প্রজন্ম মুখ

লেখালেখির একজন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫২
একটি মধ্যবিত্ত মণিপুরী পরিবারে তার জন্ম। বাবা লালমোহন সিংহ ছিলেন হাই স্কুলের শিক্ষক। মণিপুরী সমাজের একজন তত্পর ও সচেতন মানুষ। তার প্রধান গুণ তার পরম উদার পিতৃহূদয়। মাও ছিলেন একজন শিক্ষিত নারী। ছোটবেলায় মায়ের মুখে শরত্চন্দ্রের উপন্যাসের কাহিনী শুনেই শুভাশিসের সময় কেটেছে। এ ছাড়া তাকে ঘিরে ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর মানবেন্দ্র-প্রতিমার গান। এমনই একটি পরিবেশে শুভাশিস, তার দিদি শর্মিলা (রসায়নের প্রভাষক, সঙ্গীতশিল্পী), দাদা দেবাশিস (চিকিত্সক)-এর বেড়ে ওঠা। তার শৈশব-কৈশোর পুরোটাই কেটেছে গ্রামে। গ্রামের নাম ঘোড়ামারা। গ্রামের পেছনেই ধলাই নদী। নদী, মাঠ, পথ-ঘাট গ্রামের পুরোটা ভূগোল জুড়েই ছিল তার দুরন্তপনা। মণিপুরী পাড়াগুলো এমনিতেই উত্সবমুখর। উত্সব মানেই নাচ আর গান-বাজনা। সেসব দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন শুভাশিস। সবরকম খেলাধুলা, হাসি-আনন্দের মধ্যেও যে জিনিসটা তাকে অন্যরকম একটি ভাবনার মধ্য দিয়ে বড় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তা হচ্ছে বই। তার হাই স্কুল ছিল তেতইগাঁও রশিদউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানে তিনি সাহিত্য নিয়ে তত্পরতা চালানোর একটা জোটবদ্ধ চেষ্টা করেন। যেমন দেয়াল পত্রিকা করা, সংকলন বের করা ইত্যাদি। কিন্তু মেট্রিক পাস করে যখন সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হলেন, তখন সবকিছুর একটা শক্ত ভিত তৈরি হতে শুরু করল। সিলেটে স্থানীয় পত্রিকায় প্রায় প্রতি সপ্তাহে তার কবিতা ছাপতে শুরু করল। আর ঢাকার পত্র-পত্রিকায় অজস্র চিঠি। এগুলোর বিষয় ছিল রাজনীতি-সাহিত্য। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। লোকভাষ্যে ভালো ছাত্র ছিলেন শুভাশিস। কিন্তু তার নাটক নিয়ে পড়ালেখা করার ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্তে সবাই একবারে থ। তখন তাকে প্রেরণা দিয়েছিলেন তারই মাসতুতো ভাই অসীমকুমার সিংহ। জাহাঙ্গীরনগরে গিয়ে পেলেন মহান নাট্যকার সেলিম আল দীনকে। তার সস্নেহে, ভালোবাসায়, নাট্য ও শিল্পদীক্ষায়, সাথে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কবি মোহাম্মদ রফিকের কাব্যপ্রসাদে পুষ্ট হতে শুরু করলেন। এ সময় মণিপুরী থিয়েটার নামে একটি নাটকের দল গড়লেন। এই দলের হয়ে প্রায় ত্রিশটি নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন শুভাশিস। মণিপুরী থিয়েটার আজ নাট্যজগতে এক ভিন্নরকম থিয়েটারের স্বাদ ও দ্যুতি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুভাশিস জানালেন তার জীবনের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে মণিপুরী থিয়েটার। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তার উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে, ‘দশটি দীর্ঘশ্বাস’, ‘ডেকেছিলাম জল’, ‘অক্ষর নতুন করে চিনি’, ‘বেলা দ্বিপ্রহর’, ‘দ্বিমনদিশা’। এ ছাড়া আরও রয়েছে, ‘প্রতিরূপকথা’ (নাটক), ‘কুলিমানুর ঘুম’ (উপন্যাস), ‘রবীন্দ্রনাথ :গ্রামের ছবি’ (গবেষণা), মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ ২ খণ্ডে (অনুবাদ ও সম্পাদনা)। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় তার গ্রন্থগুলো হচ্ছে, ‘ছেয়াঠইগির যাদু’, ‘সেনাতম্বীর আমুনিগত্ত সেম্পাকহান পরিল অদিন’, ‘নুয়া করে চিনুরি মেয়েক’। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত সম্পাদনা করছেন মণিপুরী থিয়েটার পত্রিকা। মঞ্চে তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হচ্ছে ‘ভানুবিল’, ‘ইঙাল আধার পালা’ ও ‘ডালিমকুমার’। মঞ্চে তার উল্লেখযোগ্য নির্দেশনাগুলো হচ্ছে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘রুদ্রচণ্ড’, ‘ইঙাল আধার পালা’, ‘কহে বীরাঙ্গনা’ ও ‘দেবতার গ্রাস’। মঞ্চনাটকের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ভিন্নধারার টেলিভিশন নাটকও লিখেছেন। তার প্রচারিত উল্লেখযোগ্য টিভিনাটক ‘সুর-বেসুর’, ‘ক্যাথারসিস’, ‘চোর’, ‘জমিন’, ‘মানুষ ও একটি অমানবিক আখ্যান’, ‘তীরন্দাজ’, ‘একটি অপূর্ব যোগসূত্র’, ‘ধোঁয়াঘর’ ইত্যাদি। এ যাবত্ তার প্রাপ্ত উল্লেখ্যযোগ্য স্বীকৃতিগুলো হচ্ছে থিয়েটার প্রবর্তিত ‘মোহাম্মদ জাকারিয়া স্মৃতি পদক’ (২০০৮ সালে), নাট্যধারা প্রবর্তিত তনুশ্রী পদক (২০১১ সালে), ‘হওয়া না-হওয়ার গান’ কাব্যগ্রন্থের জন্য এইচএসবিসি-কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার ২০১২ এবং ‘কুলিমানুর ঘুম’ উপন্যাসের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০১৩ (হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার), মণিপুরী সাহিত্যে অবদানের জন্য ভারতের আসাম থেকে দিলীপ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ২০০৫। শুভাশিস পেশায় একজন নাট্যপ্রশিক্ষক। কাজ করছেন মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীতে। এটি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সাংস্কৃতিক একাডেমী। যেখানে মণিপুরীদের পাশাপাশি মৌলভীবাজার জেলার অন্যান্য জাতিসত্তার সংস্কৃতি নিয়েও কাজ করা হয়। নতুনদের কাজের বিষয়ে শুভাশিসের মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুন্দর এবং দাপুটে। তবে যা কিছুই করছি বা যা কিছু নতুনত্ব আনতে চাচ্ছি তা অনেক সময়ই হয় কেবল রুচি বা টেস্ট বদলানোর জন্য। এটা ঠিক নয়। সবকিছুই করা চাই অন্তর্গত তাগিদ থেকে। একটা দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা থেকে। তবেই প্রকৃত নতুনের জন্ম হবে। মহাসৃষ্টির জন্মের প্রথম শুভক্ষণ এখনও অপেক্ষায় আছে আমাদের।’ শুভাশিস সিনহা ডাক নাম :সমীর জন্মতারিখ ও স্থান :২৯ জানুয়ারি, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। মা :ফাজাতম্বী সিনহা বাবা :লালমোহন সিংহ প্রথম স্কুল :ঘোড়ামারা নয়াপত্তন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় উক্তি :পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি... প্রিয় পোশাক :ফুল হাতা শার্ট ও প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, গান শুনে, আড্ডা দিয়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্যের সংজ্ঞা হচ্ছে আসন্ন ব্যর্থতার জন্য প্রস্তুত হওয়া, এবং তা থেকে আবার উত্তরণের চেষ্টা করা।