চলমান নানা সংকটের সাথে যুক্ত হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, তৈরি পোশাক শিল্পের সংকটসহ সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো নাজুক পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, রিজার্ভ ১৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁলেও তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কিছু নেই। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের কোন উন্নতি হয়নি। দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো কমে গেছে প্রকৃত বেসরকারি বিনিয়োগ। আর্থিক খাতের সংস্কারে অগ্রগতি হলেও এর পরিমাণ অনেক শ্লথ। তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান যা অবস্থা তাতে ইউরোপের বাজারেও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) হারানোর আশংকা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক সংকট বাধাগ্রস্ত করছে দেশের অর্থনীতিকে।
গতকাল বুধবার ঢাকাস্থ বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে সর্বশেষ ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রতিবেদন’ প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির বিস্তারিত তুলে ধরেন ঢাকাস্থ কার্যালয়ের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
সূচনা বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জাট বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে নির্বাচনের বছরে বিশ্বের অনেক দেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা যায়, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তৈরি পোশাক শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এ খাত বর্তমানে সংকটে রয়েছে। সামপ্রতিক দুর্ঘটনাগুলো বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে ইউরোপের বাজারেও অগ্রধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) হারাতে পারে বাংলাদেশ।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাহিদ হোসেন তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা বাতিল হলেও এর প্রভাব তৈরি পোশাক খাতে পড়েনি। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপি বাতিল করলে এ খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সে ক্ষেত্রে দেশের রপ্তানি ৪ দশমকি ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ১ শতাংশ কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার, কারখানার মালিকসহ বিদেশি ক্রেতার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। এছাড়াও গার্মেন্ট খাতের উন্নয়নে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা ৫ বছরের জন্য যে উদ্যোগ ঘোষণা করেছে তাতে সরকারি সহযোগিতা করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের যৌথ কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
জাহিদ হোসেন বলেন, শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধ করতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি তিন হাজার থেকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ৮ হাজার ১০০ টাকা যে প্রস্তাব তার মাঝামাঝি থাকতে হবে।
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তবে আন্তর্জাতিক কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা নেই। নির্বাচনের চাপে অর্থবছরের রাজস্ব নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। আর্থিক খাতে সুশাসন একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। ইতিমধ্যে রেমিট্যান্স খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৩ সালে ব্যক্তিখাতে প্রকৃত বিনিয়োগ কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে সঞ্চয় বেড়েছে। ফলে বেড়েছে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য।
তিনি বলেন, মুদ্রানীতির সতর্কতার কারণে ২০১২-১৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্য মূল্য কমেনি। গত মাসেও মূল্যস্ফীতি ছিলো ৭.১ শতাংশ।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় প্রবৃদ্ধি কমবে
এদিকে বিবিসি বাংলা জানায়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। বিদায়ী ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ৬ দশমকি শূন্য ২ শতাংশ হলেও এ অর্থ বছর সরকারের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলছে, শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াকে তারা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন- যা ঘটছে প্রধানত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী নির্বাচনকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তার কারণে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, নির্বাচন কীভাবে হবে, নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। ফলে, বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের অনিশ্চয়তায় রয়েছে। বিনিয়োগ উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে; কিন্তু এবছরও বিনিয়োগ স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকে হয়তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার জন্য অপেক্ষা করছেন। বিনিয়োগ না করে দেখছেন কী হয়। এর কারণে শিল্প ও সেবা খাতে উত্পাদন কমে যেতে পারে। তবে ৬% প্রবৃদ্ধি করার ক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। হরতাল, সহিংসতা কোন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এগুলো যদি কেটে যায়, যদি শন্তিপূর্ণ ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় তাহলে অতীতের অভিজ্ঞতা হতে বলা যায়- প্রবৃদ্ধির শক্তি ফিরে আসবে। যদিও সরকার বলছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হবে; কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে ৬ শতাংশের কাছকাছি থাকবে। জাহিদ হোসেন আরো জানান, শুধু বিশ্বব্যাংকই নয়, অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে; কিন্তু তফাত্ হলো সংখ্যা নিয়ে। সকলেই বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতিই প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার মূল কারণ।
