ছেলেটা তখন একটার পর একটা সুখবর নিয়ে বাড়ি ফেরে—কখনো সেঞ্চুরি করে, কখনো বিদেশ সফরের ডাক পায়, কখনো জাতীয় দলের হাতছানি আসে। এখন ছেলেটার অপেক্ষা শুধু জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার। একেকটা খবর শুনে গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে, মুখটা হাসিতে ভরে যায় মায়ের। তারপরই কি যেন ভেবে আপন মনেই হেসে ছেলেকে বলেন, ‘দেখিস, আমাদের যখন সবচেয়ে সুখের সময় আসবে; আমি তখন খুব কষ্টে থাকব।’ এই কথাটা, এই একটা কথা মাথার ভেতর চক্কর কাটতে থাকে সব সময়। তিনি সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করেন, একটার পর একটা দেশের রেকর্ড ভাঙেন, তার বিশাল বিশাল ছবি ছাপা হয়; কিন্তু সেই মায়ের ছেলেটি কখনোই বাঁধাভাঙা উল্লাসে মেতে উঠতে পারেন না। কারণ, মায়ের কথা যে সত্যি হয়েছে। আজ তাদের সবচেয়ে সুখের দিন; আর আজ তার মা চলত্শক্তিহীন হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। কথাটা ভাবতেই দাঁতে দাঁত চেপে আরও প্রতীজ্ঞ হয়ে ওঠেন তিনি। কথাটা ভাবতেই প্রতীজ্ঞাটা আরও শক্ত করে শোনান নিজেকে—মায়ের সুখের দিন ফিরিয়ে তবেই আনন্দ; তার আগে নয়। এই মায়ের জন্য লড়ে যাওয়া তরুণটিই আজ বাংলাদেশের নায়ক। আমাদের এখনকার তরুণ—মুমিনুল হক। অবশ্য মুমিনুলকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের পক্ষে এই জাতীয় দল তারকাকে ‘তরুণ’ বলে মেনে নেওয়া কঠিন। কাগজ-কলম বলছে, বয়স তার ২২ পার হয়ে গেছে। কিন্তু চোখ দুটো আপনাকে বলে দেবে, কাগজ-কলমের এই হিসেব মিথ্যে। আকার ও নিষ্পাপ চোখ দেখলে মনে হতে বাধ্য যে, চাইলে অনুর্ধ্ব-১৩ বয়সভিত্তিক দলের হয়ে এখনও একবার খেলে আসতে পারেন মুমিনুল। চোখের এই ভ্রান্তিতে ভক্তরা পড়ে যেতে পারেন। কিন্তু দেশটাই যে মুমিনুলকে নিয়ে ভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেল! আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না, এই একেবারে অনভিজ্ঞ ছেলেটি কিভাবে দেশের ‘অভিজ্ঞতম’ ক্রিকেটারের মতো আচরণ করে চলেছে! সাকিব আল হাসানের ইনজুরিতে অনেকটা হঠাত্ করেই জাতীয় দলে ডাক পেয়ে গিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। তারপর সাকিব দলে ফিরেছেন, কিন্তু মুমিনুলকে আর বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, টেস্ট-ওয়ানডে সব ফরম্যাটেই রানের পর রান করে যাচ্ছিলেন কক্সবাজারের এই তরুণ। এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের আগেই মুমিনুল যা করেছেন, তাতে তাকে অনেকদিন ধরে বাংলাদেশ দলে জায়গাটা পাকা বলে লিখে দেওয়া যেত। কিন্তু মুমিনুল যে এতে সন্তুষ্ট হওয়ার লোক নন। তাই এই সিরিজটাকেই বেছে নিলেন নিজেকে দেখানোর জন্য। দুই ম্যাচের সিরিজে টানা দুটো সেঞ্চুরি করলেন; প্রথমটা ছিল ১৮১ রানের ইনিংস। মোট দু টেস্টে ৩৭৬ রান করে দেশের পক্ষে দু টেস্টের সিরিজে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড করে ফেলেছেন। নিঃসন্দেহে এখন সময়টা মুমিনুলের সময় বলে রায়ই দিয়ে দেওয়া যায়। জাতীয় দলে মুমিনুলের সিনিয়র তামিম ইকবাল অবশ্য একটু ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি বলছেন, ‘এখনকার সময়টা শুধু নয়, মুমিনুল ক্রিকেটে এসেছেনই লম্বা সময় ধরে শাসন করার জন্য।’ তামিম তো সেদিন সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার রায় দিয়ে দিলেন, ‘সাকিব আর মুমিনুল হলো একই রকম। ওরা দু জনই নাম্বার ওয়ান।’ এটুকু শুনে বিস্মিত হতে পারেন—এখনই মুমিনুলের তুলনা সাকিবের সঙ্গে! অনেক আগে থেকে তিনি বলেন, সাকিব ভাইয়ের মতো এক নম্বর হওয়া তার স্বপ্ন। সেই এক নম্বর হতে যা যা করতে হয় করবেন তিনি। মুমিনুল যেদিন এক নম্বর হবেন, সারা দেশে উত্সব হবে, আরও বড় ছবি ছাপা হবে। মুমিনুল নিজে সেদিন উল্লাস করবেন তো? অবশ্যই করবেন, ছেলের অমন দিনে মায়ের সুখের দিন না ফিরে পারে না। মুমিনুলের মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠা, সুখের দিনে ফেরার জন্য এখন মুমিনুল একা নন; নিশ্চয়ই সারা দেশ প্রার্থনা করবে।
