রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কর্মী আমিনুল ইসলাম রয়েলকে (৩০) নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রবিবার দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার বিড়লদহ মাজার এলাকার একটি বাড়িতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রয়েল রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। তিনি বিড়লদহ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা শেখ ওয়াজেদ ওরফে মাখনের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে রয়েল ছিলেন সবচেয়ে ছোট।
এমপি আব্দুল ওয়াদুদ দারা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলেন, ‘এটি একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে কলুষিত করতে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে ঘরে ঢুকে রয়েলকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। হাসপাতালে নেয়ার পথে রয়েল তার উপর হামলাকারীদের নাম বলে গেছে।’ একই দাবি রয়েলের পরিবারের সদস্যদেরও।
পুলিশ জানায়, বিড়লদহ গ্রামের ইয়াকুব ড্রাইভারের বাড়ির একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন রয়েল। রবিবার গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা তার কক্ষে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার বাম হাত থেকে কব্জি বিচ্ছিন্ন করে ও পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে। এ সময় তিনি চিত্কার দিলে দুর্বৃত্তরা তার গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। ওই রাতেই তাকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার সময় সোমবার ভোররাতে তার মৃত্যু হয়। এলাকাবাসী ও পারিবারিকসূত্র জানায়, দুর্বৃত্তরা হামলা শেষে পালিয়ে যাওয়ার পর রয়েল হামাগুড়ি দিয়ে কক্ষের বাইরে এসে বাঁচার জন্য চিত্কার করতে থাকে। চিত্কারে গৃহকর্তা ইয়াকুব আলীর স্ত্রী জমেলা বেগমের ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিন্তু তার ঘরের দরজার শিকল বাইরে থেকে লাগানো থাকায় তিনি বের হতে পারছিলেন না। তিনি ঘরের জানালা দিয়ে রয়েলকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে চিত্কার শুরু করেন। কিন্তু ওই বাড়ির অন্যান্য ঘরের দরজার শিকলও বাইরে থেকে লাগানো থাকায় কেউ বের হতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় গুরুতর আহত রয়েল একটি দরজার শিকল খুলে দিলে গৃহকর্ত্রী জমেলা বেগম বাইরে এসে অন্যান্য ঘরের দরজার শিকল খুলে দেন। এরপর এমপি দারার বাড়িতে খবর দিয়ে রয়েলকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
জমেলা বেগম জানান, রয়েল রাতে তাদের একটি কক্ষে থাকলেও সারাদিন এমপি দারার বাড়িতেই কাটাতেন।
রামেক হাসপাতাল পুলিশ বক্সের ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) উত্তম কুমার বলেন, রয়েলকে মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নেয়া হয়। সেখান থেকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর তিনি ভোররাতে মারা যান।
রয়েলের বড়ভাই ওবাইদুল ইসলাম জুয়েল বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ততার কারণে ভাইদের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় গত ছয়মাস ধরে রয়েল তাদের নিকটাত্মীয় ইয়াকুব ড্রাইভারের বাড়ির একটি রুম ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতেন। রাজনৈতিক কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জুয়েল দাবি করেছেন।
এদিকে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ দারা উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পদগুলোতে নিকটাত্মীয়দের ঠাঁই দিয়েছেন। এ নিয়ে পদ বঞ্চিতদের সঙ্গে কয়েক দফায় সংঘর্ষও হয়েছে। এরই জের ধরে দলীয় কর্মীদের হাতে রয়েল খুন হয়ে থাকতে পারেন। এছাড়া পারিবারিক বিরোধ বা নারীঘটিত কারণে হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে বলে এলাকার লোকজন বলাবলি করছেন।
পুঠিয়া সার্কেলের এএসপি আবু সায়েম এবং পুঠিয়া থানার ওসি আবু ওবাইদা খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
রামেক মর্গে ময়না তদন্ত শেষে রয়েলের লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল বিকালে পারিবারিক কবরস্থানে লাশের দাফন সম্পন্ন হয়।
গতকাল রাত আটটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি। পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবাইদা খান জানান, মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
