প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধ্বংস, খুন ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথ ত্যাগ করে আলোচনায় আসার জন্য বিরোধী দলীয় নেতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আলোচনার পথ এখনো খোলা আছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার নামে মানুষ খুন বন্ধ করে আলোচনায় আসুন। কি চান আপনি তা বলুন। আমরা সবাইকে নিয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চাই। বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রীর উদ্দেশে আরো বলেন, অযৌক্তিক হরতাল দিয়ে আর মানুষের জীবনে অশান্তি টেনে আনবেন না। মানুষকে একটু শান্তি দিন। তবে যতই চেষ্টা করেন না কেন যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে পারবেন না। এদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর হবেই। তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশের শান্তি চান না, সন্ত্রাসে বিশ্বাস করেন তিনি। আমার দেয়া আলোচনার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে উনি হরতালের নামে নিষ্ঠুরভাবে পুড়িয়ে মানুষ মারলেন। ছোট ছোট শিশুরাও রেহাই পায়নি। অনেক মায়ের কোল খালি করলেন। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, একজন মুসলমান হয়ে আরেক মুসলমানকে কেউ কি পুড়িয়ে মারতে পারে? হরতালের নামে তিনি ২০ জনের প্রাণ কেড়ে নিলেন। এর দায়-দায়িত্ব অবশ্যই তাকে (খালেদা জিয়া) নিতে হবে।
কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানা আওয়ামী লীগ অপরাহ্নে স্থানীয় কদমতলীর বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম কমান্ডার চত্বরে এই জনসভা আয়োজন করে। বেলা ১১টার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসতে থাকে। বিকাল ৩টার আগেই ওই এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল উদ্বোধনের পর বিকাল পৌনে ৪টার দিকে জনসভা স্থলে পৌঁছান। এ সময় জনসভায় সমবেত লাখো জনতা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার আগমনকে স্বাগত জানিয়ে গগনবিদারি স্লোগান তোলে। প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে মঞ্চে উঠে হাত নেড়ে উত্ফুল্ল জনতাকে শুভেচ্ছা জানান। কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, স্থানীয় সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ বিপু, কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ হোসেন, একেএম এনামুল হক শামিম, সাইফুজ্জামান শিখর, বেনজীর আহমেদ এমপি, মাহবুবুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, নাজমা আখতার এমপি, অধ্যাপিকা অপু উকিল, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, পনিরুজ্জামান তরুন, হাজী মো. সেলিম, শাহীন আহম্মেদ প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী আবারও দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আর যাতে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত জাতীয় পতাকা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের হাতে না যায় এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়তে আরেকবার নৌকায় ভোট দিয়ে আমাদের দেশ সেবার সুযোগ দিন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মানেই উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি। আর বিএনপি মানেই খুন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অশান্তি। দেশের মানুষ বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনের যুগে আর ফিরে যেতে চায় না।
প্রধানমন্ত্রী জনসভায় আসার আগে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্রায় চারশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ইনল্যান্ড কন্টেইনার টার্মিনালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও সুধি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। পরে কেরানীগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন ও তীর সংস্কারমূলক প্রকল্প, নতুন রাস্তারচর স্কুল এন্ড কলেজ, বন্দ ডাকপাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শুভ উদ্বোধন এবং জিনজিরা কনভেনশন সেন্টার নির্মাণ, কেরানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সম্প্রসারিত ভবন, তেঘরিয়া বিডি মাঠে স্টেডিয়াম নির্মাণ, আগানগর ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ, দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ নির্মাণ, চন্ডিতলা মন্দিরের নতুন ভবন ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা চত্বরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
দুই নেত্রীর মধ্যে টেলি সংলাপ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই দিন দুপুরে কয়েকবার ফোন করলেও তিনি (খালেদা জিয়া) ফোন ধরলেন না। পরে যোগাযোগ করা হলে জানানো হলো তার প্রস্তুতি নিয়ে নীচে নামতে নাকি রাত ৯টা বেজে যাবে। পরে বলা হলো ৬টায় কথা হবে। কিন্তু ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে। আমার টেলিফোনের পর আশা করেছিলাম বিরোধী দলীয় নেত্রী ফোন করবেন, কিন্তু করলেন না। পরে দেশ ও জাতির শান্তির কথা বিবেচনা করে আমি নিজেই তাকে আবারো ফোন করলাম। ফোন করার পর যে ঝগড়া-ঝাটি তিনি করলেন, তাতে আমি মোটেও অভ্যস্ত নই।
বিরোধী দলীয় নেত্রীর ‘ভিন্ন ধারায় দেশ পরিচালনার’ ঘোষণার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় আসলে উনি নাকি ভিন্ন কায়দায় দেশ চালাবেন। উনি তো ছেলেদের মানুষ হত্যা, দুর্নীতি, গ্রেনেড হামলা ও হত্যার বিদ্যা শিখিয়েছেন। উনার ভিন্ন কায়দায় দেশ পরিচালনা মানে হাওয়া ভবন নয়, নতুন ভবন খুলে নতুন কায়দায় দুর্নীতি করবেন, মানুষ খুন করবেন, সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করবেন, দেশকে রসাতলে নিয়ে যাবেন। আর উনার হেফাজতের হুজুর তেঁতুল তত্ত্ব দিয়ে বলেছেন, চতুর্থ শ্রেণীর বেশি মেয়েরা পড়তে পারবে না। মানে এরা ক্ষমতায় আসলে মেয়েরা পড়াশুনা শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। জনগণের ভোটে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ সুবিধা পৌছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী।
জনসভায় নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগে অর্ধেকদিন লোডশেডিং হতো, কল-কারখানা ৬/৭ ঘণ্টা করে বন্ধ থাকতো। এখন আর লোডশেডিং নেই, কল-কারখানা ২৪ ঘণ্টা সচল রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসলে আবার দেশে লোডশেডিং হবে, সন্ত্রাস, বোমা-গ্রেনেড হামলা, নিরীহ মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটবে। তিনি বলেন, একটানা ১৫ বছর যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে পারে তবে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো উন্নত দেশ হবে।
আমির হোসেন আমু বলেন, খালেদা জিয়া তার ক্যাডার, সাঙ্গপাঙ্গ ও জঙ্গীদের লেলিয়ে দিয়ে মানুষ হত্যা করছে। হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেশে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছেন।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, সরকারের এতো উন্নয়ন বিরোধী দলীয় নেত্রীর পছন্দ হচ্ছে না। তাই অযৌক্তিক হরতাল ডেকে মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছেন। ছোট ছোট শিশুরাও তার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
জনসভায় হাজার হাজার মহিলার উপস্থিতি ছিল। স্থানীয়দের অভিমত, অনেকদিন এতো বড় জনসভা দেখেননি।
