সর্বমতের সরকার : একটি প্রস্তাব

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৬
বাংলাদেশের আকাশে রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে; পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয় তখন থেকে এ ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দেয়। আর এখন তা প্রবল বেগে ধাবিত হচ্ছে। রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড় প্রাকৃতিক ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ভয়ঙ্কর। কারণ তা মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ—যার তিক্ত অভিজ্ঞতা অনেক আগে থেকে বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে আমাদেরকে দল-মত নির্বিশেষে স্বীয় অবস্থান থেকে সংকট বা দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে একটি সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন—যেখানে বর্তমান সাংসদদের মধ্য থেকে দুটি জোট ৫ জন করে নাম প্রস্তাব করবে। আর এ ১০ জন সাংসদ নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী একটি নিরপেক্ষ সরকারের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন— যেখানে তিনি বলেছেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে দুটি জোট ৫ জন করে নাম প্রস্তাব করবে, আর এই ১০ জন নিয়ে একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠিত হবে এবং তার মধ্যে ১ জন অথবা দুই জোটের আলোচনার ভিত্তিতে সর্বজনগ্রাহ্য ১ জন এ সরকারের প্রধান হবেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—দুটি প্রস্তাব নিয়েই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিশিষ্ট জন ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। প্রধানমন্ত্রী যদি সর্বদলীয় সরকারের প্রধান হন, তাহলে নির্বাচনকালীন একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ ব্যাপারে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে ১০ জন কর্মক্ষম ব্যক্তি পাওয়া যাবে কি? আর পাওয়া গেলেও তাঁদের বয়স সংবিধানের আলোকে ৭০ বছরের নিচে কিনা? আর সে সময়ে বা তত্ত্বাবধায়ক আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নিরপেক্ষতার ব্যাপারেও রাজনৈতিক দলসমূহ প্রশ্ন তুলেছিল ইত্যাদি নানা ধরনের সমালোচনা উঠে এসেছে। তবে আসল কথা হচ্ছে—এ বিরোধপূর্ণ অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রস্তাব শতভাগ গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে প্রণীত কেনিয়ার নতুন সংবিধানে উল্লেখ আছে— এটি একটি সাংবিধানিক কাঠামো—এটির কাজ হচ্ছে পার্লামেন্টকে যে কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করা। বাজেট তৈরিতে সহায়তা করা। পার্লামেন্টের সদস্যদের কী কী সুযোগ-সুবিধা দেওয়া দরকার সেদিকে খেয়াল রাখা। পার্লামেন্টের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দান ও তদারকি করা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসূচি গ্রহণ করা— কীভাবে কেনিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্রকে সচল করা যায়। এ কমিশনের মেয়াদে বলা আছে—পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ গঠন হওয়া পর্যন্ত এ কমিশন কাজ করবে। কমিশনের গঠন কাঠামোতে বলা হয়েছে—ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার এ কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন। আর যাঁরা সদস্য হবেন তাঁদের মধ্য থেকে সদস্যদের ভোটে একজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। এ কমিশনের ৭ জন সদস্য থাকবেন; যার মধ্যে ৪ জন মনোনয়ন দেবে ক্ষমতাসীন দল—এদের মধ্যে ২ জন ন্যশনাল অ্যাসেম্বলি ও ২ জন সিনেটের সদস্য এবং তার মধ্যে ২ জন মহিলা সদস্য থাকবেন। আর বাকি ৩ জন বিরোধী দল মনোনয়ন দেবে যার মধ্যে কমপক্ষে ১ জন ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও ১ জন সিনেট সদস্য এবং তার মধ্যে ১ জন মহিলা সদস্য হবেন। এর বাইরে আরো ২ জনকে পার্লামেন্ট মনোনয়ন করবে, যার মধ্যে ১ জন পুরুষ ও ১ জন মহিলা; যাঁরা পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কিন্তু পার্লামেন্টের সদস্য নন। আর এই ৯ জন থেকে ১ জন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। এ রকম একটি সুন্দর কাঠামো দেখে আমি চিন্তা করেছিলাম—যেহেতু আমাদের সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছে; সেহেতু সরকারি দল, বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো দাঁড় করা যায় কিনা। দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি উত্তরণ, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং শত-সহস্র শিক্ষার্থীর ভয়াবহ সেশনজটের বিপদ থেকে মুক্তির নিমিত্ত তরুণ প্রজম্মের একজন প্রতিনিধি ও রাজনীতির ছাত্র হিসেবে সর্বদলীয় ও নির্দলীয় সরকারের মাঝামাঝি এসে একটি ‘সর্বমতের সরকার’ গঠন করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে একটি কাঠামো প্রস্তাব করছি—প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুসারে সরকারি দল (১৪ দল) ৩ জন সাংসদের নাম জমা দেবে; আর বিরোধী দল (১৮ দল) ৩ জন সাংসদের নাম জমা দেবে, এক্ষেত্রে অবশ্যই এক-তৃতীয়াংশ মহিলা অর্থাত্ ১ জন করে মহিলা সদস্য হবেন। আর বিরোধী দলের প্রস্তাব অনুযায়ী বাকি ৪ জন সদস্য ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে আসবেন অথবা বর্তমান সময়ের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি থেকে আসবেন এক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দল ২ জন করে নাম প্রস্তাব করবে। আর এ ১০ জন সদস্যের ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে ১ জন এ সরকারের প্রধান নির্বাচিত হবেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়