শঙ্কাযুক্ত অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ শেষমেষ প্রশাসনের কেন্দ্র সচিবালয়ে স্পর্শ করতে পারে—এমন আশঙ্কা সরকারের। আজ সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনাও কম নেই সচিবালয়ে। এ সমাবেশকে ঘিরে দু’টি প্রধান রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা কী হয় তা নিয়ে সন্দিহান সরকার। তাই আগে-ভাগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে সরকারি কর্মচারীদের সতর্ক করাসহ নিরাপত্তা বাহিনীর মহড়াও চলে গতকাল। বস্তুত এমন মহড়া অতীতে কখনোই দেখা যায়নি। সরকারি কর্মচারীদের কথায় এর কোন উত্তর নেই। তবে তারা বলছেন কখন যে কী হয় কে জানে?
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের এডিসি মশিউর রহমানের নেতৃত্বে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ওই মহড়া দেয়। এছাড়া অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ও পোশাকধারী পুলিশকেও মহড়ায় অংশ নিতে দেখা যায়। অন্যদিনের তুলনায় গতকাল থেকে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। প্রবেশ পাস দেয়া ও তল্লাশির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯৬ সালে তত্কালীন বিএনপি সরকারের পতনের জন্য আওয়ামী লীগের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীরাও আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। প্রেসক্লাবের সামনে বসানো হয় ‘জনতার মঞ্চ”। এখানেই যোগ দেন সচিবালয় থেকে বেরিয়ে আসা সচিব থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারীরা। ইতিমধ্যে বিএনপির একাধিক সমাবেশ থেকে প্রয়োজনে এবার অনুরূপ জনতার মঞ্চ করার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে সচিবালয় প্রশাসনে ক্ষোভ অসন্তোষ রয়েছে। এটিকে কাজে লাগিয়ে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সচিবালয়ে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে কয়েকজন সচিবের কক্ষে বিএনটি পন্থি সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের উঠা-বসার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরকম প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান সকল সচিবকে ডেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের তত্পরতায় সচিবালয় যাতে সংক্রমিত না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেন। তিনি এও বলেন, যদি কেউ শৃংখলা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয় তবে সেক্ষেত্রে যেন তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর যদি কোন কর্তৃপক্ষ এরূপ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়-তবে সেই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের এরকম নির্দেশনার একদিন পর গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ছিল বিএনপি পন্থি শিক্ষক-কর্মচারীদের সমাবেশ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণভাবেই তাই সচিবালয় ঘিরে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা। একই সময় গতকাল সচিবালয়ে গিয়েছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া। সে কারণে সেনা নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল চোখে পড়ার মতো। এদিকে গতকালের মহড়া প্রসঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আগাম মহড়া দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে দলবদ্ধভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন ভবনের সামনে মহড়া দেয়ার সময় সচিবালয়ে কিছুটা আতঙ্ক দেখা যায়। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এ ধরনের মহড়ায় স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব পড়বে। এতে অনেকেই বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। একে ইতিবাচকভাবে দেখার চেয়ে নেতিবাচকভাবেই দেখছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমন মনোভাবের কথাই জানা গেছে। তবে অন্য মতালবম্বীদের মতে আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। সরকার যে ধরনের কৌশলে তা করতে চান করতে পারেন। এ নিয়ে বেশি ভাববার কিছু নেই। বরং এটি করা না হলে একবার বিশৃংখলা দেখা দিলে তা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ প্রসঙ্গে মহড়ায় নেতৃত্বদানকারী পুলিশ কর্মকর্তা (এডিসি) মশিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর। কোনো ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির যেন উদ্ভব না হয়, সেজন্যই আগাম এই সতর্কতা।
সচিবালয়ে মহড়ায় অংশ নেয়া একাধিক পুলিশ সদস্যরা জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে মিছিল-মিটিং করতে পারে- এমন খবরে এই মহড়া দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু সাংবাদিকদের বলেন, সচিবালয়ে নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। সচিবালয়ে শৃংখলা রক্ষার জন্য চলমান কর্মসূচি পরিচালনা করছেন তারা।
