শেষ পর্যন্ত জন্মস্থানেই ফিরে গেল বহুল আলোচিত দশ বছর বয়সী গৃহকর্মী আদুরী। পেটের দায়ে এই নগরীতে কাজ করতে এসে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে আদুরীকে আশ্রয় নিতে হল পিতা-মাতার কাছেই। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে আদুরী দেশ-বিদেশে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকেও বেঁচে গেছে। পুলিশ আর সমাজসেবীদের কল্যাণে সংসারের আর্থিক অভাবও খানিকটা দূর হয়েছে। কিন্তু আদুরীর মন থেকে নির্যাতনের স্মৃতি দূর হয়নি। এখনো ঘুমের মধ্যে আঁতকে ওঠে কেঁদে ফেলে সে। এই শহরের এক অভিজাত পরিবারে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নিয়েছিল আদুরী। গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে সে চলে গিয়েছিল মৃত্যুর মুখে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর বারিধারা এলাকার একটি ডাস্টবিন থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় আদুরীকে উদ্ধার করে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। ওসিসির সমন্বয়ক চিকিত্সক বিলকিস বেগম আদুরীকে মায়ের যত্নে চিকিত্সা দিয়েছেন, তার দেখভাল করেছেন। সংবাদ কর্মীরা সব সময়ই আদুরীর খোঁজখবর নিয়েছেন। আদুরীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। এজন্য নানাভাবে দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে আদুরী।
গতকাল সোমবার ডিএমপিতে আদুরীকে নিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে আদুরীকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। আদুরীর অভাব দূর করতে তিনি ৫টি রিকশা উপহার দেন। এছাড়া আদুরীর হাতে নগদ ৭৬ হাজার টাকাও তুলে দেন তিনি। টাকাগুলো পুলিশের অতিরিক্ত সুপার ফাহিমা হোসেনের ভাই কানাডা প্রবাসী ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন পাঠিয়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মারুফ হাসান, ডিবির দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় ও পূর্ব বিভাগের উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর এবং মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
আদুরীর মামা নজরুল ইসলাম জানান, আদুরীদের বাড়ি পটুয়াখালী জেলা সদরের জৈনকাঠি গ্রামে। আদুরীর পিতা আব্দুল খালেক মৃধা ৩ বছর আগে মারা যান। মা সাফিয়া বেগম। আদুরীরা ৪ ভাই, ৫ বোন। আদুরী ভাই-বোনদের মধ্যে সপ্তম। পিতা-মাতার সংসারে অভাব ছিল। কিন্তু তাদের আদর-সোহাগ আর ভালোবাসার অভাব ছিল না। তাই পিতা-মাতা বড় আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিল আদুরী বেগম। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপ-পরিদর্শক কুইন আক্তার জানান, মামলার সূত্রধরে গৃহকর্ত্রী নদীকে মামলা দায়েরের দিনই গ্রেফতার করা হয়। আর নদীর মা ইশরাত জাহানকে ৩ অক্টোবর গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরো জানান, আদুরী মূলত বরিশাল সদরের নদীর শাশুড়ির বাড়িতে কাজ করত। নদী গর্ভবতী হলে আদুরীকে বরিশাল থেকে ঢাকায় নদীর পল্লবীর বাসায় পাঠায়। ৯ মাস ধরে নদীর বাসায় কাজ করছিল আদুরী। কাজের সময় নানা কারণে আদুরীর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাত নদী ও তার মা। দীর্ঘ চিকিত্সায় সুস্থ হয়ে ওঠে আদুরী।
আদুরীর খালু মিজানুর রহমান জানান, আদুরী এখন থেকে তার পিতা-মাতার কাছে পটুয়াখালী জেলা সদরের জৈনকাঠি গ্রামের বাড়িতেই থাকবে। গণমাধ্যম, চিকিত্সক, পুলিশ, সমাজসেবীসহ অনেকের সহযোগিতায় একজন আদুরী হয়তো রক্ষা পেল কিন্তু ঢাকা মহানগরীর অগণিত আদুরীদের খোঁজ রাখা যাবে কি!
