তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যে কয়টি দেশ সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান তার অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ। অর্থনীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রভৃতি সকল দিক থেকেই দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত যে দেশটিকে তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’-এর সঙ্গে তুলনা করে ছিলেন তিনিও আজ এই দেশটিতে আসলে হয়ত চারপাশের উন্নয়নযজ্ঞ দেখলে বিস্মিত হবেন।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের সহজ-সরল বাঙালি সমাজে কিছু অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যে ভাইরাসগুলোর প্রসারই যথেষ্ট আমাদের এই সোনার বাংলার গৌরবগুলোকে আড়াল করতে। তেমনই একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্ষণ। পত্রিকা খুললেই প্রথমপাতা, শেষপাতা নয়তো অন্য কোনো পাতার একটি সাধারণ খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্ষণ।
সোনাগাজীর নুসরাত হত্যার ক্ষত না শুকাতেই সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হন শাহিনুর আক্তার তানিয়া নামের একজন নার্স। ধর্ষণের পরেও সেই নরপিশাচগুলোর পশুত্ব নিবৃত্ত হয়নি। শেষপর্যন্ত তাকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়। একজন মানুষের সম্ভ্রম জীবনের চেয়েও মুখ্য হয়ে গেছিল তাদের পশুত্ব। অথচ একটু আগেও সেই তানিয়া মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্যই সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তানিয়ার জীবন তাদের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। অবশ্য তিনি সেই অমানবিক নির্যাতনের পর বেঁচে থাকলেও বারবার মানসিকভাবে হত্যার শিকার হতেন; না হলে আত্মহত্যা করতেন। শুধু তানিয়াই নয়, এরকম শত-সহস্র নারী প্রতিনিয়তই বলি হচ্ছে মানুষরূপী পশুগুলোর বিকৃত প্রবৃত্তির। এমন কি একটি পাঁচবছরের শিশুও নিরাপদ নয় তাদের কাছে।
আরো হতাশার বিষয় হচ্ছে, আমরা এই জঘন্যতম অপরাধের সুবিচার খুব কমই নিশ্চিত করতে পারি। বিচার কার্যের দীর্ঘসূত্রিতা এক্ষেত্রে বড় বাধা। আজ পর্যন্ত তনু হত্যার বিচার সম্পন্ন করা যায়নি। চাইলে যে আমরা সুবিচার করতে পারি না তা নয়। এদিক থেকে একটি সফল বিচারের দৃষ্টান্ত পুলিশ হেফাজতে দিনাজপুরের ইয়াসমিন ধর্ষণ হত্যার বিচার। তবে সেটাও সহজে হয়নি। অনেক কালো অধ্যায় পেরিয়ে প্রায় নয় বছর পর অপরাধীর বিচার হয়।
আমাদের সমাজ ধর্ষণের যে মহামারীরূপ পরিগ্রহ করছে তা অচিরেই উচ্ছেদ করা না গেলে অন্যান্য উন্নয়নগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কেবল শাস্তির বিধান করে এ সমস্যা রোখা যাবে না। মানুষের মাঝে মনুষত্ব তৈরির জন্য সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের দিকে মন দিতে হবে। পারিবারিক অনুশাসনের দিকে জোর দিতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার ঘটাতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা অন্যের মানবাধিকার তথা জীবনকে বিপন্ন করে তাদের কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। প্রশাসনের সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। শাস্তির ভয়ে আইনকে মেনে চলা নয়; বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সর্বোপরি প্রত্যেকের বিবেক নামক অন্তর্নিহিত আদালতকে ক্রিয়াশীল করতে হবে।
nলেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
