সংকট নিরসনে বিদেশি নয় প্রয়োজন স্বদেশি উদ্যোগ

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৯
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। মসনদের মোহে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এক দল চাইছে ক্ষমতার মসনদ দখলে রাখতে, অন্য দল চাইছে মসনদ দখল করতে। এজন্য উভয় দলই জনগণকে জিম্মি করে মসনদ দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এতে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ বেড়েই চলেছে। অসহায় জনগণ মসনদ দখলের রাজনৈতিক খেলার অবসান চাইছে। অন্যদিকে কূটনীতিকরা এ খেলার ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলতে তোড়জোড় শুরু করছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করছে। সাংবিধানিক নিয়মে আর মাত্র তিন মাসের কম সময়ের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। অথচ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ চলছে। সরকারদলীয় জোট বলছে অন্তর্বর্তী সর্বদলীয় সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় জোটের দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাত্ উভয় জোট নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। এ কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা চরম সংকটে পড়েছে। এ রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন এবং সম্প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। নিজেদের রাজনৈতিক মতানৈক্য দূর করতে না পারায় বিদেশিরা সুযোগ নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাজ্য চীন ও জাপানসহ দেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন। তাঁরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ দিয়েছেন। আর রাজনৈতিক নেতারা জনগণের চেয়ে বিদেশিদেরই বেশি দাম দিচ্ছেন। আনুকূল্য লাভের আশায় তাঁরা জনগণের চাহিদার দিকে না তাকিয়ে মার্কিন-ভারত-চীনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁদের ধারণা পরাশক্তিগুলো সন্তুষ্ট হলেই বাংলার মসনদে বসা যাবে। এজন্য সাম্রাজ্যবাদীদের আজ্ঞাবহ হতে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। কোন দল কত বেশি অনুগত তার মহড়া চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। তাই কোনো দল জঙ্গি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করছে আবার একই উদ্দেশ্যে অন্য দল নিজেদের আসল রূপ ঢেকে মডারেট মুসলিম সাজার চেষ্টা করছে। আর সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের অধিকতর অনুগত দল বাছাই করতে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিও মজীনা সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। জানা গিয়েছে, তিনি সেখানে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও যুগ্ম পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে বাংলাদেশের সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক ও রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক উদ্বিগ্ন। বিদেশে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক সচেতনমহল গণতন্ত্র নস্যাতের আশঙ্কা করছেন। তাদের ধারণা বিদেশিদের তত্পরতায় ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা আবার সক্রিয় হবেন। তবে আশার দিক হলো সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্প্রতি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। দেশের সর্ববৃহত্ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই নেতৃবৃন্দ উভয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে আলোচনায় বসার অনুরোধ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে এ দেশের মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেশ ও জনগণ সর্বোপরি নিজেদের স্বার্থেই রাজনীতিবিদদের সহনশীল হতে হবে। সংঘাত-সহিংসতা পরিহার করে তাঁদেরকে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। সরকারদলীয় জোট ও বিরোধীদলীয় জোট উভয়কেই নিজেদের অনড় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। আর বিদেশের ওপর নয় বরং নিজেদের আদর্শ ও দেশের জনগণের ওপর পূর্ণআস্থা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক সচেতন মহলকেও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা অতি ভালো মানুষ সেজে দূরে থাকলে সংকট আরো ঘনীভূত হবে। এর সমূহবিপদ তাঁদেরকেও আক্রান্ত করতে পারে। অধিকন্তু এর দায়ভার তাঁদের ওপরও পড়বে এবং জাতির কাছে তাঁদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। এসব বিবেচনায় দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সচেতন নাগরিক সমাজ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবাইকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে দেশ ও জাতির স্বার্থে। ঢাকা