প্রকৃত শিক্ষা ও স্বাধীনতায় উদ্ভাসিত হোক নারী

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০০
দুরন্ত শৈশবের কোনো গল্প আমার জানা নেই। শুধু মনে আছে যখন আশেপাশের বাসার বাচ্চাগুলো দল বেঁধে খেলতো আমি তখন বারান্দায় টুলের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখতাম। কত রকম খেলা খেলতো আমার বয়সী বাচ্চাগুলো। ছোঁয়াছুঁয়ি, বউছি, কানামাছি, জলে কুমির ডাঙায় বাঘ, ওপেন্টিবায়োস্কোপ আরো কত কী। খেলা দেখতে দেখতে কখন যে চোখের কোণে গরম জল বেয়ে পড়তো টেরও পেতাম না। খেলতে গিয়ে ব্যথা পাবো, অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া-মারামারি হবে আর নয়তো পচা কথা শিখবো। তাই বাবা কখনো বাইরে খেলতে দিতেন না। যখন ভাবছিলাম বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা নাকি মানবিকে পড়বো তখনই বাবা সিদ্ধান্ত দিলেন ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পড়ার। আমার ভালো লাগতো বিজ্ঞান আর ইতিহাস। কিন্তু সেই ভালো লাগাটা অতৃপ্তির পাথরে চেপে বাবার নির্দেশ মেনে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক কমার্সে পড়লাম। উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিতে চাইলাম অনেক জায়গায়। ইচ্ছে থাকলেও ঢাকার বাইরে পরীক্ষা দেওয়া হলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় পছন্দের তালিকায় নিজের হাতে বাবার পছন্দের পাঁচটি বিষয়ের নাম লিখলাম যাতে আমার নিজের কোনো সায় ছিল না। বাবার পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হয়ে ভালোভাবে পাস করে বাবাকে গর্বিত করেছি। কিন্তু নিজের ভেতর কোনো আনন্দ বা গর্ব অনুভূত হয়নি। সান্ত্বনা একটাই বাবা খুশি হয়েছেন। এইবার নিশ্চয় বাবা আমার পছন্দমতো আমাকে কাজ করতে দেবেন। কিন্তু এবারেও বাধ সাধলেন বাবা। কোনো চাকরিই তাঁর মনঃপুত হচ্ছে না। ব্যাংকের ৯টা-৫টা অফিস পছন্দ নয়, প্রাইভেট অফিসের বড় কর্তাদের পছন্দ নয়, সংবাদপত্রে কাজ পছন্দ নয়, শেষমেষ শিক্ষকের চাকরি পছন্দ হলো। কলেজের শিক্ষিকা হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করলাম। বাবার পছন্দের কাছে হার মেনে বিয়েতে রাজি হতে হলো। বিয়ের পর চাকরি করার দরকার নেই এই অজুহাতে চাকরি ছেড়ে দিতে স্বামীর হুকুম। তখন বাবা শুধু একটা উপদেশ দিলেন— “স্বামী আর শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করো তাতে সংসার সুখের হবে। পড়াশোনা করেছিস বাচ্চা মানুষ করবি।” শাশুড়ির ইচ্ছায় এক বছর না হতেই বাচ্চার মা হতে হলো। বাচ্চার নামও রাখা হলো শাশুড়ির পছন্দে। শুনতে পাই আমায় নিয়ে অনেকেই ঈর্ষা করে। এমন সুখের সংসার আর কয়জনের ভাগ্যে জোটে! কিন্তু আমার সুখটা কোথায় তা কি আমি নিজেও ভালো করে জানি? সবসময় অন্যের ইচ্ছেয় জীবন সাজিয়ে এখন মনে হচ্ছে এ জীবন আমার নয়। শিক্ষা, সম্মান, বিত্ত আর সংসার পেয়েও কেন মনের কোণে কষ্ট লুকিয়ে রাখা? উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও কেন চিত্কার করে নিজের ইচ্ছের কথা জানানো হয় না? নারীর নিজস্ব সত্তার বিকাশ কেন ঘটে না? সামাজিক চোখে এখানে নারীর স্বাধীনতার এতটুকু বিচ্যুতি হয়নি কিন্তু নারী হিসেবে তার একান্ত ইচ্ছেগুলোর কি অপমৃত্যু ঘটেনি? বাবার অন্ধ ভালোবাসা আর বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া স্বামীর অধিকার নারীকে পটের বিবি করে রাখতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে রোকেয়ার উক্তি স্মরণীয়: “বাস্তবিকই অধিক যত্নে অনেক বস্তু নষ্ট হয়, যে কাপড় বহু যত্নে বন্ধ করিয়া রাখা যায় তাহা উঁই এর ভোগ্য হয়।” আজকাল নারীর অগ্রগতির কথা জোর গলায় বলা হলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা আজো সেই পুরনো বৃত্তেই সীমাবদ্ধ। মুক্তবুদ্ধি আর উন্নত মানসিকতার চর্চা না থাকায় নারী পুরুষতান্ত্রিকতার যাঁতাকলে অবিরাম পিষ্ট হচ্ছে। এছাড়া পরিবার ও সমাজের ভ্রান্ত সংস্কারে নারীকে আটকে রাখা হচ্ছে। শুধু যে ইচ্ছেগুলোকে দমিয়ে রাখা হয়েছে তা নয়, নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও দেওয়ার ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে সম্পর্কের দোহাই দিয়ে। নারীশিক্ষার প্রচার ও প্রসার দুটোই বেড়েছে কিন্তু শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষা নারীকে উগ্র, অশ্লীল, উদ্ধত হতে শেখায় না বরং প্রকৃত শিক্ষা নারীকে মানসিকভাবে উন্নত করে, নারীর চিন্তা-চেতনার বদ্ধ দুয়ার খুলে দেয়। তখনই কেবল নারী সমাজ কাঠামো ও পারিবারিক মূল্যবোধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে যখন সে তার শিক্ষার সত্যিকারের চর্চার সুযোগ পাবে। আর এজন্য প্রয়োজন নারীর সঙ্গে পরিবারের সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক। পরিবারকে বুঝতে হবে, নারী একটা আলাদা ব্যক্তিসত্তা। সেই সত্তার নিজস্ব চিন্তাধারা রয়েছে, রয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতাও। নারীকে আমরা ভারবাহী জীব হিসেবে দেখতে চাই না, চাই পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের ভূমিকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়