ধর্মীয় সৌহার্দ্যের প্রতীক গুরুদুয়ারা নানকশাহী

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৫৯
একেশ্বরবাদ ও স্রষ্টার সার্বভৌমত্বের বাণী প্রচারেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব। সাম্য ও সৌম্যের বাণী প্রচার করতে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ১৬ শতকের শুরুর দিকে ঢাকার বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে অবস্থান করেছিলেন এ মহামানব। এর প্রায় এক শতক পর যেখানে তিনি অবস্থান করেছিলেন সেখানে গড়ে উঠে শিখদের পবিত্র উপসনালয় গুরুদুয়ারা নানকশাহী। ১৭ শতকের প্রারম্ভে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হর গোবিন্দের ধর্ম প্রচারের উদ্যোগের অংশ হিসাবে বর্তমান গুরুদুয়ারা নানকশাহী প্রতিষ্ঠিত হয়। চার শতকেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌম্যের বার্তা বহন করছে এ স্থাপনা। দাঁড়িয়ে আছে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসাবে। শুধু ধর্মীয় বিবেচনায় নয়, ঐতিহাসিকভাবেও গুরুদুয়ারা নানকশাহীর গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশে বিদ্যমান সাতটি গুরুদুয়ারার মধ্যে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। মুক্তিযুদ্ধসহ এ অঞ্চলের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনারও সাক্ষী এ ভবন। প্রতি সপ্তাহেই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে শিখ ধর্মের অনুসারীরা এখানে জমায়েত হয় এবং প্রার্থনা করে। দেশে শিখদের সবচেয়ে বড় জমায়েত হয় এখানেই। শিখ রিসার্চ সেন্টার এবং গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটির দেয়া তথ্যমতে, মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬০৬ থেকে ১৬২৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে গুরুদুয়ারা নানকশাহী নির্মাণ করা হয়। ষষ্ঠ শিখ গুরু হর গোবিন্দ ১৭ শতকের প্রারম্ভে আলমাসত নামে এক ধর্মপ্রচারককে ঢাকায় (তখন জাহাঙ্গীরনগর) পাঠান। তিনিই তখনকার সুজাতপুর এলাকায় (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকা) এটি নির্মাণ শুরু করেন। আলমাসতের তৃতীয় অধস্তন পুরুষ নাথি সাহেবের নামানুসারে শিখ ধর্মানুসারীদের কাছে এ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ‘সংগত’ বলে অভিহিত হয়। বাংলাদেশে এ ভবনটিই একমাত্র ‘শিখ সংগত’ যেটি তার আদি অবস্থানে এখনও বিদ্যমান। তবে এর এলাকা সংকুচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর ১৮৩৩ সালের দিকে গুরুদুয়ারা নানকশাহীকে আবার সংস্কার করা হয়। ১৮৪৭ সালের পর হতে ষাট দশক পর্যন্ত এটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। স্বাধীনতার পর উপসনালয় কেন্দ্রটিকে পুনরায় সংস্কার করা হয়। গুরুদুয়ারার বর্তমান ভবনটি ১৯৮৮-৮৯ সালে সর্বশেষ সংস্কার করা হয়। সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা যায়, এক সময় গুরুদুয়ারা নানকশাহীর বিপুল ভূসম্পত্তি ছিল। এর উত্তর দিকে ছিল একটি প্রবেশদ্বার। দক্ষিণদিকে ছিল কূপ ও সমাধিস্থল এবং পশ্চিমে ছিল একটি শান বাঁধানো পুকুর। মূল উপাসনালয় ছাড়াও ভক্তদের থাকার জন্য ছিল কয়েকটি কক্ষ। তবে সেসবের এখন আর অবশিষ্ট নেই। বিভিন্ন সময় সংস্কারের ফলে বর্তমান রূপ গ্রহণ করেছে এটি। এতে মোট নয়টি কক্ষ আছে। দক্ষিণে তিনটি, উত্তরে একটি, পূর্বে একটি ও পশ্চিমে একটি মোট ছয়টি প্রবেশপথ রয়েছে। উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত গুরুদুয়ারা নানকশাহীর বর্তমান প্রবেশপথটি রয়েছে দক্ষিণদিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির অদূরে রোকেয়া হলের বিপরীতে অবস্থিত উপাসনালয়টির সামনে রয়েছে সবুজ লন। ভবনের উপরে খাঁজকাটা নকশার গম্বুজের নিচের অংশে চারপাশে নীল রঙ দিয়ে শিখ ধর্মের চিহ্ন ‘খাণ্ডা’ আঁকা। গম্বুজের শীর্ষে শিখদের উপসনালয়ের চিহ্ন ‘ছাত্রার’ রয়েছে। বাইরে উড়ছে শিখ ধর্মের পতাকা। পতাকা ওড়ানোর বাঁশটিও হলুদ কাপড়ে মোড়ানো। তার মাথায় আছে ধাতব ফলকের মতো একটি অংশ। মূল ভবনের পাশে ডানদিকে রয়েছে দোতলা দরবার হল। ২০১১ সালে গুরুদুয়ারার মূল ভবনের পশ্চিমপাশে শিখ রিসার্চ সেন্টার, অফিস কক্ষ ও বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য অতিথিকক্ষ নিয়ে দ্বিতলবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মিত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্ত্রী গুরু শরণ কাউর এটি উদ্বোধন করেন। অন্দর ও ধর্মাচার গুরুদুয়ারা নানকশাহীর ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি বড় কক্ষ। এর নাম দরবার সাহেব। এই কক্ষের চারদিকে চারটি দরজা আছে। কেন্দ্রীয় কক্ষটিকে বেষ্টন করে চারদিকে চারটি এবং চার কোণে চারটি কক্ষ রয়েছে। দরবার সাহেবের চারদিকে বারান্দা আছে। বর্গাকার কক্ষটির প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য চার দশমিক ৮৮ মিটার বা ১৬ ফুট। কক্ষের মাঝখানে কাঠের তৈরি বেদির ওপর রয়েছে শিখ ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থসাহেব’। তুলট কাগজে হাতে লেখা এ গ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপাসনা করেন শিখ ধর্মাবলম্বীরা। এ কক্ষের মেঝেতে লাল রঙের কার্পেট পাতা থাকে। তাতে ভক্তরা বসে ‘গ্রন্থসাহেব’ পাঠ শোনেন। গুরুদুয়ারা নানকশাহীতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ধর্মাচার হলেও প্রতি শুক্রবার সাপ্তাহিক জমায়েত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবারে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ভক্তের আগমনে গুরুদুয়ারা মুখরিত হয়ে ওঠে। দুপুরে উপস্থিত সকলের জন্য নিরামিষ খাওয়ানোর আয়োজন থাকে। লঙ্গরখানায় খাবারের এ আয়োজন করা হয়। এতে প্রবেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নারী-পুরুষ কারো বাধা নেই। তবে সবারই হাত-মুখ ধুয়ে, মাথায় কাপড় দিয়ে প্রবেশের নিয়ম রয়েছে। স্মৃতি ও নিদর্শন গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ রবি দাস পাপ্পু বলেন, ঢাকার এ গুরুদুয়ারা নানকশাহী শুধু গুরু নানকের স্মৃতিবিজড়িত নয়। নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুরও ঢাকায় দুই বছর অবস্থানকালে এখানে বাস করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এর দুই সেবাদার শরণ সিং ও মুহম্মদ-উল-মালিক শহীদ হন। রবি দাস পাপ্পু জানান, এ গুরুদুয়ারা ছাড়াও রাজধানীর বাংলাবাজারে ‘গুরুদুয়ারা নানক কুয়ান’, উর্দু বাজারে ‘গুরুদুয়ারা সুতারাশাহী’ রয়েছে। বিলুপ্তির পথে রয়েছে ইংলিশ রোডের ‘গুরুদুয়ারা বাবা মোহন সিং’।