বিমান বাহিনীকেও হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৪
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের ন্যায় বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকে রক্ষা তথা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করার জন্য অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ন্যায় বিমান বাহিনীকেও যে কোন হুমকি মোকাবেলায় সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। গতকাল বুধবার ঢাকা সেনানিবাসে বিএফ ঘাঁটি বাশারে বিমান বাহিনীর সদস্যদের দরবারে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। বিএফ ঘাঁটি বাশার সংলগ্ন রানওয়েতে প্যান্ডেল দিয়ে তৈরি দরবার হলে বিমান বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন উত্ফুল্ল। এর কারণ হিসাবে সদস্যরা জানান, বিমান বাহিনী প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম আলাদা দরবার অনুষ্ঠিত হলো। তাদের বাহিনীর বিভিন্ন সমস্যা সরাসরি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। অতীতে এ সুযোগ তাদের হয়নি। সেনানিবাসে তিন বাহিনীর এক সঙ্গে দরবার হয়ে আসছিল বলে বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান। বিমান বাহিনীর ঢাকা অঞ্চলের সকল সদস্যসহ প্রায় ৫ হাজার সদস্য দরবারে উপস্থিত ছিলেন। ভাষণ শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তিন বাহিনীর সদস্যদের এলপিআর ৬ মাসের স্থলে এক বছর করার ঘোষণা দেন। এছাড়া তিন বাহিনীর প্রধানের সমান পদমর্যাদায় র্যাংক ব্যাজ করার বিষয় বিবেচনাধীন এবং অন্যান্য সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজেদের সর্বদা প্রস্তুত রাখতে হবে। নিজেদের প্রজ্ঞা, পেশাগত দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠা নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের সুনাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবেন। বিমান বাহিনীর ভেতরের চালিকাশক্তিগুলো অর্থাত্ ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি শৃঙ্খলা বজায় রেখে স্বীয় কর্তব্য সম্পাদনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রধান হিসাবে আমি আমার সাধ্যমত এ যাবত্ যতটুকু দেয়া সম্ভব তা দিয়েছি, আরো আধুনিক বিমান বাহিনীর জন্য যা যা প্রয়োজন আগামীতে তা করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতির পিতা একটি দক্ষ ও চৌকস বিমান বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার বিমান বাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে কার্যকর পরিকল্পনা নিয়েছে। সেই সঙ্গে বিমান বাহিনীর আধুনিকীকরণ, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে ব্যাপক সংখ্যক হেলিকপ্টার ক্রয়ের চুক্তিপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থ বছরে ২টি মেরিটাইম সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ হেলিকপ্টার ও ৩টি বেসিক ট্রান্সপোর্ট ট্রেইলার বিমান সংগ্রহের কার্যক্রমও হাতে নেয়া হয়েছে। ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থ বছরে বিমান বাহিনী ঘাঁটি পাহাড় কাঞ্চনপুর, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ও মৌলভীবাজারে পুরাতন রাডারের প্রতিস্থাপক এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরে বিস্তীর্ণ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তদারকির প্রয়োজনে মোট ৪টি এয়ারডিফেন্স রাডার ক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, ২০১০-১১ অর্থ বছরে চীন থেকে ১৬টি যুদ্ধ বিমান, রাশিয়া থেকে ৩টি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার ও ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো একটি সারপেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম বিমান বাহিনীতে সংযোজন করা হয়েছে। গত অর্থ বছরে চীন থেকে ৯টি জেড ট্রেইলার বিমান ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে রাষ্ট্রীয় ঋণের আওতায় ২৪ এডভান্সড জেট ট্রেইলার এয়ারক্রাফট ও ৫টি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার ক্রয়ের চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় সবকিছু দেয়া হবে। বিএফ ঘাঁটি বঙ্গবন্ধুতে বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার স্থাপনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বিমান বাহিনীর অনেকগুলো নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। এফ-৭ যুদ্ধ বিমানের জন্য একটি ওভারহলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে এবং ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আলোকে এমআই সিরিজের হেলিকপ্টারের জন্য একটি ওভারহলিং প্ল্যান্ট স্থাপন চূড়ান্ত। শেখ হাসিনা বলেন, একটি দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। এক বাহিনীর পক্ষে শত্রু মুক্ত সম্ভব নয়। এজন্য বিমান বাহিনীর পাশাপাশি সেনা ও নৌ বাহিনী আধুনিকায়নে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করা হয়েছে। ভাষণ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিমান বাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ও উইং কমান্ডার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ঝুঁকি ভাতা, উড্ডয়ন ভাতা, প্রতিরক্ষা সার্ভিস ভাতা, তিন বাহিনীর প্রধানের পদমর্যাদা একই সমান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিমান বাহিনীর একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করার দাবি জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের এলপিআর রয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এলপিআর এক বছর করার ঘোষণা দেন। ঝুঁকি ও উড্ডয়ন ভাতা দ্বিগুণ করেছেন। পে-কমিশন দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ কমিশন স্থায়ীভাবে কাজ করবে। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন স্কেল অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদানে কাজ করবে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য দাবিগুলোও মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন। বিমান বন্দরে আকাশ সীমাসহ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দাবি করে বিমান বাহিনীর একটি রেজিমেন্ট গঠনের দাবি করা হলে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে বলে জানান। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর করার বিষয়টি চূড়ান্ত বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। সিলেটে সেনাবাহিনীর আলাদা ডিভিশন ইতিমধ্যে চালু করা হয়েছে। খনিজ সম্পদসহ অর্থনৈতিক দিক থেকে সিলেট গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আলাদা বিমান বাহিনী ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার দাবি করা হলে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ঘাঁটি করার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রতিরক্ষা ক্যাডার করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। অনুষ্ঠানে বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী বক্তব্য রাখেন। তিনি বিমান বাহিনীর উন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল স্টাফ অফিসার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।