শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা হবে ১২০০ নম্বরের পরিবর্তে ১৩০০ নম্বরের ভিত্তিতে। শিক্ষাক্রমে ২০০ নম্বরের ঐচ্ছিক কম্পিউটার শিক্ষার পরিবর্তে ১০০ নম্বরের আবশ্যিক ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বিষয় সংযোজিত হয়েছে, যা ছয়টি শাখার শিক্ষার্থীদের জন্যই আবশ্যিক।
নতুন করে আবশ্যিক হওয়া এ বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন, উত্সাহ উদ্দীপনা দেখা যায়। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে। যে সব শিক্ষার্থীরা কোনদিন কম্পিউটার স্পর্শ করেনি তারা এ যন্ত্রটির স্পর্শে আসার আনন্দ উদ্দীপনায় বিভোর। কিন্তু হঠাত্ করেই শুনা যাচ্ছে যে এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকবে না। সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ল্যাব নেই, বিদ্যুত্ নেই ইত্যাদি অজুহাতে ব্যবহারিক উঠিয়ে দেয়ার কথা শুনা যাচ্ছে। যা একটি আনন্দ আয়োজনের মধ্যে হঠাত্ বিষাদের ছায়া ফেলেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছেন উদ্বিগ্ন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মানে কম্পিউটার। আর কম্পিউটার মানে এর এপ্লিকেশন তথা ব্যবহার। এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকবে না বিষয়টি অনেকে মেনেই নিতে পারছেন না। এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকার আবশ্যকতা প্রসঙ্গে নিচে কিছু আলোচনা করা হলো।
পূর্বে ২০০ নম্বরের কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টিতে ১ম পত্র এবং ২য় পত্র মিলে ব্যবহারিক ছিল ৮০ নম্বর (যা বর্তমানে সাচিবিক বিদ্যায় রয়েছে)। মূলত প্রাকটিক্যালের জন্যই শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টি নিতে বেশি আগ্রহী হতো। প্যাকটিক্যাল থাকাতে তারা ল্যাব ব্যবহার করে কম্পিউটার অপারেশনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখতে পারতো। আর প্রাকটিক্যাল-এর নম্বর যেহেতু শিক্ষকদের হাতে থাকে তাই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখা, শিক্ষকদের কথা শোনা, বেশি বেশি ক্লাশে হাজির হওয়া ইত্যাদি অনেকটা বাধ্য হয়েই করতো। কিন্তু প্রাকটিক্যাল না থাকলে শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই ক্লাশে হাজির হবে না বলে অনেক শিক্ষক মনে করেন। আর এতে করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আইসিটিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটাই ব্যাহত হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ বিবিএ অনার্স (হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং), বিএসএস অনার্স (অর্থনীতি), বিএসসি অনার্স (পরিসংখ্যান), সমাজকর্ম বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ১০০ নম্বরের কম্পিউটার এ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়টি বাধ্যতামূলক হিসেবে রয়েছে। কিন্তু এতে ব্যবহারিক না থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্লাশে একেবারেই কম উপস্থিত থাকে যা অনেক সময় শিক্ষকদেরকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। যেহেতু উচ্চ মাধ্যমিকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি অর্থাত্ কম্পিউটার বিষয়টি চালু করা হয়েছে তাই কোনোভাবেই এর ব্যবহারিক অংশটি বাদ না দেয়ার দাবি বিজ্ঞমহলের। কম্পিউটার মানেই প্রাকটিক্যাল। সারা দেশের কথা বিবেচনা করে প্রয়োজনে প্রথম বছর পরীক্ষা সহজ করা যেতে পারে। যেমন সি-এর একটি ছোট প্রোগ্রাম রান করানো, নোটপ্যাড চালু করে এইচটিএমএল-এর এক/দু’টি ট্যাগের ব্যবহার এবং ডাটাবেজ অংশে একটি টেবিল তৈরি করে তাতে কয়েকটি রেকর্ড সন্নিবেশিত করা এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। ২৫ নম্বরের মধ্যে এসব ব্যবহারিক কাজের জন্য ১০ নম্বর, বাকি ব্যবহারিক-এর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু তাত্ত্বিক অংশ, মৌখিক এবং প্রজেক্ট লেখা। এভাবে করলে কোন শিক্ষার্থীই খারাপ করবে না। একেবারে রিমুট এলাকার শিক্ষার্থীদেরকে প্রয়োজনে ঐ ১০ নম্বর এমনিতেই দিয়ে ব্যবহারিক করার মতো ল্যাব না থাকার বিষয়টি কভার করা যেতে পারে।
উচ্চ মাধ্যমিকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার বিষয়ে যদি প্রাকটিক্যাল না থাকে তাহলে অনেক শিক্ষার্থী হয়তো কম্পিউটার স্পর্শই করতে পারবে না। যদি প্রাকটিক্যাল থাকতো তাহলে যেভাবেই হউক একজন শিক্ষার্থী হয়তো কোন না কোনভাবে একদিনের জন্য হলেও কম্পিউটার ব্যবহার করে দেখার সুযোগ পেতো। যেমন, প্রযুক্তির আলো নামের একটি ভলেনটিয়ার প্রতিষ্ঠান যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাব নেই তাদের শিক্ষার্থীরা যাতে হাতে-কলমে শিখতে পারে সেজন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তাদের মতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি হাতে-কলমে শিখতে পারলে ভালোভাবে বিষয়টি বুঝার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং প্রোগ্রামিং-এর প্রতি আগ্রহী হতো। প্রযুক্তি ছড়িয়ে যাক সবখানে এ শ্লোগান নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে প্রযুক্তির আলো। বিভিন্ন পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের তরুণ শিক্ষার্থীরা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা হিসাবে ভলেন্টারি মানসিকতা নিয়ে প্রযুক্তির আলোর সদস্য হিসাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তাদেরকে নিয়ে একটি টীম গঠন করা হয়েছে। এ টীমের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ নিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রযুক্তি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবে। এভাবে সরকারিভাবে উত্সাহিত করলে অনেক প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে আসবে। সরকার যদি সব পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোর শিক্ষার্থীদেরকে উত্সাহিত করে তাহলে তাদের নেতৃত্বে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রত্যন্ত এলাকায় ক্যাম্প করে শিক্ষার্থীদেরকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক অংশটি হাতে-কলমে শেখাতে পারে। এভাবে শেখানোর বিষয়টি যদি এটাচমেন্টের মতো বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে উভয় শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে। আগামীদিনের তথ্য প্রযুক্তিবিদ যারা হবে তারা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়ার মানবিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
এ বছর যে সব বিষয়ে কখনো প্রাকটিক্যাল ছিল না এরকম অনেক বিষয়ে প্রাকটিক্যাল যুক্ত করা হয়েছে। কম্পিউটার একটি প্রাকটিক্যাল ওরিয়েন্টেড বিষয়। এ বিষয়ে অবশ্যই প্রাকটিক্যাল থাকা উচিত। উচ্চ মাধ্যমিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত প্রাকটিক্যাল না থাকলে এ বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাবে। আগামীদিনের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে যে প্রশিক্ষিত ডিজিটাল কর্মী প্রয়োজন তা তৈরি করার জন্য অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকা প্রয়োজন বলে বিজ্ঞমহল মনে করেন।
লেখক : শিক্ষক
