প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নাম বাদ দিয়েই বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান টিম। গতকাল রবিবার অনুসন্ধান টিম এ প্রতিবেদন সেকশনে জমা দেন। জমা হওয়া প্রতিবেদনে হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় ৪২ জনকে আসামি করে ১২টি মামলার সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও ৫টি ব্যাংকের কর্মকর্তা থাকলেও কেলেঙ্কারির নেপথ্যের হোতাদের আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি দুদক। এ ব্যাপারে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান বলেন, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা তাদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সেকশনে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি এখন পর্যালোচনা চলছে। আগামী মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি কমিশনে পর্যালোচনার জন্য জমা হবে।
এদিকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দুদক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিলেও গ্রুপটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বর্তমানে দেশের বাইরে। জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই তারা দেশ ছেড়েছেন, আর ফেরেননি। এদের মধ্যে গ্রুপের মালিক ও এমডি খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরী, সোলায়মানের স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাসিব, সোলায়মানের বাবা ও গ্রুপের পরিচালক সফিকুল আনোয়ার চৌধুরী এবং সোলায়মানের মা ও গ্রুপের আরেক পরিচালক সারওয়ার জাহান বর্তমানে দুবাই অবস্থান করছেন। এছাড়া গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার (হিসাব) মো. আবুল হোসেন চৌধুরী মালয়েশিয়ায় এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন লন্ডনে রয়েছেন।
দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মালামাল রপ্তানি না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিএল ইস্যু করে রপ্তানি দেখিয়ে তার বিপরীতে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) এর মাধ্যমে টাকা বিদেশে পাচার করা করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় টাকার অবস্থান গোপন করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, বিসমিল্লাহ গ্রুপের রফতানির নামে ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও ফরেন ডকুমেন্টারি বিল পারচেজের (এফডিবিপি) দায় বাবদ প্রায় ১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হয়। এর মধ্যে ফান্ডেড ৯৩২ কোটি ও নন ফান্ডেড ২৪৪ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে এসব ঘটনায় পৃথক ১২টি মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। মামলাগুলোয় বিসমিল্লাহ গ্রুপের পরিচালক ও ব্যাংক কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট ৪২ জনকে আসামি করার সুপারিশ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, দুবাই, লন্ডন ও মালয়েশিয়াতে বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতির অর্থ পাচার করা হয়েছে। পাচারকৃত ওই অর্থ দিয়ে গ্রুপটির কিছু কর্মকর্তা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। প্রতিবেদনে মামলার আসামি হিসেবে সুপারিশ চাওয়া হয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের পরিচালক খাজা সোলেমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মামলায় আসামি করে মামলার সুপারিশ চাওয়া হয়েছে তার বাবা শফিকুল আনোয়ার চৌধুরী, খাজা সোলেমানের স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নওরীন হাবিব, মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) আবুল হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এছাড়া বিসমিল্লাহ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স হিন্দল ওয়ালী টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেডের পরিচালক সরোয়ার জাহান, নেটওয়ার্ক সিস্টেম লিমিটেডের মো: আক্তার হোসেন এবং বিসমিল্লাহ গ্রুপের সাবেক ব্যবস্থাপক রফিকুল আলম, টি ডব্লিউ এক্সপ্রেসের পরিচালক প্রোপাইটার মো: মঈনউদ্দিন, পরিচালক খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আতিকুর রহমানকেও আসামি করতে সুপারিশ করা হয়েছে।
অপর দিকে দুর্নীতির অভিযোগে ৩২ জন ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র যাদের নাম জানিয়েছেন তারা হলেন— প্রাইম ব্যাংকের হেড অব ইন্টারন্যাশনাল ডিভিশনের এসইভিপি মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক হেড অব কর্পোরেট ব্যাংকিং ডিভিশনের শাখা প্রধান মো. মোজাম্মেল হোসেন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) ও ফরেন এক্সচেঞ্চের ইনচার্জ ইব্রাহিম হোসেন গাজী, বসুন্ধরা শাখার এসভিপি একেএম জানে আলম, মতিঝিল কর্পোরেট শাখার সাবেক এসভিপি ও অপারেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ তাহেরুজ্জামান (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), সাবেক এসইভিপি ও হেড অব ক্রেডিট এম সহিদুল ইসলাম (বর্তমানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে কর্মরত), হেড অব কর্পোরেট শাখার সাবেক এসইভিপি মো. রফিকুল ইসলাম, সাবেক ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনচার্জ মোহাম্মদ ফারুক (বর্তমানে ইউসিবিএলে কর্মরত), সাবেক ভিপি ও অপারেশন ম্যানেজার কাজী মুহিবুল ইসলাম (বর্তমানে ইউসিবিএলে কর্মরত)। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ইস্কাটন শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ম্যানেজার মোঃ আসলামুল হক, কর্মকর্তা নকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড, যমুনা ব্যাংক লিমিটেড, জনতা ব্যাংক লিমিটেড, প্রাইম ও সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডসহ প্রাইম ও শাহজালাল ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ঋণ জালিয়াতির এ ঘটনা অনুসন্ধানে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করে দুদক। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে টিম। দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে এ টিমের অন্য সদস্যরা হলেন— সহকারি উপ-পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম, গুলশান আনোয়ার প্রধান, উপ-সহকারি পরিচালক সরদার মঞ্জুর আহমেদ এবং মো. আল আমিন।
