এ উপমহাদেশে বিগত শতাব্দীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রয়োজনে, অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের সন্ধানে এবং সামাজিক নেতৃত্ব লাভের প্রত্যাশায় সাধারণ জনগণের মাঝে ক্রমাগতভাবে কিছু-সংখ্যক ব্যক্তি, নেতা-নেত্রী, চতুর ও মোড়ল শ্রেণির লোকেরা বিভেদ ও বিভাজনের প্রচার ও প্রসার অব্যাহত রেখেছে। এ সকল লোকেরা কখনো দলীয় রাজনীতিকে পুঁজি করেছে, আবার কখনো ধর্মের লেবাস পরে বিভেদের ক্ষেত্রকে পাকাপোক্ত করেছে। তাদের এ ঘাতক মানসিকতা বা বুদ্ধিমত্তা অনেকে কালক্রমে আয়ত্ত করেছে অধিকতর দক্ষতার সাথে এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে আধুনিক কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে যুগে যুগে, যার ধারাবাহিকতা এখনো বিরাজ করছে প্রায় সকল ক্ষেত্রে। সরল বিশ্বাসের আমজনতা তাদের কথায় বিশ্বাস করে প্রতিবেশীর সাথে দুর্বৃত্তের মতো ব্যবহার করেছে, প্রতারণা করে বা ভয় দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করছে অনেক জনপদের সহজ-সরল ও নিরীহ অধিবাসীদেরকে। সমাজ জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যে নিয়োজিত এ সব ব্যক্তির সাথে অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সহযোগিতা করছে স্থানীয় প্রশাসন নির্লজ্জভাবে।
প্রসঙ্গক্রমে ইতিহাসের পাতায় একটু বিচরণ করতে হয়। আমরা দেখতে পাই যখন “ইংরেজ ভারত ছাড়ো” আন্দোলনে এ উপমহাদেশ কম্পমান হয়ে পড়ে, তখন ব্রিটিশ শাসকেরা ভাবলো ‘যাবো, তবে বিভাজন ও বিভেদকে পাকাপোক্ত করে যাবো’। তখনকার ভারতবাসী বললো “কুইট ইন্ডিয়া”, (Quit India)। ইংরেজ চক্রান্ত করলো “ডিভাইড এন্ড কুইট” (Divide and Quit)। ঐক্যবদ্ধ কুইট ইন্ডিয়া আন্দেলনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে চোখের সামনে এ চিত্রই ভেসে উঠে। ১৯৪২ সালের ৭ আগষ্ট কংগ্রেসের অধিবেশন বসলো এবং ঠিক হলো ইংরেজকে ভারত ছাড়তে বলতে হবে। কিন্তু সংক্ষিপ্ত শ্লোগান কি হবে। নেহেরু, পেটেলসহ অনেকেই প্রস্তাব দিলেন। গান্ধীজীর কোনটাই মনোপুত হলো না। অবশেষে ইউসুফ মেহের আলী প্রস্তাব দিলেন, “কুইট ইন্ডিয়া” (Quit India)। গান্ধীজী তাই গ্রহণ করলেন। শুরু হলো বিশাল আন্দোলন। অরুণা আসিফ আলী কংগ্রেসের বড় নেত্রী। তিনি ৯ আগষ্ট ১৯৪২, গোয়লিয়র ট্রাঙ্ক ময়দানে ভারতীয় পতাকা তুললেন, শ্লোগান একটিই, কুইট ইন্ডিয়া (Quit India)। লক্ষ জনতার গগনবিদারী গর্জন দেখে ইংরেজ শাসকেরা প্রমাদ গুনলো। হাজার কর্মী কারাবরণ করলেন। গান্ধী, নেহেরু, আবুল কালাম আজাদ, সরদার পেটেল কেউ রেহাই পেলেন না। গান্ধী এবার বললেন, “করেঙ্গে আওর মরেঙ্গে।” (Do or Die)। ব্রিটিশরাজ ভারতবাসীর ঐক্য দেখে চক্রান্ত শুরু করলো। শুরু হলো বিভাজন ও বিভেদের চক্রান্ত। তারা ফন্দি আঁটলো, যাবো তবে বিভাজনকে পাকাপোক্ত করে যাবো। শুরু করে দিলো হিন্দু-মুসলিম বিভেদ। এমন সুনিপুণভাবে তা পরিচালিত করলো, শুধু পাকিস্তান সৃষ্টি নয়, ধর্মীয় বিভেদ ও বিভাজনকে এদেশের মানুষের মাঝে জন্মগতভাবে স্থায়ী করে দিলো।
লক্ষ লক্ষ মানুষ এ বিভেদের শিকার হলো, প্রাণ দিলো, দেশত্যাগী হলো। এ করুণ আর্তনাদ এখনো চলছে এবং মনে হয় আর থামবে না। অথচ ভারতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ ভারতবাসী যাত্রা শুরু করেছিল, “হিন্দু না মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন জন, মরিছে সন্তান মোর মার।” নিমেষে তাদের পরিচিতি হয়ে গেল হিন্দু-মুসলমান। এরই নাম রাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই। স্বাধীনতার আন্দোলন এক সময়ে রূপ নিলো, নোয়াখালী বা বিহারের ভয়াবহ দাঙ্গায়। স্বাধীনতার ইতিহাস পরিণত হলো দাঙ্গার করুণ আর্তনাদে। বিভাজন ও বিভেদ হলো সর্বত্র দৃশ্যমান। দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তা মিথ্যা প্রমাণিত করেছে, কিন্তু স্থায়ী রূপ দিতে সময় লাগবে, প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।
কেন এসব কথার অবতারণা করলাম। বর্তমানে বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে, নগর-বন্দরে, পাড়ায় পাড়ায় রীতিমতো ঝগড়া বিবাদ শুরু হয়েছে। কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, আবার কেউ জামায়াত। সর্বত্র তর্ক-বিতর্ক চলছে, নানান কথা, ঘরে ঘরে তর্ক, রীতিমতো রাগারাগি। কোন ব্যক্তির কথা উঠলে বলা হয়, চিনতে পেরেছি, তিনি হচ্ছেন বিএনপির লোক। কারো কোন কথার সাথে ধর্মের সম্পৃক্ততা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে বলা হয়, আরে উনি তো ঘোর জামায়াত। কেউ পত্র-পত্রিকায় কোন অভিমত প্রকাশ করলে, তার অভিমতটি মূল্যায়ন করা হয় না। সঙ্গে সঙ্গে বলা হয় উনিতো বিএনপি বা আওয়ামী লীগ। ভদ্রলোক কি বলেছেন বা লিখেছেন তার মূলকথা আলোচনায়ও আসে না। কি অবাক এক দৃশ্যপট তৈরী হতে চলেছে। এ কেমন সংস্কৃতির প্রতি আমরা ধাবিত হচ্ছি, লালন করছি এক বিভেদের ভাবনাকে। সবাই যেন ধীরে ধীরে পরিচিত হতে চলেছি রাজনৈতিক ও দলীয় পরিচয়ে।
প্রধানত দেশের মধ্যে আদর্শগত ভাবনা বা শিল্প সাহিত্য নিয়ে নিবিড় চর্চার অভাবের ফলে এ জাতীয় হালকা দলীয় আলোচনা দেশবাসীকে ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন প্রকারের সঙ্গ, সমিতি, খেলার ক্লাব এবং লাইব্রেরী অথবা সঙ্গীত সাধনার সুযোগ পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে রাজনীতির চর্চা জনগণের কাছে অতোটা আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিতে পারতো না। তারপর হচ্ছে কিছু রাজনৈতিক দল অর্থ দিয়ে বা অন্য কোনভাবে কিছুসংখ্যক উদীয়মান যুবক শ্রেণিকে আকর্ষণ করছে, তাদের হয়ে দলবাজি বা লাঠালাঠি করতে। এ জাতীয় নিয়োগকৃত কর্মী বাহিনীর ভরণ-পোষণের জন্য তাদের পিছনে সন্মানজনক বিনিয়োগ করা হয়। তারপর কোন কারণে দলছুট হলে তার জীবন নিয়ে টানাটানি শুরু হয়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে বিশেষ কোন শৃঙ্খলা নেই বা দলে লোক ভর্তির কোন সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনও নেই। যখন নির্বাচন আসে তখন একটি ম্যানুফেষ্টো প্রকাশ করা হয়, তাতে ভোটারদেরকে আর্কষণ করার জন্যে যতো সব ভালো কথা বা প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। দলের নিজস্ব নীতিমালা, আর্দশগত অবস্থান, শাসনতন্ত্র ইত্যাদি তৃণমূল পর্যায়ে দলের মধ্যে বিশেষ কোন আলোচনা হয় না অথবা দলীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। দলের ক্যাডার হিসাবে তৈরী করার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না।
একটি দলের প্রাথমিক সদস্য হতে হলে কি জাতীয় যোগ্যতা, চারিত্রিক গুণাবলী বা বংশগত ঐতিহ্য ও সদাচারের ইতিহাস প্রয়োজন, তার কোন যাচাই- বাছাই নেই। মোটেই পর্যালোচনা করা হয় না দলের ভাবমূর্তি বিকাশের জন্য কর্মীর যোগ্যতা বা গুণাবলী। কোন ডানপিটে ছেলেকে দেখলেই তাকে দলে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচন করা হয়। অর্থাত্ মারপিট করার মতো মনোবৃত্তি অথবা আর্থিক সংহতি থাকা হচ্ছে দলীয় নেতা বা কর্মী হওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি।
এ জাতীয় রাজনীতির ভিত্তি খুবই দুর্বল হয়। তাই লক্ষ্য করা যায় কোন দলের পক্ষে একবাবের বেশি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সম্ভব হয় না, পাঁচ বছর যেতে না যেতেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ দলীয় কর্মীদের অপকর্ম দলের ভাবমূর্তিকে ধরে রাখতে সক্ষম হয় না।
এভাবে সংসদীয় এবং বহুদলীয় ও বহুবাচনিক গণতন্ত্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। গণতন্ত্রের উপর আঘাত আসে। রাজনীতির বাইরের শক্তি ক্ষমতায় আসীন হতে সুযোগ পায়। অনেক সময় জনগণও অভিনন্দন করে। পৃথিবীর যে সকল দেশে কোন দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আসীন ছিলো, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং প্রচুর আত্মনিবেদিত কর্মীর সমাবেশ ও অক্লান্ত পরিশ্রম। তারা দলীয় বিভেদ বা বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে দলমত নির্বিশেষে জনগণের দুয়ারে গিয়ে হাজির হয়েছেন শান্তি ও সংহতির বার্তা নিয়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে জনসেবার মাধ্যমে উত্কর্ষ সাধন এবং জনকল্যাণে নিবেদিত প্রাণের দারুণ অভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। দলের তৃণমূলে অবস্থিত কর্মীদেরকে দলীয় বৈশিষ্ট্য প্রচার বা শুদ্ধাচার নিয়ে কোন শিক্ষা প্রদান বা আলাপ-আলোচনা হচ্ছে না। শুধুমাত্র শোনা যায় আক্ষেপ, অমুক দল করেছি অনেকদিন কিছুইতো পেলাম না। রাজনীতি করলে বাড়ি গাড়ির মালিক হতে হবে দ্রুত। পাইয়ে দিবার অথবা অন্যদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যেই ক্ষমতায় থাকুক তার দলের কর্মীকে অনেককিছু পেতে হবে। এ জাতীয় ভাবনা থেকেই সংঘাত, হিংসা এবং একই সঙ্গে বিভেদের রাজনীতি দানা বাঁধে।
এ জাতীয় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের বসবাসের উপযোগী একটি দেশ গঠনের প্রয়োজনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের চিন্তায় ও চেতনায়। জাতীয় ও সমাজ জীবনে বিভেদ ও বিভাজনের বার্তা প্রচার হতে না পারে এবং পারস্পরিক হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়াতে না পারে , তদ্রূপ কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক দলসমূহকে অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের সুশীল সমাজ, প্রবীণ ব্যক্তিরা এ লক্ষ্যে ব্যাপক ভূমিকা রাখবেন, এ হচ্ছে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক :সাবেক সচিব
