শচীন টেন্ডুলকার :এভারেস্ট আর উচ্চতা বাড়াইবে না

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৪
একজন মানুষ কতগুলি বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী হইবেন? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম একশত সেঞ্চুরি। টেস্ট ও ওয়ান ডে ক্রিকেটে সর্বাধিক রান, ওয়ান ডে-তে প্রথম দ্বিশতক, বিশ্বকাপে সর্বাধিক সেঞ্চুরি-হাফ সেঞ্চুরি ও রান। তিনি লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রিকেট খেলা শুরু করিবার পর সৃষ্টি করিয়াছেন একের পর এক শৃঙ্গ। অত:পর নিজের শৃঙ্গের উচ্চতা নিজেই নিরন্তর ছাড়িয়া গিয়াছেন ২৪ বত্সর ধরিয়া। অত:পর সিদ্ধান্ত হইয়াছে, তাহার সৃষ্ট অনতিক্রম্য উচ্চতার শৃঙ্গ এইবার স্থির হইবে। উচ্চতা আর বাড়িবে না। কিন্তু যেইখানে গিয়া তিনি স্থির করিতেছেন নিজের উচ্চতা, বিবিধ নিয়ম ও পরিস্থিতিগত বাস্তবতায় সম্ভবত আর কোনো ক্রিকেটার ছাড়াইতে পারিবে না সেই উচ্চতা। ২৪ বত্সর ধরিয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে প্রভাব প্রতিপত্তির সহিত খেলা চালাইয়া যাওয়া, টেস্ট ক্রিকেটে ২০০ ম্যাচে অংশ নেওয়াসহ যেই সকল রেকর্ড তাহার মুষ্ঠিবদ্ধ, তাহার খুব সামান্য অংশও সম্ভবত কাহারও পক্ষে সম্ভব হইবে না তাহার মতোই যুগপত্ পরিমিত ও আগ্রাসী ব্যাটিং করিয়া রেকর্ডের এই বলগুলিকে সীমানার বাহিরে পাঠানো। তাহার সমসাময়িক অনেক ক্রিকেটারই প্রভূত প্রতিভা লইয়া শাসন করিয়াছেন ক্রিকেটকে। বোলারদের কথা এই লেখায় না হয় বাদ দেওয়া হউক, ব্যাটসম্যান হিসাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারাকে বিবেচনা করা হইত শচীনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। ক্রিকেট প্রতিভার ভার তাহাদের কাহার ওপর অধিক চাপিয়া আছে এমত বিতর্কে বেশির ভাগ সমালোচক আগাইয়া রাখিতেন লারাকে। তাহারও বিস্তর রেকর্ড রহিয়াছে। কিন্তু শচীন এই পরিমাণ রেকর্ড করিয়াছেন যে, তাহা ভাঙিবার ধার ও ভার ভাবিকালে আর কাহারও না থাকাই স্বাভাবিক। তাহার কারণ নূতন ক্রিকেট টি-টোয়েন্টির জোয়ার। প্রথম কথা হইল, ২৪ বত্সর নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা, ইনজুরিকে ন্যূনতম পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা এক কথায় আগামীতে অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, এত বত্সর ক্রিকেট খেলিলেও আগামীতে কি কাহারও পক্ষে ২০০ টেস্ট ম্যাচ খেলা সম্ভব? কেননা টি-টোয়েন্টির জোয়ারে ২৪ বত্সর ধরিয়া একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশকে ফি বত্সর ন্যূনতম ৮টি টেস্ট ম্যাচের সূচি অদূর ভবিষ্যতে খুব সহজ ব্যাপার হইবে না। এইগুলি রেকর্ডের অঙ্কের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু রেকর্ডের বাহিরে ক্রিকেট যে এত জনপ্রিয় ও মোহনীয় হইয়াছে, তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে শচীনের মতো খেলোয়াড়রা। উপমহাদেশ যে আজ ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করিতেছে, এইখাতের অর্থভাণ্ডার যে এইখানে ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিতেছে—তাহার নেপথ্যে যাহাদের অতি গভীর অবদান রহিয়াছে, তাহার অগ্রভাগে রহিয়াছেন শচীন টেন্ডুলকার। তাহার দৃষ্টিনন্দন ও মারকুটে ব্যাটিং, তাহার শরীরী পরিশীলিত ভাষা যেন নূতন এক ট্রেন্ড সৃষ্টি করে, যেমন ট্রেন্ড সৃষ্টি করিয়াছিলেন কপিল দেব, ইমরান খান, সাইদ আনোয়ার, ওয়াসিম আকরাম, সনত্ জয়সুরিয়া, অরবিন্দ ডি সিলভা প্রমুখ ভারতের ‘৮৩, পাকিস্তানের ‘৯২ এবং শ্রীলঙ্কার ‘৯৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে। ইহাদের ভিতরে শচীনেরটাই দীর্ঘসময় ধরে নিরন্তর প্রবহমান। অতি পরিমিত ও সুশৃঙ্খল জীবনাচরণের কারণেও তিনি এমন এক সমীহ অর্জন করিয়াছেন, যাহার নিউক্লিয়াসে ভক্তরা তাহার প্রতি শুধুই ভালোবাসা খুঁজিয়া পায়। তাহাকে যেন ভালো না বাসিয়া পারা যায় না। যদিও অনেক সময়ই ক্রিকেট হইয়া উঠিয়াছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের কেতনধারী, কিন্তু শচীনের ক্লাসিক ও মারকুটে ব্যাটিংশৈলীর ভক্ত হইয়াছে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। ডন ব্রাডম্যান, মার্টিন ক্রো, ব্রায়ান লারা, ওয়াসিম আকরাম, ইমরান প্রমুখ ক্রিকেটারেরও ভক্ত ছিল বিশ্বব্যাপী। সেখানে দেশপ্রেম-জাতীয়তাবাদের সহিত ক্রিকেটের সৌন্দর্যকে ভালোবাসার বিষয়টি মিলেমিশে একাকার হইয়া গিয়াছে। আগামী ১৪ নভেম্বর নিজের দেশের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০০তম টেস্ট খেলিয়া ক্রিকেটকে বিদায় জানাইবেন শচীন। একজন ক্রিকেটার নিজ দেশের-জাতীয়তাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে কীভাবে বৈশ্বিক হইয়া উঠেন, তাহার উদাহরণ শচীনের মতো খুব বেশি মিলিবে না। সকল কিছুরই শেষ থাকে, শচীনও সেই চিরন্তন সত্যের বাহিরে নহেন, সেই সত্যের মুখোমুখি হইবার দিন থামিয়া যাইবে টেন্ডুলকার নামের নান্দনিক এভারেস্টের উচ্চতাবৃদ্ধি। সকল প্রেক্ষিতে জগতে কে ইহার বাহিরে? শচীনের জন্য আমাদের শুভ বিদায় কামনা।