সাভারের বহুতল ভবন রানা প্লাজা ধসের ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে বৃহস্পতিবার। স্মরণকালের ভয়াবহ এ ধ্বংসযজ্ঞে ১১ শতাধিক নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছে শতশত শ্রমিক। আহত এ শ্রমিকদের কেউ পা হারিয়ে, কেউ হাত হারিয়ে, কেউবা চিরতরে চলাচলের অক্ষম হয়ে বেঁচে আছেন। যে মানুষটি আয় করে পরিবারের সদস্যদের মুখে আহার তুলে দিতেন সে আজ এ ধ্বংস যজ্ঞের কারণে নিজেই অন্যের বোঝা হয়ে আছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার স্বামী পরিত্যক্তা শিল্পী (২৪) ৩ বছরের এক সন্তান নিয়ে সাভারে আসেন কয়েক বছর পূর্বে। রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার কয়েক মাস পূর্বে নিউ ওয়েভ স্টাইল গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন। ঘটনার দিন কাজ করার সময় যখন বহুতল ভবনটি ভেঙ্গে পড়তে থাকে সবার সাথে শিল্পীও বাঁচার তাগিদে প্রাণপণ ছুটেন প্রাণ রক্ষার জন্য। প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি মারাত্মক ভাবে আহত হন। তার দুইটি পা ভেঙ্গে যায়। দীর্ঘদিন চিকিত্সার পরও বর্তমানে স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করতে কষ্ট হয় তার। বর্তমানে সাভার পৌরসভাধীন তালবাগ মহল্লার পাশে একটি বস্তিতে ছোট বাচ্চা নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তার সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, একটি বায়ার কোম্পানি থেকে দুই কিস্তিতে বিকাশের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা তিনি পেয়েছেন। এছাড়া কোন অনুদান অদ্যাবধি তিনি পাননি।
ধামরাই শ্রীরামপুরের সুজনা পিঠে ও কোমড়ে আঘাত পেয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে থাকলেও কর্ম ক্ষমতা হারিয়েছেন। স্বামী-সন্তান নিয়ে সাভারের আড়াপাড়ায় বসবাস করছেন তিনি। সুজনার স্বামী আক্ষেপ করে বলেন, দুই জনের রোজগারে সংসার কোন মতে চলত। বর্তমানে সুজনা অসুস্থ হওয়ায় তার একার উপার্জনে কোন ভাবেই পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে পারছেন না। বিকাশের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা ব্যতীত আর কোন সাহায্য সহযোগিতা সুজনা পাননি বলে তিনি জানান।
খাদেম ২২ বছরের এক টগবগে যুবক। পিতা মাতা ভাই বোনের মুখে অন্ন যোগানোর জন্য ২ বছর পূর্বে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর উপজেলার গৌরীচর গ্রাম থেকে সাভারে ছুটে আসেন। চাকরি নেন রানা প্লাজার নিউ ওয়েভ বটমস নামক পোশাক কারখানায়; কিন্তু ভাগ্যের কি নিমর্ম পরিহাস। যে খাদেম পিতা মাতা ভাই বানের খেদমতের জন্য নিজ এলাকা ছেড়ে আসেন আজ রানা প্লাজার করুণ ঘটনায় সে-ই অন্যের করুণার পাত্র।
দুর্ঘটনায় কোমড়ের তিনটি হাড় ভেঙে আজ তিনি পঙ্গু। দীর্ঘদিন রাজধানীর গ্রীন রোড়ের হেলথ এন্ড হোপ নামক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিত্সাধীন থেকে জীবন ফিরে পেলেও আজ সে অন্যের উপর নির্ভরশীল। বৃদ্ধ পিতা-মাতার বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মোবাইল ফোনে তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, তিনি গ্রামের বাড়িতে আছেন। তাকে আজ রড দিয়ে তৈরি খাঁচায় ভর করে হাঁটতে হয়। একটি বায়ার কোম্পানির ৩০ হাজার টাকা ব্যতীত তিনি কোন প্রকার সহযোগিতা পান নি।
এ রকম দুর্বিষহ জীবন শুধু শিল্পী, খাদেম ও সুজনারই নয়, শতশত আহত শ্রমিকের। ঘটনার পর অনেকেই সহযোগিতায় এগিয়ে গেলেও এখন আর তাদের খবর কেউ রাখে না। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই এখন নিদারুণ কষ্টে, অসহ্য যন্ত্রণায় দিনযাপন করছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তাহবিল থেকে অঙ্গহীন পাখী বেগম, রিক্তা, সোনিয়া, আন্না, লাবলী, মরিয়ম, শাহীনুর, আরতী ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা অর্থ সহযোগিতা পেলেও অনেক শ্রমিকই পূর্ন চিকিত্সা পাননি। ফাতেমা আক্তারসহ শতশত শ্রমিক রানা প্লাজা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর স্থানীয় এনাম মোডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিল দীর্ঘ দিন; কিন্তু অনেকের মেরুদণ্ড বিকল হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকেই পরবর্তীতে স্থানান্তর করা হয় সিআরপিতে।
গামেন্টর্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক কে এম মিন্টু অভিযোগ করেন, আহত অনেক শ্রমিকই উপযুক্ত চিকিত্সা সেবা ও ক্ষতিপূরণ অদ্যাবধি পাননি। তিনি আরো অভিযোগ করেন, নিখোঁজদের পরিবার-পরিজনও আইন অনুসারে বেতন, ক্ষতিপূরণ, গ্র্যাচুইটি সুবিধা এবং প্রতিশ্রুত অনুদান— কিছুই পাননি। এসব নিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
