পানির অভাবে বন্ধের উপক্রম রান্না খাওয়া

আপডেট : ১৯ মে ২০১৯, ২১:৫৯

ভোর রাতে সেহরি করতে ঘুম থেকে উঠে পানি পান না রাজধানীর আদাবর, জুরাইন মাদ্রাসা রোড, পূর্ব দোলাইরপাড়, দনিয়াবাজার এলাকার মানুষ। শুধু তাই নয়, সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে অন্যসব এলাকার মানুষ যখন ঘুমাতে যান ঠিক তখন এসব এলাকার মানুষ বাড়ি থেকে বের হন মগ-বালতি নিয়ে। ওয়াসার পাম্পের রিজার্ভ ট্যাংক থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তারা পানি সংগ্রহ করেন। সেই পানি দিয়েই চলে সারাদিনের খাওয়া, গোসল, ওযুসহ সকল দৈনন্দিন কাজ।

এই এলাকাগুলোর পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির অভাবে রান্না, গোসল, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে একদিকে প্রচণ্ড গরমে নাগরিক জীবনে হাঁসফাঁস, অন্যদিকে রোজা। তার ওপর নেই পানি। ফলে চরম ভোগান্তিতে আছেন রাজধানীবাসী। নিরাপদ পানির দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন তারা। জুরাইন, কদমতলী ও শনির আখড়া, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার পানি সংকটের ভুক্তভোগী নাগরিকরা পদযাত্রা করেছে। নগরজুড়ে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চললেও সেবা সংস্থা ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করছে না বরং তারা দাবি করছে, ‘ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় এবং বিশুদ্ধ। পানি ফুটিয়ে খেতে হয় না।’ ওয়াসার এমন বক্তব্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

 পূর্ব রামপুরা হাইস্কুল এলাকার চিত্র একটু ভিন্ন। সেখানে বাসিন্দারা ওয়াসার পানি পায় ঠিকই। কিন্তু তা ব্যবহার অযোগ্য। ওয়াসার লাইনে হলুদ রঙের পানি আসে। পানিতে দুর্গন্ধ। মুখে নেওয়া যায় না। এমনকি ফুটিয়েও পান করা যায় না। ওই এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম জানান, তারা গত দুই বছর ধরেই ওয়াসার লাইনের পানি ফুটিয়েও পান করতে পারছেন না। ফলে পানির জার কিনে ফুটিয়ে তা পান করছেন। ওই এলাকার অনেক মানুষই বাড়তি টাকা খরচ করে জারের পানি কিনে ফুটিয়ে পান করছেন। তিনি জানান, লাইনের পানি সংগ্রহ করে তা বালতিতে রাখার ছয় সাত ঘণ্টা পর পানিভর্তি বালতির তলায় ওই ময়লা পরিষ্কার বুঝা যায়। ফুটানোর পরও পানিতে গন্ধ থাকে। অন্যদিকে সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অবধি নানা কায়দা কৌশলে পানির জন্য নিরন্তর চেষ্টা চলছে উত্তর কাফরুল এলাকায়। ২৪ ঘণ্টায় মধ্যরাতে একবার দেখা মেলে পানির। কখনো কখনো ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে এত বেশি ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে যে, তা পান করা তো দূরের কথা, ধোয়ামোছার কাজেও ব্যবহার করা যায় না। তারপরও মানুষ বাধ্য হয়ে এ ময়লা পানিই ব্যবহার করেন। এসব পানি ব্যবহার করে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, জন্ডিস, জ্বর, সর্দি, কাশিসহ নানা পানিবাহিত রোগে ভুগছে মানুষ। আইসিডিডিআরবিসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।

পানির সংকটকে কাজে লাগিয়ে ওয়াসার এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী রমরমা ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ আছে। যেসব এলাকায় ওয়াসার লাইন অকেজো হয়ে পড়ে বা সংস্কারের কাজ চলে সেসব জায়গায় ওয়াসার গাড়িতে পানি দেওয়ার কথা। তবে এক্ষেত্রে এক গাড়ি পানির দাম ৫০০ টাকা হলেও এর জন্য কোনো কোনো সময় নাগরিকদের গুণতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২ শ টাকা পর্যন্ত। অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে ওয়াসার কর্মচারীদের পকেটে। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা ওয়াসাকে দুই ভাগে ভাগ করবার প্রস্তাবও এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াসাকে দুই ভাগ করলেই সেবার মান বাড়ানো যাবে না। সেবার মান বাড়াতে হলে দক্ষ জনবল, কার্যকরী পরিকল্পনা দরকার। নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, ওয়াসার ৮৫ থেকে ৮৭ ভাগ নির্ভরশীলতা ভূগর্ভস্থ পানির উপর। শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানি নিচের দিকে যাচ্ছে। ভূউপরিস্থ পানির উত্সগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। পুকুর, নদী ও নিচু জমিগুলো ভরাট হয়ে গেছে। টেকসইভাবে পানি সরবরাহ করতে হলে, ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঢাকার ভিতরে ভূউপরিস্থ উত্সগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে।

পানি সংকটের বিষয়ে ওয়াসার এমডি তাকসিন এ খান বলেন, আমরা পানির লাইনের সমস্ত নেটওয়ার্ক পরিবর্তন করছি। যেখান থেকে অভিযোগ আসে সেখানে আমরা শর্ট টাইমে পাইপ পরিবর্তন করে দিচ্ছি। তবে পুরো নেটওয়ার্ক পরিবর্তন করলে তখন আর কোনো সমস্যা থাকবে না।