জীবনের জলসা ঘরে

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৮
ফোন এল, আব্বাসী ভাই, মান্না দে খুবই অসুস্থ, তাকে নিয়ে এক্ষুণি কিছু লিখুন এবং পাঠিয়ে দিন। বললাম, গান শুনেছি, দেখা হয়নি, কি লিখব? লিখতে পারি মুগ্ধতার কথা। তার বই ‘জীবনের জলসা ঘরে’ আদ্যপান্ত মন দিয়ে পড়লাম। ২-৩ দিন পর খবর এল, লিখতে হবে না। তিনি এ যাত্রা বেঁচে গেছেন। অর্থ মৃত্যু এলে শিল্পীকে স্মরণ—আগে নয়। সংগীত যার জীবনের ধ্যান, জ্ঞান, ঈশ্বর ও প্রাণবায়ু, তিনিই মান্না দে, দীর্ঘদিন রোগ শায়িত। গাওয়া গানগুলো যখন বাজতে থাকে ভয় জাগে, এই বুঝি তার প্রাণবায়ু নির্গত হবে। বয়স তো কম হল না, নব্বই। দাপটের সঙ্গে সুরের আবাহনে বয়ে চলেছে জীবন, বৈচিত্র্যের সুরে তার গাওয়া গানগুলো আমাদের সামনে খেলা করতে থাকে। যে যত শুনেছেন তার তত বেশি মনে পড়বে। যারা আত্মজীবনী পড়েছি তারা মিলিয়ে নিতে পারবেন তার গানের সঙ্গে জীবনের সাযুজ্য। তার গানগুলো শোনার সুযোগ যখন এল তার বয়স হয়ে গেছে। যৌবনের কণ্ঠ ও পরিবেশনা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। হেমন্ত এ নিয়ে কোন অনুযোগ করতেন না, বলতেন, আমার কণ্ঠের যে ঘাটতি তা পূরণ করে দেবে বাণীর গভীরতা। মান্না তা মানতেন না। যন্ত্রানুসঙ্গীদের ধমক দিতেন, তাতে আগের স্ফূর্তি ফিরে আসবে কি করে? তার গ্রন্থে যে গানগুলোর প্রথম লাইন লেখা আছে সেগুলো পড়লেও মন ভাল হয়ে যায়। অনুলিখন ড. গৌতম রায়ের ভালই, তবে দুধের স্বাদ ঘোলে উপস্থিত। মান্না দে’র প্রিয় বিকাশ রায়, যিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় অভিনেতা, বলা হত ‘বিকাশীয়’ বাচনভঙ্গি। কলকাতায় তার বাসায় একদিন গিয়ে উপস্থিত, তখন মৃত্যুপথ যাত্রী। তার ড্রইংরুমে মান্না দে’র সঙ্গে তার ছবি। ছবিতে মুখরিত বইটি, সহাস্য মহম্মদ রফি ও কৃষ্ণচন্দ্র দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মুখে সিগারেট জ্বালিয়ে দিচ্ছেন মান্না দে, যে সিগারেট মৃত্যু টেনে এনেছে হেমন্তের। তালাত মাহমুদ, মুকেশ, লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফির ছবি এক সঙ্গে। তিনি যাদের ভালবাসতেন, তাদের কথা অনেকবার এই বইয়ের মধ্যে, যাদের মধ্যে ওস্তাদ দবির খান, ওস্তাদ আমন আলী খান, শচীন দেব বর্মণ, আশা ভোঁসলে, ওস্তাদ গোলাম মোস্তাফা খান ও উত্তম কুমার। মান্না দে’র গান শুনলেই উত্তম কুমার কোত্থেকে উপস্থিত, একেবারে হারমোনিয়ামের সামনে। ব্যস্ত নায়ক, তার সামনে যেন শিশুটি। মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার ও মান্না দে এক সঙ্গে অনেক গান করেছেন। সে জলসায় কখনও যেতে পারিনি, সে দুঃখ রয়ে গেল। ভাল লাগছে ভাবতে মান্না দে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আবার তিনি হারমোনিয়ামের সামনে। তার জন্যে একশ’ পঞ্চাশ বছরের দরখাস্ত করলাম। অথচ এরপরেও মান্না দে শত শত বছর বেঁচে থাকবেন।