আনন্দ স্কুলের আনন্দ যেন কাড়িয়া নেওয়া না হয়

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৮
দেশের হতদরিদ্র পরিবারে শিশুর সংখ্যা কম নহে। নুন আনিতে পান্তা ফুরাইবার অবস্থাও তাহাদের নাই। স্কুলে যাইবার স্বপ্ন তো বহু যোজন দূরের। কিন্তু একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর সার্বিক বিকাশের জন্য শিক্ষার আলো ছড়াইয়া পড়া দরকার সবচেয়ে অন্ধকার কোণাগুলিতেও। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন’ (রস্ক) প্রকল্পে বিভিন্ন উপজেলায় ক্রমান্বয়ে চালু হইয়াছে ও হইতেছে ‘আনন্দ স্কুল’। কিন্তু এই সকল অনেক আনন্দ স্কুলে আনন্দের ব্যাপারটি উধাও হইয়া গিয়াছে, কিংবা আনন্দের উপকরণ বিতরণের কোনো উদ্যোগই শুরু হয় নাই স্কুল চালুর দীর্ঘদিন পরও। পত্রিকান্তরে নানা খবর প্রকাশ পাইতেছে এই নিরানন্দের বিষয়টি লইয়া। নিয়ম অনুযায়ী আনন্দ স্কুলের শিক্ষকের বেতন, শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম, পোশাক, উপবৃত্তি প্রভৃতি যথাসময়ে প্রদান করিবার কথা। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ৫০টি আনন্দ স্কুলের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এই সাধারণ সুযোগ-সুবিধা হইতে বঞ্চিত প্রায় স্কুল শুরুর সময় হইতেই। এই সকল গ্রামীণ জনপদে চারশ’ টাকায় একটি ঘর ভাড়া লইয়া আনন্দ স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হইলেও এখন অবধি কোনো মাসেই ঘর মালিক ভাড়া পান নাই। শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে-মাসে একশ’ টাকা উপবৃত্তি এবং গণিত, বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্য বই, খাতা-কলম বিনামূল্যে সরবরাহের কথা থাকিলেও সিংহভাগ শিক্ষার্থী এখনও তাহা পায় নাই। কেহ তাহা পাইলেও খাতা-কলম মেলে নাই। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক দেওয়ার কথা থাকিলেও তাহা শিশুদের শরীরের মাপজোক নেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ আছে। এইসবের বাহিরে কোনো শিক্ষক এখন অবধি এক মাসেরও বেতন পান নাই। স্বভাবতই যেই আনন্দের উপকরণের সহিত আগাইয়া চলিবে এই শিক্ষা কার্যক্রম, তাহার কোনো দেখা নাই। আরও কিছু জেলার চিত্রও খুব আনন্দদায়ক নহে। দুই বত্সর পূর্বে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪ ইউনিয়নে ৩৯৫টি আনন্দ স্কুল চালু হইলেও নানা অনিয়ম পিছু ছাড়ে নাই অভাবী শিক্ষার্থীদের। এই অঞ্চলের আনন্দ স্কুলের কমিটি কর্তৃক তৈরিকৃত ইউনিফর্মগুলি এতটাই নিম্নমানের যে, তাহা শিক্ষার্থীদের কাছে পরিধানের যোগ্য নহে। ওই সকল ইউনিফর্ম পরিধানের ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হইতেছে। অভিযোগ রহিয়াছে যে, ইউনিফর্মের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ৮ লক্ষ টাকা কম ব্যয়ে নিম্নমানের পোশাক তৈরি করা হয়। এই টাকা কি উদ্দেশ্যে কোথায় ব্যয় হইবে, নাকি তছরূপ হইবে— সেই প্রশ্ন রহিয়াই যায়। তাহা ছাড়া আরও অভিযোগ রহিয়াছে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে আনন্দ স্কুলের দেড় কোটি টাকা হরিলুট করিবার। সব মিলাইয়া আনন্দে নাই আনন্দ স্কুল। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০৪ সাল হইতে চালু হওয়া এই ‘আনন্দ স্কুল’ প্রকল্পের অনেক স্কুলেরই হয়তো আনন্দচিত্র এত ম্লান নহে। কিন্তু যেই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা এই হতদরিদ্র শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত বা প্রশ্নের মুখে ফেলিতেছে—তাহা বরদাশত করা উচিত নহে যথাযথ কর্তৃপক্ষের। দারিদ্র্য দূর করিবার বড় হাতিয়ার এই ‘শিক্ষার আলো’। যাহারা সেই আলোর সম্মুখে পর্দা টানাইয়া অন্ধকারকে জিয়াইয়া রাখিতে চাহেন, তাহারা ইহাতে হয়ত বাঁকা পথে সামান্য অর্থ সংগ্রহ করিতে পারেন। কিন্তু জাতির জন্য যাহা ক্ষতিকর, তাহার বাহিরে কি কেউ আমরা? সুতরাং আনন্দ স্কুলের আনন্দ যেন কাড়িয়া নেওয়া না হয়।