হয়রানি নয়, বিমান বন্দর হোক আন্তর্জাতিক ও গৌরবের

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০২
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমান বন্দরে যাবার ও অবতরণের সুযোগ হয়েছে, ইউরোপ আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়া বা কানাডার কথা আলাদা। আলাদা জাপান বা কোরিয়ার কথাও। কিন্তু অনেক ছোট ছোট দেশ ও তাদের বিমান বন্দর সৌন্দর্যে, সেবা পরায়ণতায়, আতিথ্যে আর নৈপুণ্যে বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছে। কিছুদিন আগে বিশ্বজরিপে পৃথিবীর শীর্ষতম এয়ারপোর্ট হয়েছিল সিঙ্গাপুর। একবার যদি তা যায় কোরিয়ার দখলে তো আরেকবার পায় হংকং। ইউরোপ আমেরিকার এয়ারপোর্টগুলোকে পেছনে ফেলে তাদের এই অগ্রযাত্রা বায়বীয় বা ফাঁপানো কিছু নয়। শীর্ষ দশে থাকতে পারুক আর না পারুক ঘরের পাশের ব্যাংকক বিমান বন্দরও দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, সারারাত সুবর্ণভূমি বিমান বন্দরে থাকার সুবাদে আমি এর রাতের সৌন্দর্য জমজমাট পরিবেশ আর চলমানতা দেখেছিলাম, হোটেল বুকিং থাকার পরও রাতের সুবর্ণভূমি দেখার জন্য এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত চষে বেড়িয়ে দেখি এই এয়ারপোর্টটি নিশাচর। আসলেই ঘুম নেই তার চোখে। খুব জোর দু’থেকে সোয়া দু’ঘন্টা। এ ছাড়া বাকি রাত মানুষ আসছে আর যাচ্ছে। গভীর রাতে জেগে থাকা সেবিকা, ইনফরমেশান কাউন্টারের রাত জাগা তরুণী, ট্রলি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো পরিচ্ছন্নতা কর্মী কিংবা সিকিউরিটি গার্ড সবাই দিনের মত তত্পর আর সজাগ। হংকং এয়ারপোর্টে পৌঁছেছিলাম কাক ডাকা ভোরে। মূলত কাকও জাগেনি তখনো। কর্মীদের তন্দ্রা জড়ানো চোখ বটে, তারপরও সেবা-যত্নের কার্পণ্য দেখিনি। সকালবেলার ট্যুর ঠিক হয়ে গেল ভোরের সূর্য দেখা দেয়ার আগে, যে কথা সেই কাজ। ঠিক সময়ে ঠিক মানুষ ঠিক জায়গায় এসে হাঁক দিয়ে নিয়ে গেল দিনের সফরে। সব যেন মন্ত্রমাফিক আর ছকে বাঁধা, এই দেশগুলো ভৌগলিক বা দূরত্বগত দিক থেকে আমাদের কাছাকাছি, এদের মন মনন মেধা বা শ্রম ক্ষমতা আমাদের চেয়ে উত্তম কিছু নয়, বরং কোন কোন দেশে ইংরেজি বলতে না পারা লিখতে না পারার ব্যাপারটাও ব্যাপক, বললেও বোঝা মুসকিল। উচ্চারণগত পদ্ধতি ও স্কুল থেকে ইংরেজি শেখার কারণে বাংলাদেশিদের সে জাতীয় কোন সমস্যায় পড়তে হয় না। আমাদের ইংরেজি পূর্ব পশ্চিম উভয় প্রান্তের মানুষের জন্যই সহজবোধ্য। এ সুবিধার পরও আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার বা বিমান বন্দরটিকে এখনো সার্বজনীন ও সেবাপ্রবণ করে তুলতে পারিনি, বিদেশিদের বেলায় তো বটেই নিজ দেশের মানুষের জন্যও আমরা ভয়ংকর বা উগ্র হয়ে পড়ি। ইমিগ্রেশনের দৌরাত্ম্য বা হয়রানিতে পড়া নড়াইলের আসমা বেগম ফের সে কথাই মনে করিয়ে দিলেন। কর্মজীবী এই নারী ওমানে কাজ করেন। আমাদের দেশের জন্য, অর্থনীতির জন্য যারা দিন রাত খেটে পরিশ্রম করে উপার্জন করে ফরেন রেমিট্যান্স পাঠায় আসমা তাদেরই একজন। তিনি বৈধ পাসপোর্ট, বৈধ ভিসায় দেশে আসা যাওয়া করেন। তার মত পরিশ্রমী নাগরিককে অযথা হয়রানি বা ঝামেলায় ফেলার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নেই। বরং তাকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়াই যৌক্তিক। অথচ আসমাকে তুই তোকারি করে চূড়ান্ত অপমান করে তবেই এয়ারপোর্ট ছাড়তে দেয়া হয়েছে। তার অপরাধ সে ভিআইপি নয়। তার কোন দল নেই, সংগঠন নেই, স্তাবক নেই। নেই লবিং বা প্রভাবশালী আত্মীয়। বড় অদ্ভুত দেশ আমাদের কর্মহীন, কাজে অনুত্সাহী কেবল কথা আর বক্তৃতা বা ধান্দাবাজিতে ব্যস্তদের আমরা ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দেই। এমনও দেখেছি লাইন থেকে নাম ডেকে সামনে নিয়ে যাওয়া হয়, কাউকে কাউকে লাইনেও দাঁড়াতে হয় না। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশের বিমান বন্দরে এ জাতীয় অসভ্য ভিআইপি খাতির বা অভব্য ব্যবস্থা দেখিনি। আমরা নিশিদিন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা শুনছি। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে আজ প্রযুক্তির জয় জয়কার। খুলে যাওয়া বিশ্বায়নের জানালায় আমরা দেখছি বিশ্বভূবন। কোন কিছু অদৃশ্য বা গোপন নেই। পাশের দেশগুলোর বিমান বন্দর অতিথি সেবা শনৈ শনৈ উন্নতিও চাক্ষুস। এই বাস্তবতার পরও ওমান প্রবাসী কর্মজীবী আসমাকে অপমান মূলত আমাদের সেবা ও যত্নের অভাব। অভাব নজরদারীর। অভাব প্রশাসনিক শৃঙ্খলার। শাহজালাল (রা:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যতীত বিদেশ থেকে বাংলাদেশে ঢোকা বা বেরুনোরও আসলে আর কোন উড়াল পথ নেই, সে জন্যে এটি আমাদের জাতীয় মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক। আসমার মত কেউ যেন আর হয়রানির শিকার না হয়। আমাদের পাসপোর্টে মহামান্য রাষ্ট্রপতির একটি অনুরোধ দেয়া থাকে। তিনি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জান মালের নিরাপত্তা ও দেখ ভালের জন্য দেশ-বিদেশের আকাশ কর্তৃপক্ষকে যে অনুরোধ জানিয়েছেন তার বাস্তবায়ন যদি দেশেই না হয় অন্যরা শুনবে কোন দুঃখে? ডিজিটাল দেশ ও আধুনিকায়নের স্বার্থে প্রতিযোগিতার লক্ষ্যে বিমান বন্দরে যাত্রীদের সেবা নিশ্চিত ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। তবেই আমরা এগুতে পারবো। (সিডনি থেকে)