যদিও দ্বিধা বিভক্ত রাজনৈতিক অবস্থান থেকে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর দোষারোপের ষোলকলা প্রদর্শন, তথাপি আজকের বাস্তবতায় যে কোন মূল্যে একটি সমঝোতা তৈরি হলে চারদিকে স্বস্তি ফিরে আসবে। বিশেষ করে ৯১, ৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ বিএনপি লড়াই ছাড়া একতরফা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা কিংবা আইওয়াশ নির্বাচন কোন ধরনের সমাধান বয়ে আনবে না।
একইসাথে অপ্রিয় বাস্তবতা হল বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কেউই বিরোধীদলের কথায় উভয়ের স্বার্থেও সহজভাবে কোন মতৈক্য কিংবা সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত একটা অস্থির পরিস্থিতি ও আত্মঘাতী ধ্বংসাত্মক প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়নি-ততক্ষণ ‘সদম্ভে’ নিজের অবস্থান আঁকড়ে থেকে দেশবাসীকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল; সে সুর যেন আজও চারদিকে। ক্ষমতাসীন ‘শক্তি’ যদি মনে করে থাকেন যে কৌশলে হোক এদের দমন (!) করে দেশজাতিকে সামনের দিকে ‘এগিয়ে’ নেয়ার মহান দায়িত্ব পালনে তারা এখনো সম্পূর্ণ ‘সক্ষম’ সে ক্ষেত্রে সমঝোতার প্রচেষ্টা লোক দেখানো ‘ভাওতা’ ছাড়া কিছু নয়।
নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ৯০ দিনের ৩/৪টি দিন শেষ হতে চললো—এখন পর্যন্ত সকলের অংশগ্রহণে ‘কাঙ্ক্ষিত’ নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরুই করা যায়নি। জোর করে টেনে সংসদের অধিবেশনের মেয়াদ ১০ দিন বাড়ানো হয়েছে কিছু অসমাপ্ত ও জনগুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের জন্য যা ৫ বছরে সম্ভব হয়নি। তবে ‘প্রতীক্ষিত’ সমঝোতার বাস্তবায়নে এটি আইনী কাঠামোতেই বাড়তি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
‘ক্ষমতাসীন’ আওয়ামী লীগ নির্মোহভাবে একটি নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়ে বিজয়ী কিংবা বিজিত হয়েও ‘সাধুবাদ’ কুড়াতে পারেন; কারণ সাময়িকভাবে হলেও এতে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর হবে। ‘কিন্তু’ ক্ষমতার সুউচ্চ আসন থেকে ‘নেমে আসা’ এতটা সহজ নয়-ক্ষমতাসীনদের কাছে; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেকে ‘শুধু’ আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ভাবতে গিয়ে তার মনে কয়েকটি ভাবনার উদ্রেক হতে পারে-
প্রথমত: সদ্য বিদায়ী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের ‘কথিত’ অভিযোগসমূহ নিয়ে নেতাকর্মীদের বিব্রত করা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত: তাকেও ‘গণভবন’ ছেড়ে ব্যক্তিগত বাসভবনে চলে যেতে হবে।
তৃতীয়ত: পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ সরকারের অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ একমাত্র তারাই ভালোভাবে করতে পারবে।
চতুর্থত: চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করে যেতে হলে তাদেরকে অবশ্যই ‘ক্ষমতা’ ধরে রাখতে হবে।
পঞ্চমত: দলীয় পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ১৬টি টিভি চ্যানেল এর নিয়ন্ত্রণ থাকায় অবশিষ্ট মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে আনা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তাই এখনো ‘বহাল তবিয়তে’ থাকা সরকার মনে করতেই পারে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ এসে যাবে। চার বছর ‘মার’ খাওয়া বিরোধী দল পর পর কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়ী হয়ে কিছুটা ‘চাঙ্গা’ এবং ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ’ জামায়াত-শিবিরের ‘মরণ কামড়’কে সহায়ক হিসেবে ‘প্রশ্রয়’ দিয়ে দৃশ্যমান প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
লোক দেখানো সংলাপ প্রচেষ্টা নিয়ে উপহাস ও বাহাস কম হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় ‘প্রটোকল সম্পর্কে যাদের সম্যক ধারণা আছে তারা কিছুটা ‘বিরক্ত’ হয়েছেন এবং দাওয়াত দেয়ার ছলে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিষোদগার সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তথাপি বহুমুখী চাপে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী পরস্পর সংলাপে বসতে আগ্রহী হয়েছেন। এখন এটাকে ‘অর্থবহ’ ও ‘ফলপ্রসূ’ করার রসদ যোগান দিতে হবে উভয় দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে। বন্ধ করতে হবে দৃশ্যমান ‘অসুস্থ’ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর আক্রোশের প্রতিযোগিতা।
দুই দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ একবেলা টেবিল ওয়ার্ক করলে শীর্ষ নেত্রীদ্বয়ের কাছে উপস্থাপনযোগ্য ২/৩টি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়। একই দিন গণভবনে চায়ের দাওয়াত কিংবা বঙ্গভবনে খানদানী ভোজের নিমন্ত্রণ রক্ষার মাধ্যমে জাতির ‘ক্রান্তিকাল’ থেকে উত্তরণে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরিত হতে পারে। সংবিধান কিংবা কোন জাগতিক শক্তিই এ উদ্যোগে বাধা হতে পারবে না, যদি দুজন রাজী তো সবই বাজিমাত!
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
borhan yousuf @ yahoo.com
