নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ফ্রেন্ডশিপের যাত্রা শুরু, তাদের প্রথম ভাসমান হাসপাতালটি কাজ শুরু করে ২০০১ সালে। যতটা না সহজে আজকে বলে ফেলা যাচ্ছে, তারচেয়ে হাজার গুণ কঠিন ছিল সেই সময়ে হাসপাতালটি নিয়ে কাজ করা। রুনা খান অনেকের কাছেই তার এই পরিকল্পনা নিয়ে যেতেন, সবাই বিষয়টিকে অতটা আমলে নিতেন না। তবুও তিনি হার না মেনে এগিয়ে গেছেন, আর এ পর্যায়ে এসে প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছে থাকলে, আর সে অনুযায়ী চেষ্টা করে গেলে সবই সম্ভব। ইউনিলিভার ব্র্যান্ড লাইফবয়ের সহযোগিতায় তার এই প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখে। তাদের ভাসমান হাসপাতালগুলো দুর্গম এলাকায় স্বাস্থসেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ বহরে আরও দুটো জাহাজ যোগ হয়েছে। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এ পর্যন্ত চার লাখ প্রান্তিক অসহায় মানুষকে চিকিত্সা সেবা প্রদান করেছে। এরমধ্যে সাড়ে ছয় হাজার জনের মধ্যে অস্ত্রোপচার করেছে এবং একশত চুরাশিটি বিশেষায়িত স্বাস্থ্যক্যাম্প পরিচালনা করেছে।
বন্যাকবলিত বা সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষগুলোকে দুর্যোগে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। বন্যায় ভেসে যায় তাদের সবকিছু। সরকারিভাবে কিছু আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও কতজনেরই বা সংস্থান হয় সেখানে? আর থাকলেই তো হবে না, খেয়ে পরে বাঁচাও তো লাগবে। এমনই এক চিন্তা থেকে ব্যতিক্রম এক ধরনের ফ্লাডসেন্টারের উদ্যোগ নিলেন ভূগোলের শিক্ষার্থী রুনা খান। তাকে সহযোগিতা করেছিলেন দেশবরেণ্য স্থপতিরাও।
ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগে বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ডিম্বাকৃতির উঁচু স্থান বানানো হয় আশ্রয়কেন্দ্র। এই উঁচু স্থানের মাঝখানে পানি আবদ্ধ থাকে। প্রবল স্রোতেও এটি ভেঙে যায় না। বন্যার সময় মানুষ গবাদিপশু নিয়েও এখানে চলে আসতে পারে। আর এই উঁচু স্থানের মাঝখানের জলাশয়ে চাষ হয় মাছ। ফলে সব মিলিয়ে বন্যার সময় বন্যার্তদের আর না খেয়ে রিলিফের দিকে চেয়ে বসে থাকতে হয় না। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৬টির মতো আশ্রয় কেন্দ্র করেছে ফ্রেন্ডশিপ।
এবার আসা যাক গাইবান্ধায় অবস্থিত তাদের ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার প্রসঙ্গে। কী উদ্দেশ্যে কেনইবা শুরু হয় এটি? আসলে নান্দনিক স্থাপত্য নকশায় নির্মিত এই সেন্টারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা থাকে সব সময়ই। এখানে চরাঞ্চলের মানুষদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ফ্রেন্ডশিপের কর্মীদের বিভিন্ন কর্মশালা হয়। আর রুনা খানের মূল ভাবনাটি ছিল এমন যে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিতে যারা আসবে তারা যেন এটিকে আপন করে নিতে পারে। কেন্দ্রটি হবে সাদামাটা কিন্তু সব চাহিদা পূরণে সক্ষম। ঠিক তেমনটাই হয়েছে। এখান থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। আর রুনা খান মনে করেন, চরের মানুষদের সমস্যার সহজ সমাধান প্রদান আসলে তেমন কার্যকরী হয় না। ক্ষণিকের জন্য অনেক কিছু না করে দীর্ঘস্থায়ী অল্প কাজ করাই ভালো।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পর তারা চরের মানুষদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কিছু কাজ করেন। তাদের উদ্যোগে এ এলাকার কৃষি ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। সবুজ সমারোহে উচ্ছল এখন এর পরিবেশ। সেই সাথে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনয়নে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাঁতের মাকুর খট্ খট্ শব্দে এখন ঘুম ভাঙে এ এলাকার মানুষের। এই গ্রামের মেয়েরা ববিনে সুতা তোলা থেকে শুরু করে সুতার রং লাগানো-শুকানো, তাঁত চালানো সব কাজ শিখছে। ২০০৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এই গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রেন্ডশিপ উইভিং, ডাইয়িং অ্যান্ড প্রিন্ট প্রজেক্টের উদ্বোধন করেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি স্টিফেন ফোয়েন। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় সিধাই গ্রামের নারীদের আত্মনির্ভর হওয়ার সংগ্রাম। গত প্রায় দু’বছরে ওই গ্রামের মোট ৫০ জন নারী তাঁত শিল্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন কাপড় তৈরি করছেন। বাড়ির কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলছে তাদের এ কর্মযজ্ঞ। এ থেকে সপ্তাহে গড়ে তাদের দু’হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। ছোট এই গ্রামে আজ নারীরা জীবিকার সন্ধান পেয়েছে। তারা এখন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।
এরপরই রুনা খান গ্রামের স্কুল নিয়ে কাজ শুরু করেন। স্কুলগুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যেন নদীভাঙনের সময় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায়। আর এই স্কুলগুলোতে শিক্ষকতাও করছেন ওই গ্রামেরই মানুষেরা। স্কুলের শিক্ষার্থীরাও বেশ ভালো করছে। গত বছর প্রাথমিক সমাপনীতে শতভাগ পাসের সাফল্য লাভ করেছে তারা। আর এসবের মধ্য দিয়ে রুনা খান প্রমাণ করেছেন চাইলে সীমিত জনবল দিয়েও ভালো কাজ করা সম্ভব।
বর্তমানে রুনা খান বাংলাদেশের লোক-সংস্কৃতি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন। আমাদের সংস্কৃৃতির অন্যতম বাহন নৌকা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন তিনি। রুনা খান বলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ কাঠের নৌকা। আশির দশকে চীনা ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশে পাল তোলা কাঠের নৌকা তৈরির শিল্প আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।’ নৌকা শিল্প সংরক্ষণে দেশে-বিদেশে কয়েকটি প্রদর্শনী করেছে ফ্রেন্ডশিপ। ইউরোপে চারটি প্রদর্শনী হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যারিসের মেরিটাইম জাদুঘর ও সেল নটিক দি প্যারিস। রুনা খান জানান, গয়না, সরঙ্গা, ডিঙ্গি, পাতাম, কোসা, মালার, সাম্পানসহ বাংলাদেশের নদী ও বঙ্গোপসাগরে পঞ্চাশের বেশি পাল তোলা কাঠের নৌকা নির্মাণ হতো।
রুনা খানের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন দেশে। এই উপমহাদেশেই কেটেছে বেশিরভাগ সময়। পড়াশোনাটাও বিভিন্ন জায়গাতেই। পরবর্তীতে ভূগোলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন তিনি। তার বাবা একজন প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আর মা করটিয়া জমিদার বাড়ির মেয়ে। আর তার একমাত্র বোন ব্যারিস্টার আয়েশা ইস্পাহানীও কাজ করছেন ফ্রেন্ডশিপের সাথে। এ ছাড়া রুনা খানের সব কাজের সঙ্গী আর শুভাকাঙ্ক্ষী তার তিন ছেলে ওসামা, শেহজার আর জন সালমান। তাদের সহায়তা আর অনুপ্রেরণা তাকে এই পর্যায়ে আসতে অনেক সাহায্য করেছে বলে জানান রুনা খান।
