বাংলাদেশের ১/১১-এর মতো আরেকটি অসাংবিধানিক সরকার কি আসন্ন? বড় দুই দলের একগুঁয়েমির কারণে সেই আলামতই দেখতে পাচ্ছেন একশ্রেণির সুশীল ব্যক্তি। বিভিন্ন আলোচনায় বেশ কিছুদিন ধরে তাঁরা এ আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন। সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথাও। এক-এগারোর পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে থাকা না থাকা নিয়ে একটি মহল যে আদলে কথা তুলেছিল সেই আদলেই তাঁরা আবার সক্রিয় হয়েছেন। তখনও তাঁরা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে।’ আবার সেই একই গুঞ্জনই এখন নতুন করে শোনা যাচ্ছে। অথচ গণতান্ত্রিক একটি দেশে এই ধরনের গুঞ্জন জনমনে বিভ্রান্তি এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এই শ্রেণির মানুষের একটি সাধারণ প্রবণতাই হলো সব রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করা। টক শো ছাড়াও সবধরনের মিডিয়ার খবর এবং সেমিনার, গোলটেবিল আলোচনাসহ নানা অনুষ্ঠানে তাঁদের সরব উপস্থিতি ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থায় তাঁদের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০০৭ সালের শুরুতে দেশে জরুরি অবস্থায় রাজনীতি ছিল নিষিদ্ধ। এ সময় শীর্ষ দুই নেত্রীকে জেলে ঢোকানো, যৌথ বাহিনীর রাত-বিরাতে নাটকীয় সব অভিযান প্রভৃতি সাংবিধানিক কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে করা এসব কাজ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ছিল বিভ্রান্ত। এসব ঘটনায় হতবিহবল হয়ে পড়ে তারা। আর এই বিভ্রান্তিকে দমন করার পরিবর্তে এতে যেন আরো উস্কানি দিতে থাকেন এই সুশীল ব্যক্তিরা।
‘মাইনাস’ সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক কোনো প্রক্রিয়া নয়
বর্তমানে মিডিয়ায়, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে, গোল টেবিল বৈঠকে ব্যস্ত উপস্থিতি লক্ষ করা যায় কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এনজিও সিন্ডিকেট, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও কূটনীতিক, রাজনৈতিক সংস্কারবাদী সিভিল সোসাইটির কিছু সংগঠন, ব্যবসায়ী-শিল্পমালিক, একশ্রেণির রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের। তাঁদের বক্তব্য হলো, দুই বড় দলের বাইরে কিছু একটা হোক। এই ফর্মুলা তারা বেশ যুক্তি, বক্তব্য দিয়ে পেশ করে যাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দেশের মানুষ দুই নেত্রীর কাউকেই চায় না। দেশের প্রধান দুই দল অর্থাত্ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে, পরিবারতন্ত্রের বাইরে নতুন ধারার রাজনীতি সৃষ্টির সময় এসেছে বলেও জোর আওয়াজ তুলতে শুরু করেছেন তাঁরা।
অথচ গণতন্ত্রে অপছন্দের কোনো শাসককে ক্ষমতাচ্যূত করার একমাত্র পথ হলো নির্বাচন। গণবিক্ষোভের মাধ্যমেও শাসককে ক্ষমতাচ্যূত করা যায়; যেমনটা করা হয়েছিল আইয়ুব খান বা এরশাদকে। তবে একজনকে ক্ষমতাচ্যূত করে একইসঙ্গে আরেকজনকে ক্ষমতায় বসানোর কাজটা গণবিক্ষোভের দ্বারা সম্ভব হয় না। এই কাজটা করে গণতন্ত্র। অর্থাত্ গণতন্ত্র সরকারকে ক্ষমতা থেকে শান্তিপূর্ণভাবে সরায় এবং পছন্দের নেতাকে নির্বাচিত করে।
রাজনীতির মাঠে নেমে দেখুন
গত দুই দশক ধরে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দুজনই নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছেন তাঁরা। নব্বই সালেই আমাদের দেশে দুই নেত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর এই দুই নেত্রীই ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন। কিন্তু তারপরও সত্য হলো, স্বাধীনতার চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই দুই দল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি দেশের মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দুই নেত্রী ও তাঁদের নেতৃত্বাধীন দুই দল ছাড়া গ্রহণযোগ্য তৃতীয় কোনো বিকল্প এখনো দেশে নেই। আর এজন্যই এই দুই নেতার বিরুদ্ধে একের পর এক নানান অভিযোগ এলেও জাতি তাঁদের কাছেই আস্থা খুঁজেছে। তাঁদের ওপরই আস্থা রেখেছে। কারণ দেশের মানুষ গণতন্ত্র চায়।
তাই বলা যায়, যাঁরা মাইনাস টু ফর্মুলার কথা বলছেন— কথা কিংবা বক্তৃতা দিয়ে নয় বরং সক্রিয়ভাবে রাজনীতির মাঠে নেমে নতুনধারার রাজনীতি সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিয়ে দেখুন, সফলতা পান কিনা। নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগণের হাতেই ছেড়ে দিন তাদের অপছন্দের ব্যক্তিদের মাইনাস করার দায়িত্ব। কিন্তু রাজনীতির মাঠে না থেকে কোনো তত্ত্ব দিয়ে জনগণকে অন্তত বিভ্রান্ত করাটা মোটেও কাম্য নয়।
ঢাকা
