফটো কিয়স্কের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের আবক্ষ ছবি বিশেষ একটি স্যুভেনির নোটে প্রতিস্থাপন করে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফটো কিয়স্কে ছবি তোলার জন্য দর্শনার্থীকে ব্যয় করতে হবে ২০ টাকা।
শুরুতেই যা বলেছি, গ্যালারির প্রবেশমুখেই রয়েছে সেই টাকার গাছ। সেখানে ঝুলতে দেখা যাবে অসংখ্য মুদ্রার রেপ্লিকা। দর্শনার্থী বাটনে ক্লিক করলেই ডিসপ্লেতে চলে আসবে মুদ্রাবিষয়ক প্রামাণ্য তথ্য। আরও রয়েছে থ্রিডি ডিসপ্লে, পোড়ামাটির মুরাল, ডিওরমা। তিনটি ডিওরমায় বাংলার মুদ্রা বিনিময় পদ্ধতি ছাড়াও থাকছে অর্থ সঞ্চয়ের বার্তা।
বাংলাদেশে মহাস্থানগড় ও নরসিংদী জেলার উয়ারী বটেশ্বরে পাওয়া গেছে অনেক ছাপাঙ্কিত মুদ্রা। টাকার এ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে এমন অনেক দুর্লভ মুদ্রা। এখানে আছে গুপ্ত যুগের মুদ্রা, গুপ্তোত্তর যুগের বাংলার মুদ্রা, খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে নবম শতক পর্যন্ত হরিকেল রাজ্যে প্রচলিত রৌপ্য মুদ্রা এবং প্রাচীনকাল থেকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলায় ধাতব মুদ্রার পরিবর্তে ব্যবহূত কড়িসহ বিভিন্ন যুগের মুদ্রা।
টাকার জাদুঘর বাস্তবায়ন উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। চিত্রশিল্পী হাশেম খানের সভাপতিত্বে ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন, স্থপতি রবিউল হুসাইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক দাশগুপ্ত অসীম কুমারের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি পুরো কাজের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তদারকি করেন।
